মোনা পাল একেবারে হাঁউমাউ করে উঠল।
উরিব্বাবা! তোমার এক চিৎকারেই আমার মগজে তালগোল পাকিয়ে গেছে বাবা জয়ধ্বজ! আর হাঁক ছেড়ো না–তা হলে মারা পড়ে যাব। তুমি মানুষ খুনের দায়ে ফেঁসে যাবে তাহলে।
এবার সব কথা শুনতে পাচ্ছ মোনাদা?
শুনতে পাচ্ছিনে আবার? আমার যে বুড়ি পিসিমা তিরিশ বছর বদ্ধ কালা হয়ে রয়েছে, তোমার ওই বোম্বাই হাঁক শুনলে তারও কান সাফ হয়ে যেত। বলল, কী বলতে চাও।
ট্যাঁপা বললে, এবার ডান কানে আমিও একটা ডাক ছাড়ি জয়। তখন থেকে বড্ড ভুগিয়েছে।
মোনা পাল সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে দুকান চেপে ধরল।
আরিব্বাস! এতেই আমার মাথায় ঘুরন-চক্কর চলছে তুমিও যদি একখানা ছাড়ো, তা হলে আর আমি নেই, স্রেফ গো-হত্যে হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি তোমাকে।
জয়ধ্বজ বললে, তা হলে সোজাসুজি কটা কথার উত্তর দাও।
বলো।
আজ সকাল থেকে তুমি কী করছিলে?
কী আর করব? ঘুম থেকে উঠে, মুখটুক ধুয়ে, বাসী ভাত খানিক ছিল, তাই খেয়ে—
তাই খেয়ে?
মাঠে গেলুম। সেখানে ধান কাটা হচ্ছিল। আমিও খানিকটা কাটলুম।
তারপর?
তারপর তোমার মামার সঙ্গে দেখা হল।
জয়ধ্বজ নড়ে উঠল একটু।
মামা কী বললেন?
কী আর বলবেন? কেমন আছ-টাছ এইসব। তা আমি বেশিক্ষণ মাঠে থাকতে পারিনি। আমার একজন সোয়ারি ছিল কিনা, তাকে গোরুর গাড়িতে করে ইস্টিশনে নিয়ে গেলুম–সকালের ট্রেন ধরাতে।
তারপর?
তার আর কী? বাড়ি এসে ডোবা থেকে কটা কুচো চিংড়ি ধরলুম, কলমি শাক তুলে তাই দিয়ে রান্না করলুম। তারপর ভাত বেঁধে–
ট্যাঁপা ছটফট করে উঠল : আচ্ছা জয়, কী পাগলামি হচ্ছে? এখানে দাঁড়িয়ে থেকে মোনাদার আবোল-তাবোল শুনছিস, অথচ–
জয়ধ্বজ বললে, দাঁড়া–দাঁড়া, শুনেই নিই না। কিছুই বলা যায় না, কাজে লেগে যেতে পারে।–হ্যাঁ, ভাত রাঁধবার পরে কী করলে মোনাদা?
কী আর করব? খেলুম। কুচো চিংড়ি দিয়ে কলমি শাকের ঝোলটা যে কী ভালো হয়েছিল–
সে থাক। তারপর?
তারপর খাঁটিয়া পেতে ঘুমোবার চেষ্টা করলুম। কিন্তু অ্যায়সা ছারপোকা বুঝলে, গোটা পিঠে যেন হালচাষ করে দিলে। ঘুমাব কী, পাঁচ মিনিট শুয়ে থাকে সাধ্যি কার! তারপর খাঁটিয়া এনে ছারপোকা মারছি–এমন সময় তোমরা এলে।
এর মধ্যে আর কিছু নেই?
কিসসু নেই। মা কালীর দিব্যি।
মা কালীর নাম নিয়ে মিথ্যে কথা বলছ মোনাদা? নাকি আবার চিৎকার ছাড়ব?
না–না, আর দরকার হবে না– মোনা পাল শিউরে উঠে বললে, এখনও আমার বুকের ধড়ফড়ানি থামেনি। তা–তা এর মধ্যে একটা কিছু হয়েছিল বই কি।
কী হয়েছিল?
সে ভীষণ ব্যাপার–মোনা একবার চারদিকে তাকিয়ে নিলে : সে তো এখানে বলা যাবে না, চুপি চুপি বলতে হবে।
কেউ শুনছে না, কোনও লোক নেই এদিকে। বলো তুমি।
মোনা বললে, না–না, বাইরে সে কথা বলবার জো নেই। চলো আমার ঘরের ভেতরে।
ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ বললে, বেশ, ঘরেই চলো তা হলে।
ট্যাঁপা আগে ঘরে ঢুকল, পেছনে জয়ধ্বজ। এবং তৎক্ষণাৎ–
তৎক্ষণাৎ এক টানে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিলে মোনা পাল। তারপর–ঝনাৎ! সোজা শেকল তুলে দিল দরজায়।
ভেতর থেকে ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ চেঁচিয়ে উঠল : এ কী হচ্ছে মোনাদা-দরজা বন্ধ করে দিলে কেন? খোলো—খোলো–
অট্টহাসি করে মোনা পাল বললে, আমার কান খারাপ হয়ে গেছে, আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
মোনা পালের ঘরে শেকলবন্দী হয়ে তো দুজনে থ।
ব্যপারটা যে সত্যি সত্যিই এত দূর গড়াতে পারে, এরকম ভাবাই যায়নি। এ যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুনো যাকে বলে। নেপালদার দোকানের সামনে থেকে জয়ধ্বজের নতুন সাইকেলটা চুরি হয়ে গেল, হতেই পারে, অনেক সাইকেলই তো চুরি যায়। কিন্তু গোটা জিনিস শেষ পর্যন্ত এমন প্যাঁচালো হয়ে যাবে, এ ওদের স্বপ্নেও ছিল না।
তা হলে কেবল একটা সাইকেল চুরিই নয়, যে-কোনও এক ছিচকে চোরের কাণ্ডকারবারও নয়! এর পেছনে গভীর চক্রান্ত আছে। কিন্তু কী চক্রান্ত? কী সে উদ্দেশ্য?
আর মোনা পাল—
কথা নেই, বার্তা নেই–দুম করে শেকল আটকে পালিয়ে গেল! কালা সাজবার ভান করে বাঁদর নাচাচ্ছিল ওদের। লোকটা তো দারুণ ঘুঘু।
ট্যাঁপা বিরক্ত হয়ে বললে, জয়, হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কী? এই ঘরে কয়েদ হয়ে থাকব নাকি?
জয়ধ্বজ বললে, থাম, একটু ভেবে নিই।
এতে আবার ভাবাভাবির কী আছে। বেরুতে হবে না এখান থেকে?
জয়ধ্বজ বললে, বেরুবার জন্যে চিন্তা নেই, ও যা পলকা দরজা, একটা-দুটো লাথি মারলেই শেকল-টেকল সুদ্ধ উপড়ে পড়ে যাবে।
তবে তাই করা যাক, আয়।
ট্যাঁপা দরজার দিকে এগোচ্ছিল, জয়ধ্বজ তার হাত চেপে ধরে বললে, দাঁড়া।
দাঁড়াব কী? এটা কি একটা ঘর নাকি?ট্যাঁপা নাক কোঁচকাল : রামো–রামো, কী নোংরা বিছানাটিছানা পড়ে রয়েছে মেঝেতে। ওদিকে আবার কতগুলো হাঁড়িকুঁড়ি! যেন ছুঁচোরও গন্ধ পাচ্ছি।
তা কী করা যাবে, গরিব মানুষের ঘর এরকমই হয়ে থাকে।
তোর আবার মোনা পালের জন্যে দরদ দেখা দিল নাকি?ট্যাঁপা একটা হাঁ করল : হতে পারে গরিব, কিন্তু তাই বলে শয়তানী করবে আমাদের সঙ্গে? মানে কী এর?
মানে একটা আছেই, একটু একটু আঁচ পাচ্ছি যেন।
কী পাচ্ছিস?
সাইকেলটা ও-ই সরিয়েছে।
সে তো এখন জলের মতো পরিষ্কার– ট্যাঁপা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল : তা হলে আর সময় নষ্ট করে কী হবে, চল–দরজা ভেঙে বেরিয়ে পড়ি। ধরে ফেলি মোনাকে।
