ধরা যাবে না। বুড়ো হলে কী হয়, এখনও ঘোড়ার মতো ছোটে। ওকে দৌড়ে ধরা তোর-আমার কাজ নয়। ও যদি অলিম্পিকে যেত না, বুঝলি, ঠিক সোনার মেডেল পেয়ে যেত প্রিন্টে।
ট্যাঁপা বললে, জয়, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? এদিকে মোনা পাল গেল পালিয়ে, আর তুই সোনার মেডেল পাওয়াচ্ছিস ওকে! ধরতে হবে লোকটাকে?
ধরা যাবে ওকে, আর ধরেও কোনও লাভ নেই। আমি ততক্ষণে একটু ভেবে আমাদের পরের প্রোগ্রামটা একটু ঠিক করে নিই।
এই ঘরে? এই ছুঁচোর গন্ধের ভেতর?
চুলোয় যাক ছুঁচো। আগে মোনার ওপর একটু প্রতিহিংসা নেওয়া যাক।– মিটমিট করে হাসল জয়ধ্বজ : শুধু ছুঁচোর গন্ধ পাচ্ছিস, আর কিছু না? ওদিকে দড়ি বাঁধা একছড়া পাকা চাঁপা কলা ঝুলছে, দেখছিস? নিয়ে আয়-সাবাড় করে দিই।
এই তোর কলা খাওয়ার সময়?
কলা খাওয়ার আবার সময়-অসময় আছে নাকি? পেলেই খেতে হয়। কলা খেতে খেতে প্ল্যান ঠাওরাব–
ট্যাঁপাকে দরকার হল না, জয়ধ্বজ নিজেই কলার ছড়াটা পেড়ে আনল। বললে, নে।
উৎসাহ ছিল না, তবু ট্যাঁপাকে কলা মুখে পুরতে হল।
জয়ধ্বজ বললে, বেশ কলাগুলো–না?
ট্যাঁপা রাগ করে বললে, সাইকেল তোকে পেতে হবে না, ওই কলাই খা।
আহা–দাঁড়া দাঁড়া।–কলা চিবুতে চিবুতে জয়ধ্বজ বললে, আচ্ছা, মোহনলালবাবুর সেই ছড়াটা মনে আছে?
দুত্তোর ছড়া! কী হবে তা দিয়ে?
দরকার আছে। বল না। তুই ভালো ছাত্র, ঠিক মনে করে রেখেছিস?
ট্যাঁপা গজগজ করে বললে,
চিন্তামণি নেইকো বনে,
আছেন তিনি ঘরের কোণে
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে,
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।
জয়ধ্বজ বললে, হুঁ। গৌ-মাতা তার–মানে এই দুটো লাইনই খটকা ঠেকছে।
এখন বুঝি ধাঁধার উত্তর বের করবি?
উঁহু, সাইকেল খুঁজে বের করব। চল–বেরাই এখান থেকে।
ট্যাঁপা তৎক্ষণাৎ বন্ধ দরজায় লাথি মারতে যাচ্ছিল, জয়ধ্বজ বললে, দরকার নেই।
মানে? বেরুব কী করে?
আরে ভেতরের ওই দরজাটা দেখছিস না? খিল দেওয়া রয়েছে? খুললেই বেরিয়ে যেতে পারব।
তাই তো-তাই তো! ট্যাঁপা লজ্জা পেল। এ-পাশে একটা খিল-দেওয়া দরজা যে রয়েছে তার সে-খেয়ালই হয়নি। আসলে, উত্তেজনায় তার মাথাই গরম হয়ে গিয়েছিল, আর জয়ধ্বজ ওটা ঢুকেই দেখতে পেয়েছে বলে একটুও ঘাবড়ায়নি।
সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে দুজনে পেছনের উঠনে। মোনা পালের বাড়িতে তো কোনও পাঁচিলের বালাই নেই, কাজেই বাইরের রাস্তায় ঘুরে আসতে আধ মিনিটও লাগল না।
বাইরে ঝাঁ ঝাঁ করছে দুপুরের রোদ। কোনওদিকে জন-মানুষের চিহ্ন নেই। মোনা পাল যে কোথায় উধাও হয়েছে, ভগবানই জানেন। কেবল বাইরে তার ছারপোকা-ভর্তি খাঁটিয়াটা আকাশে চারটে ঠ্যাং তুলে চিতপাত হয়ে রয়েছে।
ট্যাঁপা বললে, কী করবি এখন? মোনাই নিশ্চয় সাইকেল-চোর, কিন্তু কোথায় পাচার করল সেটা?
পাশেই একটা জামগাছের তলায় মোনার গোরুর গাড়িটা। বলদ দুটো একটু দূরে মাঠে বাঁধা–ঘাস খাচ্ছে তারা।
কপাল কুঁচকে জয়ধ্বজ একটু ভাবল। তারপর এগিয়ে গেল গোরুর গাড়িটার দিকে।
ট্যাঁপা বললে, ওখানে কী?
দ্যাখ না–
জয়ধ্বজ দ্রুত হাতে গোরুর গাড়িতে বিছানো খড়গুলো সরাতে লাগল।
ওর তলায় সাইকেল লুকোনো আছে? তোর মাথা খারাপ?
জয়ধ্বজ জবাব দিল না। আর একটু পরেই তার গলা থেকে বেরুল একটা জয়ধ্বনি।
ট্যাঁপা–এই দ্যাখ।
একমুঠো খড় বাড়িয়ে ধরেছে জয়ধ্বজ। তাতে তেলকালিমাখা।
অ্যাঁ–এ যে—
হ্যাঁ, সাইকেল থেকে লেগেছে– জয়ধ্বজ হাসল : এই গোরুর গাড়িতে সাইকেল পাচার করেছে স্টেশন থেকে আসবার সময়। কিন্তু নেপালদা তো তখন বাইরে দাঁড়িয়ে চা করছিল– জয়ধ্বজ ভুরু কোঁচকাল : চল ট্যাঁপা।
নেপালদার কাছে?–উত্তেজনায় ট্যাঁপা হাঁপাতে লাগল।
না, পঞ্চু সামন্তের কাছে। ভুলে গেলি! তমলুকে তার সাইকেলের দোকান?
চল—চল–
দুজনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল।
.
সাত
জয়ধ্বজ বললে, তা হলে এবার—
ট্যাঁপা বললে, হুঁ, পঞ্চু সামন্ত।
দাঁড়া–তা হলে ব্যাপারটা মনে মনে একটু গুছিয়ে নিই।–মোনা পালের এক কাঁদি চাঁপা কলা খেয়ে মেজাজটা খুব ভালো হয়ে গিয়েছিল জয়ধ্বজের : গোড়া থেকেই ধরা যাক। আমরা নেপালদার দোকানে ঢুকে চা খাচ্ছিলুম কখন? ধর, নটা–সাড়ে নটা। খড়গপুর লোক্যাল আমাদের স্টেশন পার হয়েছে কখন? ধর, আটটা চল্লিশ–এই রকম একটা সময়ে। তা হলে–
তা হলে সাইকেলটা নিয়ে ট্রেনে তুলে দেয়নি তো রে?
সে কী করে হবে? গাড়িতে সোয়ারি ছিল বলছে। তাদের সামনে আর সাইকেলটা চুরি করবে কী করে?
যদি সাঁট থাকে?
হতে পারে। কিন্তু তারও একটা মুস্কিল আছে। স্টেশনের ভেতর একটা সাইকেল নিয়ে গিয়ে ট্রেনে ভোলা লোকের চোখে পড়বেই। তা ছাড়া আটটা চল্লিশের গাড়িতে কাউকে তুলতে হলে দশ-পনেরো মিনিট আগে এসেছে নিশ্চয়ই, তাকেও তো টিকিট কাটতে হবে। তাহলে আটটা পনেরো থেকে আটটা ত্রিশের ভেতরে–আগেও হতে পারে–মোনা পাল এসেছে স্টেশনে। তখন তো আমরা নেপালদার দোকানে পৌঁছুইনি মোটেই।
ট্যাঁপা একটু ভেবে বললে, হুঁ, ঠিক কথা।
নিতে হবে ফেরবার সময়। সে কখন? নটার পর থেকে সাড়ে নটাৰু ভেতর।– জয়ধ্বজের ভুরুটা কুঁচকে এল : তখন তো নেপালদা দোকানের সামনে তার কাঠের টেবিলে চা তৈরি করছে। সাইকেল রয়েছে তার চোখের সামনেই।–একটু থামল জয়ধ্বজ : কী করে সম্ভব যে নেপালদা দেখতে পেল না?
