আচ্ছা চল, পা টিপে টিপে এগোই আমরা। না এগিয়ে তো কোনও উপায়ও নেই।
ওরা আস্তে আস্তে এগোতে লাগল।
ট্যাঁপা!–জয় ডাকল : মোহনলালের ধাঁধাটার কথা তোর মনে আছে?
হ্যাঁ, কেন থাকবে না? খুব মনে আছে–
চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।
কোত্থেকে এল ওই যে কে এক মোহনলাল-ধাঁধা-ফাঁধা নিয়ে কী যে, এক পাগলামি করতে লাগল। আর জয়, তোর মাথায়ও সেই পাগলামি ঢুকেছে দেখছি।কিসের বা চিন্তামণি, আর কিসের বা গৌ-মাতা! যত সব পাগলামো
জয় মাথা নাড়ল, চুপ কর–চুপ কর। আমি ভাবছি ধাঁধাটার কথা। আর অত কথা বলিস না, শেষে ধরা পড়ে যেতে হবে। একেই তো সকাল থেকে কার মুখ দেখে যেন আজ উঠেছি। সাইকেলটা চুরি গেল, তারপর থেকে সারা সকাল আমাদের ওপর দিয়ে যা যাচ্ছে, তার কোনও তুলনা নেই। এরপরেও হয়তো আরও কত কষ্ট আছে কে জানে!
ওরা ধীরে ধীরে এগোতে লাগল।
নিশুতি রাত। পঞ্চ সামন্তের বাড়ির সবাই অঘোর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে। ওরা ধীরে ধীরে খড়ের গাদার কাছে এগিয়ে এল, কিন্তু খড় টানতে দ্বিধা করতে লাগল। যদি শব্দ হয়, তাহলে সবাই তো জেগে যাবে। ধরাও পড়ে যাবে, কাজও হবে না।
ট্যাঁপা বললে, এখানেই বসি না আমরা! গোয়ালঘরে যাবার আমাদের কী দরকার?
জয় বললে, না। জানলাটা ওদের ঘর বরাবর। ওটা খুললেই আমাদের স্পষ্ট দেখা যাবে। তার ওপর একটু যদি নড়াচড়া করি তারও শব্দ শোনা যাবে। আর গোয়ালঘরে থাকলে গোরুর নড়াচড়ায় ওরা ভাববে যে গোরই ওরকম করছে। ওখানে যে মানুষ আছে, ওরা তা ভাবতেও পারবে না। তুই ধীরে ধীরে খানিকটা খড় ওপাশ থেকে টেনে নে। গোরুগুলোকে একটু ঠাণ্ডা করতে না পারলে ওরা আমাদের ওখানে কিছুতেই স্থির হয়ে বসতে দেবে না।
জয় এগিয়ে গেল পা টিপে টিপে; পেছনে ট্যাঁপা। ঘরের এক কোনে খড়ের গাদার কাছে গিয়ে গোরুকে দেবার জন্যে গাদায় টান পড়তেই কী যেন লাগল হাতে।
জয় চাপা গলায় ট্যাঁপা–! বলে ডাক দিয়ে জোরে টান দিতেই হুড়মুড় করে একটা কচকে নতুন সাইকেল মাটিতে পড়ে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘর থেকে পঞ্চ সামন্ত চোর–চোর! মিচকে, লাঠি নিয়ে আয়, গোয়ালে চোর ঢুকেছে। বলে কে হাতে ইয়া এক বোম্বাই গদার মত লাঠি আর এক হাতে লণ্ঠন নিয়ে ছুটে এল।
.
এগারো
না–না করতে করতেও জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপার পিঠে বেশ গোটা কতক জোর রদ্দা ধাঁই ধাঁই করে পড়ে গেল। পঞ্চুমামা যেন কথাগুলো শুনেও শোনেন না। ট্যাঁপা চিৎকার করে। বললে, এ যেমন রদ্দা হাঁকড়াচ্ছে–আমার কানটা কানপুরে, নাকটা নাগপুরে পাঠিয়ে আমায় টেনিদার ভাষায় মুগ্ধবোধ করে ছাড়বে! চিৎকার কর—
ও পঞ্চুমামা!–আমরা জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা!
এতক্ষণে যেন কথাটা পথুমামার কানে গেল।
ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
উঠনের ওপরে নতুন সাইকেলটা ভোরের আলোয় চকচক করছে। তাকিয়ে তাকিয়ে জয়ধ্বজের মনে পড়ছে–সাইকেল নয় তো, যেন রাজত্ব। যেদিন সকালে ব্রাউন পেপারে মোড়া নতুন সাইকেলটা তাকে দেখিয়ে মামা বললেন, ওটা তোর, তোকে দিলুম–সেদিন জয়ধ্বজ প্রথমটা বিশ্বাসই করতে পারেনি। একটা সাইকেলের শখ যে তার কতদিনের, সে কথা তার চেয়ে বেশি করে কে জানে! এ যেন না চাইতেই হাতে স্বর্গ পেয়ে যাওয়া!
হঠাৎ চমক ভাঙল। মোহনলাল আসছেন মিটমিট করে তার দিকে তাকাতে তাকাতে–
চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।
–বলি জয়ধ্বজ, ধাঁধার উত্তরটা এবার এল তোমার? কিছু চিন্তা করে পেলে?
জয়ধ্বজ মাথা নিচু করল। কোনও কথা বলল না।
তোমার মামা তোমার খুব প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, যেমন কাজের ছেলে, তেমনি সাবধানী আর সেই রকম দায়িত্বজ্ঞান। তার প্রমাণ পেলাম। কিন্তু পাবার আগে তো পরীক্ষার প্রয়োজন; তাই মোনাকে বলে তোমাদের সাইকেলটা খোঁজার সোজা পথটা একটু বাঁকা করে দিলাম। যাকে তার মামা এত প্রশংসা করছেন, তাকে একটু যাচাই করা প্রয়োজন বইকি! তুমি কী বলো ট্যাঁপা?
ট্যাঁপা এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল।
তবে ঘোরানোটা একটু বেশি হয়ে গেছে।–মোহনলাল দাওয়ার ওপর একটা জলচৌকি নিয়ে বসে পড়লেন।
দরজার কাছে একটা শব্দ হল। মিচকে ঢুকছে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে। সঙ্গে ভীমরাজ পুরকায়েত।
জয়ধ্বজ ছুটে মামার কাছে এগিয়ে গেল।
জয়।–মামা ডাকলেন।–আমার কাছে দাওয়ার ওপরে বসো।
পঞ্চু সামন্ত মিচকেকে নিয়ে একটু বেরিয়ে গেল–মামা, এক্ষুনি আসছি।
ভীমরাজ পুরকায়েত জয় আর ট্যাঁপাকে দাওয়ার ওপর বসিয়ে বললেন, দেখো, জয়ধ্বজ, তোমার সঙ্গে আমার একটা কথা আছে। লম্বা রোগা চেহারার লোকটি এবার বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন।
তুমি জানো জয়ধ্বজ, আমি নিজের চেষ্টায় এত বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছি। এত সম্পত্তি করেছি। আমি একটি দিন বিশ্রাম করিনি, কখনও অলস, অসাবধান হইনি।
দিদি তোমার কথা বলতেই, আমি তোমাকে আমার দোকানে কাজ শেখাবার জন্য নিয়েছিলাম। তুমি কাজে প্রথম বিরক্ত হতে। আমি নামা ধনেখালি, আর শান্তিপুরী, দেখা বেগমপুর বললেই তোমার ভুরু কুঁচকে আসত। আস্তে আস্তে তুমি কাজের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিলে। তোমার সবটাই সয়ে গেল। আস্তে আস্তে কাজটা ভালো লাগতে শুরু করল। আমি আগাগোড়াই নজর রেখে চললাম। ভুলচুক হলে ছোটখাটো ধমক দিতাম–এ ব্যবসার কাজ বাপু, সব সময় মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতে হয়।
