ধরতে পারলে তো টক করেই হয়ে যায়, কিন্তু ধরতে পারাটাই তো সমস্যা। ট্যাঁপা বলল।
ওই মিচকে সব জানে। পঞ্চুমামাকে কোনওমতে যদি ধরা যায়, তা হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, আমি মনে করি।–জয় বললে।–সে নিশ্চয়ই কোথাও লুকিয়ে আছে। ওই মিচকে সব জানে, কিন্তু বলবে না। সে যায়নি, এখানেই কোথাও আছে।
কিন্তু কোথায় যে আছে সেই তো কথা। ট্যাঁপা বললে–এখন আর বসে থেকে লাভ নেই, চল আমরা এগিয়ে চলি। বড্ড খিদে আর তেষ্টা পেয়েছে। একটু দূরেই আমার এক দূর-সম্পর্কের পিসিমা থাকেন, তাঁর কাছে গিয়ে খেয়ে নিই নইলে আর চলতে পারছি না।
ওরা দুজনেই এগিয়ে চলতে লাগল। বেলা পড়ে আসছে। দূরে সূর্য মাঠের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে ধীরে ধীরে। ওরা এগিয়েই চলতে লাগল। পিসিমার বাড়ি তখন দেখা যাচ্ছে।
পিসিমারা গ্রামের সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ। অনেক খেতখামার, পুকুর, বাগান–গোয়াল-ভরা গোরু, মরাই-ভরা ধান।
ওরা এগিয়ে যেতেই লাগল। সন্ধে তখন, পিসিমা তুলসীতলায় আলো দিচ্ছেন। ওরা দুজন উঠনে এসে দাঁড়াতেই দেখল, পিসিমা তুলসীতলায় প্রণাম করলেন।
পিসিমা, আমি আর আমার এক বন্ধু এসেছি। বড্ড খিদে পেয়েছে আমাদের, শিগগির কিছু খেতে দাও–
ওরা ধপ করে বারান্দার ওপর বসে পড়তেই ঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেখা গেল, কে যেন একজন ছায়ার মতো টুক করে পাছ-দরজা দিয়ে বাগানের মধ্যে নেমে পড়ল।
পঞ্চুমামা না?–জয় চিৎকার করে উঠল।
.
দশ
ট্যাঁপা চিৎকার করে উঠল, পঞ্চুমামা! তারপর পটলডাঙার টেনিদাকে কোট করে বললে, ডি লা গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস।
জয় বললে, ইয়াক–ইয়াক–ছোট-ছোট–
খাওয়া রইল মাথায়, ওরা পঞ্চু সামন্তের পেছনে ছুটতে লাগল।
খানিকটা সোজা পথে ছুটে লোকটা জঙ্গলের বাঁকা পথ ধরল।
তখন অন্ধকার নেমে গেছে। জঙ্গল-পথ বাঁকা, তার ওপর একটা কালো চাঁদরে লোকটার মুখ ঢাকা। ওরা কিছু ঠাহর করবার আগেই লোকটা তার পরিচিত পথ ধরে কোথায় কোনদিকে উধাও হয়ে গেল। একে অন্ধকারে ভালো দেখা যায় না, তার ওপর অপরিচিত পথ। ওরা অনেকটা ছুটেও লোকটাকে ধরতে পারল না, কোথায় যেন মিলিয়ে গেল সে।
ওরা ঘুরতে ঘুরতে ফের একটা বড় গোয়ালঘরের পাশে চলে এল। জয়ধ্বজ বললে, আমরা আজ আর বাড়ি যাব না। রাতে এই গোয়ালঘরেই থাকব। পাশেই তো ওই পথুমামার বিরাট গোয়াল, সকালে ওখানে পঞ্চুমামা আসবেই। তখন–
একটু অন্যমনস্কভাবে আবার বলল জয়ধ্বজ, মামা সাইকেলটা দেবার সময় আমাকে বলেছিলেন, যত্ন করে রাখিস–কেউ চুরি-টুরি করে না নিয়ে যায়। আমি বলেছিলুম, কোনও চোরের ঘাড়ে তিনটে মাথা নেই যে, জয়ধ্বজ মণ্ডলের সাইকেল চুরি করে নেবে। মামা বলেছিলেন, বেশ, দেখব, কেমন হুঁশিয়ার ছেলে তুই। সাইকেলটা উদ্ধার না করে মামার কাছে দাঁড়াতে পারব আমি! প্রেসটিজ থাকবে আমার?
তা বটে–তা বটে! ট্যাঁপা ভাবনায় পড়ল।
গেজেট সুরেশ হালদার এতক্ষণে খুকখুক করে কাশতে কাশতে গিয়ে নিশ্চয়ই খবর দিয়েছে মামাকে-নেপালের চায়ের দোকান থেকে তোমার ভাগনের সাইকেলটা লোপাট। জানি না মামা আমাকে এ-সব শোনবার পর কী ভাবছে। না ট্যাঁপা, আমি এই গোয়ালঘরেই বসলাম, সাইকেল উদ্ধার না করে আমি আর কোথাও যাব না। যদি পাই, তখন মুখ করে বলতে পারব–দ্যাখো মামা, এই সাইকেল–জয়ধ্বজ মণ্ডলের জিনিস কেউ হজম করতে পারে না।
ওরা গোয়ালঘরের ভেতরেই একপাশে বসে পড়ল। কিন্তু গোয়ালটা বড্ড নোংরা, পাঁক আর কাদায় ভরা। বসবার জায়গা নেই। ট্যাঁপা বললে, চল না, আমরা পাশের পঞ্চুমামার গোয়ালঘরে গিয়ে বসি, ওটা বরং বেশ পরিষ্কার আছে।
ওরা পাশের বেড়াটা পার হয়ে পথু সামন্তের গোয়ালঘরে গিয়ে ঢুকল।
গোয়ালটা পরিষ্কার বটে, তবে মশার হাত থেকে বাঁচা শক্ত। মেঘের মতো কালো হয়ে এসে মশারা ওদের হেঁকে ধরল। দুহাত দিয়ে সরিয়েও নিষ্কৃতি নেই, সর্বাঙ্গ যেন ফুলিয়ে দিল।
তার ওপর আর-এক উৎপাত। একটা গোরু পাশে দাঁড়িয়েছিল, খসখসে জিভ দিয়ে সমানে জয়ের গা চেটে চেটে চামড়া উঠিয়ে দিতে লাগল যেন সে। জয় যত পেছনে সরে যায়, গোরুটাও ততই এগিয়ে আসে। আর সরবে কোথায়? পেছনেও তো গোরুর পাল।
ট্যাঁপা বললে, পাশের ঘরে খড় জমা করা আছে। চল, খানিকটা খড় ওদের মুখের সামনে এনে দিতে পারলে আর গা চাটবে না–খড় খাওয়াতেই মন দিয়ে দেবে।
তাই চল, খানিকটা খড়ই এনে দিই গোরুটাকে। ও তো চেটে চেটে আমার গায়ে অর্ধেক চামড়া তুলে নিলে।
কিন্তু খড় টানতে গেলে তো শব্দ হবে। ওরা যদি চোর মনে করে আমাদের ওপর মারধোর করে!–ট্যাঁপা হঠাৎ ভেবে বললে।
তার তো সম্ভাবনা প্রচুর, কিন্তু কী করা যায় বল? যেভাবে গোরুগুলো আমাদের চাটতে আরম্ভ করেছে তাতে এখানে যদি একটুও বসে থাকি, ওরা আমাদের গায়ের আর একটু চামড়াও রাখবে না। তার ওপর মশা আর ডাঁশ তো আছেই।
কী করা যায়? চল দেখি, চুপি চুপি যাই।–ট্যাঁপা, তুই একটুও শব্দ করবি না। আর খড়ও টানবি খুব ধীরে ধীরে, যেন একটুও শব্দ না হয়। ওরা যেন কিছুই জানতে না পারে। তা হলে আমাকে আর তোকে ওরা আস্ত রাখবে না।
তা বটে! আগে তো হাতের সুখ করে নেবে চোর বলে; পরে জানতে পারলে হয়তো আপসোস করবে। কিন্তু তাতে তো আমাদের গায়ের জ্বালা কমবে না।
