এ-হেন একটি সঙ্গীকে নিয়ে–পঞ্চানন ইতস্তত করতে লাগলেন।
দেরি করছ কেন দা-ঠাকুর, চলো–দামুর উৎসাহী গলা শোনা গেল। পঞ্চানন চেয়ে দেখলেন, সেই জাঁদরেল পাগড়ির ওপরে দুটো বিরাট হাঁড়িকে চাপিয়ে নিয়েছে দামু-এক মাইল দূর থেকেই বোধহয় দেখা যাচ্ছে সেগুলো। বগলে নিয়েছে লাঠি, আর হাতে নিয়েছে ব্যাগটা।
চলো দা-ঠাকুর–রোদ উঠে গেলে কষ্ট হবে রাস্তায়।
হাঁ রে, হাঁড়ি-টাঁড়ি ফেলে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি করবি না তো শেষ তক?
দা-ঠাকুর, কক্ষনো ফেলব না–মা কালীর দিব্যি!
দুর্গা শ্রীহরি–একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন পঞ্চানন : চল তা হলে, যাওয়াই যাক।
.
দুই
চার ক্রোশ রাস্তা–মানে আগেকার হিসেবে আট মাইল। তোমরা যারা কলকাতার মতো বড় শহর-টহরে থাকো, তোমাদের তো এক কিলোমিটার হাঁটতেই হাঁফ ধরে; রিক্সা, কিংবা ট্যাক্সি আর নিদেন পক্ষে বাস না হলে চোখে প্রায় সর্ষের ফুল ফুটে ওঠে। কিন্তু পাড়াগাঁয়ের মানুষের পক্ষে ওরকম দশ বারো মাইল রাস্তা কিছু নয় বড় বড় পা ফেলে দেখতে-দেখতে পার হয়ে যায়।
তবু, পঞ্চাননের তো বয়েস হয়েছে–একটু ধীরে ধীরেই যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু দামুর আর তর সয় না। একে তো ঠাকুরমশাইয়ের পাইক সেজেছে, তার ওপর মাথায় ওই পেল্লায় পাগড়ি আর হাতে ওই জাঁদরেল লাঠি–হাঁড়ি-ফাঁড়ি সুদ্ধ সে প্রায় পঞ্জাব মেলের মতো চলতে। লাগল। আর পঞ্চানন মধ্যে মধ্যে কাতর হয়ে ডাকতে লাগলেন, একটু ধীরেসুস্থে যা বাপু, সব ফেলে-টেলে দিয়ে একটা কেলেঙ্কারি করবি নাকি?
কেলেঙ্কারি প্রায় হতেই যাচ্ছিল আর কি!
এখন দেশসুদ্ধ লোক সবাই ই তো দামুকে চেনে। ওই তালঢ্যাঙা চেহারা, নিপাট বোকামি, কান-হারানোর গল্প–সব মিলে দাম দস্তুরমতো বিখ্যাত লোক। তার ওপর তার আজকের সাজগোজ প্রকাণ্ড পাগড়ির ওপর জগদ্দল হাঁড়ি–এই সমস্ত দেখেশুনে ছেলেপুলের দল চমকে গেল। দামুর সামনে এসে রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে গেল তারা।
ও দামু, তোর মাথায় কী?
প্রথমটায় দামুর খুব অহঙ্কার হল।
দেখতেই পাচ্ছিস পাগড়ি।
পাগড়ির ওপরে ও কী?
হাঁড়ি–হাঁড়ি। দামু দাঁত বের করে বললে, কোথাকার নিরেট গাধা রে সব, হাঁড়ি চিনিসনে?
হাঁড়িতে কী আছে রে দামু?
হাঁড়িতে আবার কী থাকে? চিড়ের মোয়া, নারকোলের নাড়, ছানার মুড়কি–এই সব আছে।
ছেলের দল তাই শুনে আরও ঘন হয়ে এল।
দূটো দে না ভাই দামু, আমরা খাই।
ব্যস, আর যায় কোথায়! তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে উঠল দামু।
আস্পর্ধা তো কম নয়। ঠাকুরমশাই তত্ত্ব নিয়ে যাচ্ছেন কুটুমবাড়ি–আর তাই খেতে দেব তোদের! পথ ছেড়ে দে বলছি শিগগির–
ও দামু, দুটো নাড়-মুড়কি দে দামু–ছেলের দল মজা পেয়ে একসঙ্গে কোরাস ধরল।
নোলা কেটে দেব তোদের।–দামু চিৎকার ছাড়ল : পথ ছাড় শিগগির–যেতে দে—
দুটো মোয়া দিয়ে যা দামু–দামু রে দামু–
পথ তো ছাড়লই না, পেছন থেকে এসে আবার দামুকে কুট করে চিমটিও কেটে দিল একটা।
এরপরে কারও মেজাজ আর ঠিক থাকে–মানে থাকতে পারে কখনও। দামু বোঁ করে একপাক ঘুরে গেল। হাঁক ছাড়ল-হা-রে-রে-রে–তারপর ছেলের দলকে তাড়া করতে গেল।
এর পরে যা ঘটতে যাচ্ছিল সে তো বুঝতেই পারছ। হাঁড়ি আছড়ে পড়ত মাথা থেকে, তারপর ছেলের দলের পোয়া বারো। কিন্তু সেই সময় এসে পড়লেন পঞ্চানন।
এসে পড়লেন ছুটতে ছুটতেই। দূর থেকেই ব্যাপারটা আঁচ করেছিলেন।
এই দামু–কী হচ্ছে–এই—এই–
দ্যাখেন না ঠাকুর মশাই, এই বাঁদরগুলো বলছে–ও দামু আমাদের নাড়মুড়ি খেতে দে।
পঞ্চাননকে দেখে ছেলের দল ছিটকে গিয়েছিল। দুর থেকে তারা চাঁচাতে লাগল : দামু রে দামু–
কে আবার বাঙাল ভাষায় কবিতা মিলিয়ে বললে, মোয়া দে খামু—
দামু তাদের তেড়ে যায় আর কি! খাওয়াচ্ছি মোয়া-দাঁড়া–দাঁড়া–
পেছন থেকে খপাৎ করে পঞ্চানন চেপে ধরলেন তাকে। বললেন, সর্বনাশ করেছে রে, সব যাবে! ওরে দোহাই তোর, ওদের আর তাড়া করতে হবে না, ভালোয় ভালোয় তোকে নিয়ে পৌঁছতে পারলে এখন বাঁচি।
একবার ছেড়ে দেন কতা–দামু তবুও তড়পাতে লাগল : হাতে এই রামলাঠি রয়েছে, কটা বাঁদরকে পিটিয়ে ঢিট করে আসি।
আর ঢিট করতে হবে না বাপু, এতেই যথেষ্ট। নে–চল চল–
গোঁ গোঁ করে দামু এগিয়ে চলল। আর পেছন থেকে শোনা যেতে লাগল : দামু রে দামু–
শুনছেন?
পঞ্চানন বললেন, শুনছি। তাতে আর কী হয়েছে, গায়ে তো ফোস্কা পড়ছে না। পা চালা–পা চালা। কিন্তু এবারে বাপু আমি আর সঙ্গ ছাড়ছিনি। লম্বা ঠ্যাং দুটোকে একটু সামলাও, নইলে দুজনেই বেঘোরে মারা পড়ব।
পথে আর অঘটন কিছু ঘটল না। একবার কেবল একটা পুকুরঘাটে হাঁড়ি নামিয়ে যখন জল খেতে গিয়েছিল দামু, তখন কটা মাছি এসে হাঁড়ির ওপর উড়ে বসছিল আর দামু উপেন্দ্রকিশোরের সেই সাতমার পালোয়ান কানাইয়ের মতো লাঠি হাঁকড়ে সবসুদ্ধ সাবাড়ের জো করেছিল। কিন্তু পঞ্চানন তক্কেতকে ছিলেন, ধাঁ করে সে-যাত্ৰা লাঠিটা কেড়ে নিলেন।
তারপর দুজনে বেয়াইবাড়ি গিয়ে পৌঁছুলেন।
ত্রিলোচন চক্রবর্তীর মস্ত বাড়ি, অনেক টাকা, গরিব পঞ্চাননের তো দেউড়ির সামনে গিয়ে পা আর উঠতেই চায় না। কিন্তু ত্রিলোচন বসেছিলেন বাইরের বৈঠকখানায়, ধান-চালের হিসেব করছিলেন, তিনি হাঁ হাঁ করে ছুটে এলেন।
আরে বেয়াইমশাই যে! কী ভাগ্যি–কী ভাগ্যি! অ্যাদ্দিনে পায়ের ধুলো পড়ল!
