চিঠিটা পড়ে পঞ্চাননের চোখে জল এল। তিন বছর বয়সের যে ফুটফুটে নাতনিটিকে দেখে এসেছিলেন শেষবার, তাকে যেন নতুন করে আবার দেখতে পেলেন। এক মাথা কোঁকড়া চুল, দুষ্টুমিভরা বড় বড় চোখ আর সেই চোখের কাজল গালে-মুখে একাকার। পঞ্চানন এতদিন পরেও যেন তার আধো-আধো গলার ডাক শুনতে পেলেন, দাদু–দাদু!
যে-মেয়েটি তাকে দুবেলা বেঁধে-বেড়ে দেয়, সে বললেন, তা যাও না দাদা, নাতনিকে দেখেই এসো না এবারে। নিজের হাতে চিঠি লিখে তোমায় ডেকে পাঠিয়েছে।
চোখের জল মুখে পঞ্চানন বললেন, কিন্তু নাতনিকে দেখলে যে আমার মেয়েটার কথা মনে পড়বে।
সেজন্যে দুঃখ করে আর কী হবে, দাদা! যে যায় সে তো আর ফিরে আসে না। তাই বলে নাতনিকে তুমি ভুলে থাকবে?
তার ওপরে তারা এখন মস্ত বড়লোক
তারা বড়লোক তো কী হয়েছে। নাতনি তো তোমার।
অনেক ভেবেচিন্তে পঞ্চানন ঠিক করলেন, যাবেন এবারে নাতনিকে দেখতে। যদি আসতে চায়, নিয়েও আসবেন দু-চার দিনের জন্যে। হোক বড়লোকের মেয়ে–গরিব দাদুর ঘরে শাক-পাতা যা জোটে তাই খাবে পেট ভরে।
রওনা হবার দিন পঞ্চানন দেখলেন, রামের মা এক কাণ্ড করে বসে আছে। মুখবাঁধা দুটো মস্ত মস্ত হাঁড়ি তাঁর সঙ্গে যাবার জন্যে তৈরি।
আরে, এ কিসের হাঁড়ি? কী আছে এতে? কুটুমবাড়ি যাবে দাদা, খালি হাতে যাওয়াটা কী ভালো দেখায়? নারকোলের নাড়, চিড়ের মোয়া, মুড়কি–
ওরা বড়লোক, এ-সব খাবে?
বড়লোকে কি সোনা খায়?–রামের মা রাগ করে বললে, খুব খাবে, তরিবত করে খাবে। তুমি নিয়েই যাও না।
কিন্তু চার ক্রোশ রাস্তা, পায়ে হেঁটে যাব, সঙ্গে ছাতা থাকবে, ব্যাগ থাকবে। তায় এত বড় দুটো বাঘা হাঁড়ি, নেব কী করে?
তুমি নেবে কেন? এসব কি কেউ হাতে করে নিয়ে নিজে নিয়ে যায়? সঙ্গে তোমার পাইক যাবে।
পাইক!–পঞ্চানন আকাশ থেকে পড়লেন : আমি কি মহাজন, না জমিদারের নায়েব? পাইকবরকন্দাজ আমি পাব কোথায়?
এই তো আমি হাজির আছি দা-ঠাকুর!
যেন ভূতের গলা শুনছেন, এমনিভাবে চমকে ফিরে তাকলেন পঞ্চানন। দেখলেন, প্রায় হাত ছয়েক লম্বা রোগা কিটকিটে এক তালঢ্যাঙা মূর্তি, গায়ের রঙ ভুসো কালির মতো কালো। সেই মূর্তির মাথায় একহাত উঁচু এক পাগড়ি, হাতে বাঁশের লাঠি। রাত্তিরবেলা। মাঠে-ঘাটে চেহারাখানা দেখলে অতি বড় সাহসীও বাবা গো বলে টেনে দৌড় লাগাবে।
আরে–কে এটা!
আমি দামু এজ্ঞে–জ্যান্ত তালগাছ কান পর্যন্ত দাঁত ছড়িয়ে দিয়ে হাসল : আমায় চিনতে পারলেন না? আপনার দামু–সুদাম দাস।
চিনব কী করে–যা জগদ্দল পাগড়ি চাপিয়েছিস মাথায়! তার ওপরে ওই ঠ্যাঙা।
হিঁ-হিঁ–দামু আরও খুশি হল : এজ্ঞে পাইক হয়ে যাচ্ছি যে আপনার। একটু সাজগোজ করে যাব না?
সে তো বুঝতেই পারছি–পঞ্চানন ব্যাজার হয়ে গেলেন : তোকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব? তুই যে এক নম্বরের ভণ্ডুলরামকী করতে কী করে বসবি তার ঠিক নেই।
এজ্ঞে না, এখন আমি চালাক হয়ে গেছি–দামু বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠল : সঙ্গে নিয়েই দেখেন না আমাকে। কোনও গোলমাল যদি হয়, আমার কান ছিঁড়ে নেবেন।
কান ছিঁড়তে বলছে, সেটা ভালো কথাই। কিন্তু বেঁটে-খাটো ধরনের মানুষ পঞ্চানন সেকান হাতে পাবে কী করে, সেটাই বুঝতে পারলেন না।
সঙ্গে নিয়ে যাও দাদা রামের মা বললে, বোকা-সোকা আছে বটে, কিন্তু দামু ছেলে ভালো। এতটা পথ হেঁটে যাচ্ছ, সঙ্গে ভরসার মতো রইল। তারপর হাঁড়ি-টাঁড়িগুলোও নিয়ে যেতে পারবে। ওকে নিয়ে তোমার কোনও অসুবিধে হবে না, দেখে নিয়ো।
তবু ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন পঞ্চানন। সন্দেহ নেই, দামু মানুষ ভালো। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে, একটু বেশি রকমেরই ভালো। তারও মা-বাপ নেই, আছে কেবল এক মাসি। সে-মাসি লোকের বাড়ির কাজকর্ম করে, ধান-টান ভেনে দিয়ে কোনওমতে দিন চালায়। দামু সেই মাসির আদরেই আছেনইলে এতদিনে তার যে কী হাল হত জোর করে সেকথা বলা শক্ত।
ছেলেটা দারুণ হাবা। একবার কে যেন বলেছিল, দেখে এলাম, আমড়া গাছতলায় তোর ডান কানটা পড়ে আছে–তাই শুনে, নিজের কান পরখ না করেই, আধ মাইল দূরের আমড়াতলায় কান কুড়োতে ছুটেছিল দামু। আর-একবার, তার নিজের বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে, কে যেন তার মাথায় একটা চাঁটি মেরে বলেছিল–তুই তো আর বাড়ি থেকে যেতে পারবি না, তুই হারিয়ে গেছিস–আর তাই শুনে পাক্কা দেড় ঘন্টা দামু সেখানে দাঁড়িয়ে ঘ্যানঘ্যান করে কেঁদেছিল : ওগো–আমি কেমন করে বাড়ি যাব গো–আমি যে হারিয়ে গেছি–মাসি গো
তা এসব হল ছেলেবেলার ব্যাপার। এখন অবশ্য দামুর কুড়িবাইশ বছর বয়েস হয়েছে, অতটা ক্যাবলামিও আর নেই, কিন্তু তাই বলে বুদ্ধিটা যে খুব পেকে উঠেছে তা-ও বলতে পারা যায় না। এখনও দামু যদি হাটে-বাজারে জিনিস কিনতে যায়-ধরো, সে দশ পয়সার কুমডোফালি আর আট পয়সার ঝিঙে কিনে দোকানিকে একটা আধুলি, মানে পঞ্চাশ পয়সা দিয়েছে তা হলে দোকানি হয়তো এইভাবে তাকে হিসেব বুঝিয়ে দেবে : দশ পয়সা আর আট পয়সায় হল চব্বিশ পয়সা–তুমি দিয়েছ–পঞ্চাশ-চব্বিশ আর বারোতে হল পঞ্চাশ–ঠিক তো? (দামু সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লা, হিসেব ঠিক আছে) তা হলে এই নাও বারো পয়সা ফেরত–আর দামু নাচতে নাচতে ওই বারো পয়সাই ফেরত নিয়ে আসবে।
