আমার উদ্দেশ্য ছিল আলাদা। জানো, আমার ব্যবসার ভবিষ্যৎ মালিক তুমি। এত বড় ব্যবসা যার হাতে তুলে দিয়ে যাব, তাকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে যাওয়া দরকার–সব সময় লক্ষ রাখা উচিত তার ওপর। ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে যে-দোকান আমি গড়ে তুলেছি, আনাড়ির হাতে পড়ে তা নষ্ট হয়ে যাবে–আমি তা কোনওমতেই সইতে পারব না।
আজ দুবছর তোমার কাজকর্ম দেখে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলাম। মনে হল না, ছেলেটা পারবে ব্যবসা সামলে রাখতে। সব সময় লক্ষ করি, খদ্দেরদের সঙ্গে তুমি ভালো ব্যবহার করো– কথা কইতে জানো সব রকম লোকের সঙ্গে। তোমার গুণে ব্যবসার উন্নতিও হয়েছে।
তাই খুশি হয়ে তোমাকে একটা নতুন সাইকেল দিলাম। তুমি এটা পেয়ে কেমন যত্ন করে রাখা তাই দেখবার জন্যে–অল্প দিয়ে পরীক্ষা করেছিলাম–বেশি পেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে সব নষ্ট করে না ফেলো। কিন্তু দেখলাম, তুমি সাইকেলটাকে চাবি দিয়ে না রেখে চা খেতে নেপালের দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়লে। তোমার ইচ্ছে চাবি দেবার, কিন্তু আনন্দে ভুলে গেছ। আমিই সাইকেলটা তুলে নিয়ে যাই–পঞ্চু সামন্ত সেটা গোয়ালঘরের খড়ের গাদায় লুকিয়ে রাখে।
তা হলে মামা, ওঁরা আমাদের এত কষ্ট দিলেন কেন? ট্যাঁপা বললে।
কষ্ট দেওয়া হল কেন? জয়কে পরীক্ষা করছিলাম। যদি কিছু খোয়া যায় ওর, আবার তা ফিরিয়ে আনার ধৈর্য-যত্ন-শক্তি আছে কি না তাই দেখছিলাম। ও সে পরীক্ষায় পাশ করেছে। এখন আমার বিশ্বাস হল, বিপদে পড়লে শক্ত হাতে হাতল ধরে বিপদকে কাটিয়ে ওঠবার শক্তি ওর আছে। আমি তোমায় আশীবাদ করি জয়, তুমি জয়ী হও।
এক-হাঁড়ি রসগোল্লা নিয়ে মিচকে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে এসে ঢুকল বাড়ির ভেতর। পেছন পেছনে পঞ্চ সামন্ত, নেপালদা, মোনা পাল। মিটমিট করে মোহনলালও রসগোল্লার হাঁড়িটার দিকে তাকাতে লাগলেন।
ভীমরাজ পুরকায়েত বললেন, ওটা তোমার অনার-এ আনিয়েছি জয়, তুমি ওগুলো সবাইকে ভাগ করে দাও। আয় ট্যাঁপা, তুই আমায় হেলপ কর।–বিজয়ীর হাসি হেসে জয়ধ্বজ ট্যাঁপাকে বললে।
পঞ্চাননের হাতি (উপন্যাস)
পঞ্চানন মুখোঁপাধ্যায়ের তিন কুলে আর কেউ ছিল না–শুধু আট বছরের একটি ফুটফুটে নাতনি ছাড়া। সে-নাতনিও তাঁর কাছে থাকে না, থাকে তাঁর ঠাকুর্দা ত্রিলোচন চক্রবর্তীর বাড়িতে। অর্থাৎ পঞ্চানন হচ্ছেন নাতনির দাদু।
পঞ্চাননের বাপ-মা তো সেই কবে মারা গেছেন–সে তো তিন যুগ আগে। ভাই-বোন বলতেও কেউ ছিল না। স্ত্রী মারা গেলেন বছর দশেকের একটি মেয়েকে রেখে। পঞ্চানন সেই মেয়েটিকে বড় করলেন, অনেক খুঁজেপেতে তিনখানা গাঁয়ের পরে ত্রিলোচন চক্রবর্তীর একমাত্র ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। ছেলেটির নাম নিতাই, খুব ভালো ছেলে বিএ পাশ করে কী সব ব্যবসা-ট্যাবসা করত। মেয়েটাকে সুখী দেখে পঞ্চাননের আনন্দের সীমা রইল না।
কিন্তু বরাত আর কাকে বলে!
নাতনি রুনকুমার ভালো নাম স্বাতী–তার যখন তিন বছর বয়েস, তখন দুদিনের সামান্য একটু অসুখেই তার মা চোখ বুজল চিরকালের মতো। শোকে-দুঃখে একেবারে পাথর হয়ে গেলেন পঞ্চানন। পঁয়তাল্লিশ বছরেই তিনি যেন ষাট বছরের বুড়ো হয়ে গেলেন।
তারপর আরও পাঁচটা বছর পার হল।
মেয়ের মৃত্যুর পর আর বেয়াইবাড়ি যাননি পঞ্চানন–একবারের জন্যেও না। মা-মরা নাতনিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন কী করে? ত্রিলোচন চিঠি লিখেছেন, বেয়াই, একটিবার অন্তত আসুন। জামাই নিতাই দু-তিনবার এসে ঘুরেও গেছে। পঞ্চানন যাননি–যেতেই পারেননি।
এর মধ্যে অবশ্য ত্রিলোচন চক্রবর্তী অবস্থা পাল্টে ফেলেছেন। ব্যবসার বুদ্ধি তাঁর ছিলই, নিতাইয়ের মাথাটা খুব সাফ, এই সাত-আট বছরের ভেতরে বাপ-ছেলেতে মিলে অনেক টাকা রোজগার করেছেন। ছিলেন সাধারণ গেরস্ত, হয়েছেন পেল্লায় বড়লোক। মস্ত তিনতলা বাড়ি করেছেন, অনেক জমি-জমা পুকুরবাগান এই সব হয়েছে–এমনকি একখানা মোটর গাড়ি পর্যন্ত কেনা হয়েছে। সেই গাড়িতে চড়ে তার ভোঁপ-ভোঁপ আওয়াজে গাঁয়ের গোরু-মোষকে চমকে দিয়ে নিতাই মধ্যে-মধ্যে ব্যবসার খাতিরে শহরে যায়।
পঞ্চাননের মনে আর একটা বাধা এইখানেই। তিনি গরিব মানুষ, পুরুতগিরি করে খান, সামান্য জমি থেকে যা ধান-টান আসে, তাতে একলা মানুষের কষ্টেসৃষ্টে চলে যায়। রামের মা বলে গাঁয়ের একটি অনাথা দূর সম্পর্কের বিধবা আত্মীয়া আছে, সে-ই এসে তাঁকে দুবেলা দুটো বেঁধে দেয়।
তাঁর নাতনি বড়লোকের আদরের দুলালী। ঠাকুদার চোখের মণি বাপ তার জন্যে পাগল, ঝি-চাকরে তাকে সব সময় আগলে রাখে। তায় দুবছর হল নিতাই কলকাতার কোন সাহেবি স্কুলে নিয়ে গিয়ে পড়াচ্ছে। নিতান্তই পেঁয়ো পুরুত ঠাকুর পঞ্চানন মুখুজ্যেকে সে কি আর চিনতে পারবে? এক-আধবার ভেবেছেন দু চারদিনের জন্যে রুনকুকে কাছে এনে রাখবেন, কিন্তু তাঁর এই মাটির দাওয়া আর এই টিনের ঘর–এখানে এসে কি সে থাকতে পারবে? যে রাজভোগ খায়, মোটা চালের ভাত আর শাক-তরকারি কি তার মুখে রুচবে?
এই সব ভেবেই পঞ্চানন এতদিন চুপ করে ছিলেন, এমন সময় একদিন একখানা ছোট্ট চিঠি এল তাঁর নামে। ছেলেমানুষী কাঁচা অক্ষরে লেখা–
দাদু, আমি গরমের ছুটিতে কলকাতা থেকে এখানে এসেছি। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। তুমি কেন আমার কাছে আসছ না? প্রণাম নিয়ো। রুনকু।
