এজ্ঞে তা ধুলো বই কি! চার ক্রোশ রাস্তার ধুলো।–এক কাঠা দাঁত বের করে দামু। বুদ্ধিমানের মতো জবাব দিলে।
পঞ্চানন বিরক্ত হয়ে বললেন, থাম তুই, মেলা বকিসনি।
ত্রিলোচনও ততক্ষণে দামুকে দেখেছেন, তার পাগড়ি, হাঁড়ি, লাঠিন্ধু সেই বিরাট কাণ্ডকারখানা দেখে হাঁ হয়ে গেছেন। রাতের অন্ধকারে এটিকে দেখলে তিনি বাবা গো বলে ছুটে পালাতেন।
ঘাবড়ে ত্রিলোচন বললেন, বেয়াই, এটি—
আমাদের গাঁয়ের ছেলে। জিনিসপত্র বয়ে সঙ্গে এসেছে। নাম দামু! ওরে দামু, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? হাঁড়ি-টাঁড়িগুলো নামা
এজ্ঞে নামাই– বলেই দামু হাঁড়ি দুটো ধপাৎ করে ত্রিলোচনের একেবারে পায়ের ওপর নামিয়ে ফেলল। উঃ– বলে ত্রিলোচন লাফিয়ে উঠলেন।
পঞ্চানন বললেন, কী রে, হাঁড়ি দুটো একেবারে পায়ের ওপর ফেলে দিলি? একটা আক্কেল-বিবেচনা বলেও কিছু নেই? তোর মতো গো-মুখকে সঙ্গে আনাই–
পায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বাধা দিলেন ত্রিলোচন : ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমার লাগেনি। যাও হে দামু, বসে বিশ্রাম-টিশ্রাম করো। ওরে–কে আছিস, হাঁড়ি দুটো ভেতরে নিয়ে যা।
এঃ হে, আপনাকে পেন্নাম করতেই ভুলে গেনু বলে দামু এবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে ত্রিলোচনের পায়ে। যেখানে হাঁড়ি নামিয়েছিল, সেই ব্যথার জায়গাতেই ঠাস করে ঠুকে দিলে মাথাটা।
ত্রিলোচন একবার বললেন, ইঃ–তারপর বললেন, বেঁচে থাকো বাবা, বেঁচে থাকো। এবার ভেতরে যাও।
বড়লোক বেয়াইবাড়ির আদর-যত্নে পঞ্চানন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। মরা মেয়েটার কথা মনে হয়ে চোখে জল আসছিল, কিন্তু ফুটফুটে নাতনিটিকে বুকে নিয়ে সব দুঃখ তিনি ভুলে গেলেন। আরও অনেক মিষ্টি হয়েছে রুনকু–অনেক সুন্দর হয়েছে। টক টক করে। কথা বলে, কলকাতার গল্প, তার স্কুলের গল্প, মেমসায়েব দিদিমণির গল্প। তারপর আবার কতগুলো ইংরেজী ছড়াও শুনিয়ে দিলে দাদুকে। পঞ্চানন মুগ্ধ হয়ে গেলেন। আর বারবার মনে-মনে বলতে লাগলেন, বেঁচে থাক দিদি, সুখে থাক।
কিন্তু ত্রিলোচনের এই আদরের নাতনিকে তিনি কী করে নিয়ে যান তাঁর ভাঙা কুঁড়েঘরে? রামের মা ভরসা দিয়েছে বটে, কিন্তু পঞ্চানন মনে জোর পাচ্ছিলেন না। যাই হোক, আজকের দিনটা তো যাক। ভেবেচিন্তে কাল যা হয় করা যাবে।
তার আগেই দামু একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসল। দামুকে দেখে রুনকুর ভালো লাগবে এ তো জানা কথা। আর কুটুমবাড়ি এসে, বেশ করে অনেকগুলো লুচি-মণ্ডা খেয়ে দামুরও মেজাজ খোলতাই হয়ে গিয়েছিল, এ-সব ভালো জিনিস তো আর যখন-তখন তার বরাতে জোটে না। সে রুনকুকে নিয়ে গল্প জমিয়ে বসল।
জানো দিদি, এবারে আমরা তোমায় নিয়ে যাব।
রুনকু খুশি হয়ে বললে, ই, দাদুর বাড়িতে আমি বেড়াতে যাব এবার।
সেখানে রামের মা আছে। সে কত রান্না করে দেবে। আর আমি গাছ থেকে পাখি ধরে দেব তোমাকে।
পাখি ধরে দেওয়ার কথায় রুনকুর আর উৎসাহের সীমা রইল না। সে বললে, সব পাখি ধরে দেবে?
সব। দোয়েল, কোকিল, শ্যামা, শালিক—যা চাও।
রুনকু নেচে উঠল : কী মজা হবে, সব পাখি আমি খাঁচায় করে পুষব! কখন নিয়ে যাবে আমায়?
কাল। দাঁড়াও, আজ একটু ভালোমন্দ খেয়ে নিই, তোমার দাদু বড় বড় রুই মাছ ধরিয়েছে পুকুর থেকে, সেগুলো ভালো করে সাবাড় করি, তারপর।
রুনকুর মন রুই মাছের দিকে ছিল না। সে আবার বললে, কীসে করে নিয়ে যাবে আমাকে?
কেন, তোমাদের মটোর গাড়িতে? ভোঁপ-ভোঁপ করে চলে যাব।
দূর, মোটরে তো সব সময় চড়ি। মোটর ভালো লাগে না।
তা হলে গোরুর গাড়িতে চেপে?
না–গোরুর গাড়িতে নয়।
তবে তো মুস্কিল!–দামু মাথা চুলকোতে লাগল : তা হলে কীসে যাবে? পাল্কিতে? ঘোড়ায়? হাতিতে?
হাতি-ঘোড়া-পালকি এসব বলবার জন্যেই বলেছিল, কিন্তু হাতি শব্দটা টুক করে কানে লাগল রুনকুর।
দাদুর হাতি আছে বুঝি?
দামু পেছনোর পাত্র নয়। বলেই যখন ফেলেছে, তখন আর হার মানা চলে না। বললে, আলবাত আছে। কী নেই তোমার দাদুর? হাতি, ঘোড়া, গোরু, সব।
রুনকু আবার নেচে উঠল : তা হলে আমি হাতি চেপেই দাদুর বাড়ি যাব। ঠিক—ঠিক–ঠিক–
দামু টেরও পেল না, কী সর্বনেশে কাণ্ডটি বাধিয়ে বসল সে।
.
তিন
দুদিন বেয়াই–বাড়িতে আদর-যত্নে তো খুব চমৎকার কেটে গেল পঞ্চাননের। ব্রিলোচন তাঁকে তো আর ছাড়তেই চান না। আর দামু যেরকম উৎসাহের সঙ্গে মাছের মুড়ো, মাংসের কালিয়া আর দই রসগোল্লা খেয়ে চলেছিল, তাতে মনে হল, এখানে সারা জীবন থেকে যেতে হলেও তার এতটুকুও আপত্তি নেই! অমন এলাহি খাওয়া-দাওয়া তার কপালে তো কোনওদিন জোটেনি!
কিন্তু গোলমাল বাধল তত তিন দিনের দিন। যেদিন পঞ্চানন রুনকুকে নিয়ে যাবেন, সেইদিন।
ত্রিলোচন বলেছিলেন, নিয়ে যাবেন বই কি, আপনাদেরই তো মেয়ে।রুনকুও একেবারে তৈরি। তার ছোট্ট সুটকেস তার খেলনা, তার ছবির বইসব ঠাকুরমা যত্ন করে গুছিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে বুড়ি ঝি সদু যাবে, সেও তার পোঁটলা-পুঁটলি বেঁধে নিয়েছে। ত্রিলোচনের দেউড়িতে মোটর গাড়িখানা এসে দাঁড়িয়েছে, পঞ্চানন দুগা-দুগা এই সব বলে-টলে চটিজোড়া পায়ে গলাতে যাচ্ছেন, দামুর মাথায় সেই দেড়-হাত উঁচু পাগড়িটা প্রায় বাঁধা হয়ে গেছে, এমন সময়
এমন সময় সেই বিপর্যয় কাণ্ড!
হঠাৎ রুনকুর এক আকাশ-ফাটানো চিৎকার : আমার হাতি কোথায়?
