পিসি বারান্দায় বসে বড়ি দিচ্ছিল, ফিরেও তাকাল না। আবার ডাক ছাড়ল জয়ধ্বজ : পঞ্চুমামা, বাড়ি আছ?
পিসির যেন ভ্রুক্ষেপও নেই।
এবার ট্যাঁপা বাজখাঁই গলায় এক পেল্লায় হাঁক ছাড়ল–ও পিসি, বলি পঞ্চুমামা, কোথায়?
পিসি বড়ি দেবার ছোট টিনটা হাতে নিয়ে বারান্দা থেকে নেমে সেটাকে উঠোনের রোদে রেখে ইশারায় বললে, ভালো তো ব?
জয়ধ্বজ বললে, ভালো, কিন্তু পঞ্চুমামা কোথায়?
পিসি আবার একগাল হেসে ইশারায় বললে, তোর মার শরীর—
ভালো; কিন্তু পঞ্চুমামা কোথায়?
পিসি এবার গম্ভীর হয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল।
ও পিসি, কাঁদো কেন? পঞ্চুমামা কোথায়?–ট্যাঁপা এবার চিৎকার করে বললে।
সমস্ত মুখে একটা প্রচণ্ড ভয়ের ছায়া পড়ল পিসির। তারপর হাঁউমাউ করে একটা শব্দ করল খানিকক্ষণ। তারপর চটপট বড়ি দিয়ে চড়চড়ে হাতটা ধোবার জন্যে কুয়োর পাড়ের দিকে এগিয়ে গেল।
ট্যাঁপা ধপ করে বারান্দায় বসে পড়ল।–জয়, এই বোবা কালা বুড়ীর সঙ্গে এভাবে কতক্ষণ কথা বলব বল তো? ও তো কিছুই বোঝে না! আর বলতেও পারে না।
জয়ধ্বজ বসে বসে ভাবতে লাগল। বললে, বুঝতে যদি পারে, তা হলে ওর কাছেই পঞ্চুমামার একটা হদিস মিলতেও পারে।
কিন্তু পিসিকে বোঝানো যাবে কী করে? ট্যাঁপা বললে, বোঝাতেই হবে যেমন করে হোক। পিসি লোক খুব ভালো, কিন্তু ভারি সাদাসিধে মানুষ। বিশেষ ঘোরপ্যাঁচ বোঝে না। এজন্যে পঞ্চুমামা ওকে খুব বকাবকি করে।
দেখ না তুই চেষ্টা করে, ওকে বোঝানোই যে শক্ত কাজ। যাক, হাত ধুয়ে আসুক তো আগে!
পিসি দুগ্লাস জল হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। একটা রেকাবিতে দুটো নারকেলের নাড়। ইশারায় বললে, খাও তোমরা।
কী বিপদ! পিসি আমাদের হাঁপাতে দেখে ভেবেছে যে, জলতেষ্টায় আমরা মরে যাচ্ছি, এখুনি জল না পেলে আমাদের প্রাণ যাবে। তাই তাড়াতাড়ি জল আর নাড় এনে দিয়েছে।
জয় টপ করে রেকাবি থেকে একটা নাড় তুলে নিয়ে পিসির হাত থেকে জলের গ্লাসটা নিয়ে পিসিকে ইশারায় বললে, এখানে বসোকথা আছে। ট্যাঁপা, তুই নাড় আর জলটা খেয়ে ফেল, তারপর পিসিকে নিয়ে আমাদের পড়তে হবে।
নাড়ু আর জলটা খেয়ে জয় আর ট্যাঁপা কিছুটা সুস্থ হল। তারপর পিসির কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলে, পিসি, পঞ্চুমামা কোথায়?
পিসি ঘাড় নেড়ে জানাল, কী?–বুঝতে পারছি না।
পঞ্চুমামা–সাইকেলের দোকান করে যে।–ট্যাঁপা মুখ দিয়ে কিরিং-কিরিং শব্দ করে বারান্দায় খানিকটা দৌড়ে বোঝাতে চাইল–যে-গাড়ি বেল বাজায় আর দুপায়ে গড়গড় করে চলে।
পিসি অবাক হয়ে ওদের দুজনের মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী যেন বুঝতে চাইল। তারপর খানিকটা কী ভেবে নিয়ে ইশারায় জানাল : ঘরেই তো ছিল খাটে ঘুমিয়ে, এখন সে কোথায় গেছে জানি না– তারপর নিজেই যেন অবাক হয়ে ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল।
যত সব বোবা কালাকে নিয়ে পড়া গেছে!–ট্যাঁপা বললে।–আমার মনে হচ্ছে উনি কিছু বুঝতেই পারছেন না।
পারছে না আবার! এমনিতে তো ঠোঁট নড়লেই অন্যদিন সব বুঝতে পারে, আজ একেবারে ন্যাকা সেজে গেছে যেন! কিছুতেই কিছু বুঝবে না ঠিক করেছে। ওর কাছ থেকে যে করেই হোক কথা বের করতেই হবে ট্যাঁপা, ধৈর্য হারালে চলবে না।–জয় বললে।
পিসি এক-একবার করে ইশারা করে, আবার ঘরের দিকে তাকায়, আবার বারান্দার কোনে কী যেন দেখে।
জয় বললে, পিসি, মিচকে কোথায়?
পিসি মাথা নাড়ল। বুঝতে পারছে না।
ট্যাঁপা বললে, মিচকে কি এখানেই থাকে?
জয় বললে, হ্যাঁ। ও পিসির খুব আদরের, ওকে পিসি ছেলের মত করে মানুষ করেছে। পিসির কেউ নেই কিনা। কিন্তু পিসি ঘরের মধ্যে বার বার তাকাচ্ছে কেন? ওখানে কী আছে?
পিসি, মিচকে কি পঞ্চুমামার খোঁজে গেছে?
পিসি শুধু ফিক ফিক করে হাসতে লাগল, কোনও কথার উত্তর দিল না।
সব বুঝছে, কিন্তু ন্যাকামির ভান করছে। জয় বললে।
কিন্তু উনি যদি কিছু না বলেন এই না বোঝার ভান করে, তা হলে আমরা কী করব? আমাদের তো করবার কিছু নেই। চল, চলে যাই–
করবার কিছু নেই? কী করি দেখ তা হলে।
.
নয়
মিচকে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হাসছিল।
জয়ধ্বজ বললে : তবে রে। যত শয়তানীর মূলে এই ছোঁড়াটা। ও সব জানে কিন্তু বলবে না। ধর তো ট্যাঁপা, ওকে।
ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ ওর পেছনে ধাওয়া করতেই ও সেই ছড়াটা আওড়াতে আওড়াতে ছুট দিল তীরের মত বেগে
চিন্তামণি নেই কো বনে,
আছেন তিনি ঘরের কোণে
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে,
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।
দৌড়ে মিচকের সঙ্গে পারে সাধ্য কার?
খানিকটা ছুটে ট্যাঁপা বসে পড়ল।
বসলি যে?–জয় বললে,।
না, বসব না! চটেমটে ট্যাঁপা উত্তর দিল, ওর পেছনে পেছনে ছুটে কি ওকে ধরতে পারা যাবে? শুধু দৌড়নোই সার হবে। মোহনলাল, মিচকে, নেপালদা, পঞ্চু সামন্ত–এদের সবার যোগ আছে সাইকেল-চোরের সঙ্গে।
জয়ধ্বজও হাঁপাচ্ছিল। বললে, আমারও মনে হচ্ছে ওদের মধ্যে যে-কোনও একজনের কাছ থেকেই সব ব্যাপারটা জানা যেতে পারে। ওদের নিজেদের মধ্যে সাঁট আছে। তা ছাড়া আর একটা কথা আমার কেমন মনে হচ্ছে, সবটাই যেন চোখের সামনে রয়েছে অথচ আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। যেন সেইসব প্রশ্নের অঙ্কের মত–পড়লে ধাঁধা লাগে, কিন্তু জিনিসটা ধরতে পারলেই টক করে হয়ে যায়।
