ট্যাঁপা হঠাৎ শিউরে উঠল : আচ্ছা, এমন তত হতে পারে, নেপালদার সঙ্গে চোরের বন্দোবস্ত আছে?
জয়ধ্বজ হাসল।
যাঃ।
যাঃ কেন? অসম্ভব নাকি? ট্যাঁপা এবার গোয়েন্দা-গল্পের লাইনে ভাবতে আরম্ভ করেছিল : বুঝলি, বাইরে থেকে যাকে সবচেয়ে ইনোসেন্ট মনে হয়, আসলে হয়তো দেখা যায় সে-ই সব চাইতে বড় ক্রিমিন্যাল। শার্লক হোমসের একটা গল্পে
আরে দূর শার্লক হোমস!্যাঁপার এসব ভালো ভালো চিন্তাকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলে জয়ধ্বজ : গল্পের কথা রাখ। জানিস, অনেক সময় নেপালদা কলকাতায় গেলে মামা তার হাতে দুতিন হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে দেয় দোকানের জিনিস কেনবার জন্যে? এত বিশ্বাস করে যে, বলে–নেপালের কাছ থেকে হিসেব মেলাবারও দরকার নেই। আর যারই হোক, মামার কখনও লোক চিনতে ভুল হয় না।
তোর ভারি বিচ্ছিরি স্বভাব, জয়! ভেবেচিন্তে কু বের করি, আর সঙ্গে সঙ্গে তুই সব গুলিয়ে দিস।
জয়ধ্বজ বললে, কী করা যায় বল? মিথ্যে কুর পেছনে ছুটে তো কোনও লাভ নেই। আমার কেবল মনে হচ্ছে সবটাই যেন চোখের সামনে রয়েছে অথচ আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না। যেন সেইসব প্রশ্নের অঙ্কের মতো–পড়লে ধাঁধা লাগে, কিন্তু জিনিসটা ধরতে পারলেই টক করে হয়ে যায়।
বিরক্ত হয়ে ট্যাঁপা বললে, মোনা পালকে ধরলেই অঙ্কের ফল মিলে যেত।
নিশ্চয়। একটুও সন্দেহ নেই।–জয়ধ্বজ মাথা নাড়ল : আমাদের ধোঁকা দিয়ে বেমালুম পালিয়ে গেল। আর সামনে থেকে পালালেই বা কী করা যেত? এখন চুরি করে না, কিন্তু চোরের ঠ্যাং তো–তার সঙ্গে দৌড়ে পাল্লা দেওয়া তোর-আমার কাজ নয়।
লোকটার কানে আরও গোটা দুই চিৎকার ছাড়তে পারলে কাজ হত–ট্যাঁপা গজগজ করতে লাগল।
তা হত। কিন্তু সেকান যে এখন কমাইল দূরে, তা কে জানে!
তাই বলে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি?
নাঃ–চল, পঞ্চু সামন্তের ওখানে যাওয়া যাক। ওরই তো সাইকেলের দোকান আছে তমলুকে, চোরাই সাইকেল পাচার করে দেওয়া ওর পক্ষেই সম্ভব।
আবার চলা। ট্যাঁপা ক্রমশ বিরক্ত হচ্ছে, ভাবছে–এখন মোনা পালকেই খুঁজে বের করা উচিত, তা হলে সব পরিষ্কার হয়ে যায়। আর মাথার ভেতর একটা চিন্তাই পাক খাচ্ছে জয়ধ্বজের : চোখের সামনে থেকে সাইকেলটা তুলে নিয়ে গেল, তবু কেন দেখতে পেল না। নেপালদা–কেন?
আর চোরের সঙ্গে কোনও যোগ আছে নেপালদার–এ কথা পাগলেও ভাবতে পারে না।
পঞ্চু সামন্তের একটা ছোট দোকান আছে এখানেও। সকালটা সে এখানে থাকে, বিকেলে বাসে চেপে তমলুক যায়।
দোকানের সামনে, একটা প্রকাণ্ড পাম্পারের ওপর প্রায় বৈঠকি দিয়ে একটা সাইকেল-রিকশার চাকায় হাওয়া ভরছিল মিচকে। পঞ্চুর ভাইপো। তার ভালো নাম একটা কিছু নিশ্চয় আছে, কিন্তু সবাই তাকে মিচকে বলেই ডাকে। নামটা বেমানান নয়, ভারি ঘুঘু ছেলে।
ওদের আসতে দেখেই কেমন যেন আড়চোখে তাকাল মিচকে, তারপরেই আবার পাম্পারের ওপর বৈঠকি দিতে লাগল।
ট্যাঁপা বললে, কেমন সন্দেহজনকভাবে তাকাল–দেখেছিস জয়?
জয়ধ্বজ বললে, হুঁ।
ওরা দাঁড়িয়ে রইল, মিচকে হুস হুস করে পাম্প দিতে লাগল। পাম্প হয়ে গেলে, রিকশাওলা নিতাই কৈরী তার পাঞ্জাব মেল নাম লেখা রিকশাটা নিয়ে বেল বাজাতে বাজাতে স্টেশনের দিকে রওনা হল।
তখন জয়ধ্বজ ডাকল :এই মিচকে!
দাঁড়াও না–একটু জিরিয়ে নিই। হাঁপিয়ে গেছি–দেখছ না?–হাফপ্যান্টের পকেট থেকে একটা তেলকালি-মাখা রুমাল বের করে মুখ মুছতে লাগল মিচকে। ওরা দাঁড়িয়ে রইল।
একটু সময় দিয়ে জয়ধ্বজ বললে, এই মিচকে, পঞ্চুমামা কোথায় রে?
গ্রাম সুবাদে পঞ্চ কীরকম মামা হয় জয়ধ্বজের। মিচকে বললে, মেজো কাকা? সে এখানে নেই, তমলুকে গেছে।
মিথ্যে কথা।–জয়ধ্বজ ধমকে উঠল : পঞ্চুমামা এ-বেলা কখনও তমলুকে যায় না, তায় আজকে ছুটির দিন।
তবু গেছে।
না–যায়নি।
মিচকে আবার সন্দেহজনকভাবে তাকাল। তারপর মিনমিন করে বলল, তবে তাই–তোমরা যখন বলছ, তা হলে যায়নি।
আছে কোথায় এখন?
আমি জানিনে।
জানিসনে?–জয়ধ্বজ চেঁচিয়ে উঠল : আবার মিথ্যে কথা?
তখন মিচকে মুখটাকে অদ্ভুত কাঁচুমাচু করে বললে, জানি জয়দা, জানি। কিন্তু বলব না–কক্ষনো বলব না।
কেন বলবি না?–জয়ধ্বজ একটা কড়া ধমক দিল।–তোকে বলতেই হবে। এই ট্যাঁপা, ধর তো ওকে। কেমন ও না বলে দেখি।–জানি কিন্তু বলব নাকক্ষনো বলব না!–কেমন না বলে আমি দেখছি—
কিন্তু কথা জয়ধ্বজের মুখেই রইল। দারুণ ঘুঘু ছেলে মিচকে, সে প্রচণ্ড বেগে একটা দৌড় দিল।
ধর–ধর করে ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ তার পেছু পেছু ছুটল।
কিন্তু মিচকের পায়ে তখন অলিম্পিক স্পিড। খানিকটা ছোটার পর মিচকে ওদের ছাড়িয়ে জঙ্গল পার হয়ে কোথায় চলে গেল চোখের নিমেষে!
ট্যাঁপা দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।–আর যাব না। কী হবে গিয়ে? মিচকেকে কিছুতেই ধরা যাবে না।
জয়ধ্বজও বসে পড়ে হাঁপাতে লাগল। খানিকটা পর একটু জিরিয়ে নিয়ে বললে, চল তো পঞ্চ সামন্তের বাড়ি, দেখি গিয়ে তাকে পাওয়া যায় কিনা।
.
আট
পঞ্চু সামন্তের বাড়ি এখান থেকে বেশি দূরে নয়। ওরা হাঁটতে লাগল দ্রুত পায়ে।
পঞ্চু সামন্তের বাড়িতে কেউ নেই, আছে এক বুড়ি বোবা পিসি। সেই ওদের দেখাশোনা করে, বেঁধে-টেধে দেয়। পিসি বোবা হলে কী হবে, তোক খুব ভালো।
জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা গিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাক দিল : পঞ্চুমামা–ও পঞ্চুমামা!
