আচ্ছা–চল।
মোনা পালকে খুঁজতে হল না। বাড়ির সামনেই ছিল সে। কালো কটকটে বেঁটে চেহারার লোক, মাথা ভর্তি সাদা সাদা কদমছাঁট চুল, গোঁফ আর ভুরু ধপধপে পাকা। সে তখন একটা দড়ির খাঁটিয়া তুলে দমাদম করে আছাড় মারছিল। আর সেই খাঁটিয়া থেকে টুপটাপ করে পড়ছিল প্রমাণ-সাইজের সব ছারপোকা। বিশ্রী রকম মুখ ভেংচে, পা দিয়ে ঘষে ঘষে সেইসব ছারপোকাকে সংহার করছিল মোনা পাল।
ট্যাঁপা ডাকল : ও মোনাদা!
মোনা জবাব দিল না, তেমনি যাচ্ছেতাই মুখ করে ছারপোকা মারতে লাগল।
ও মোনাদা! বলি, শুনছ?
উত্তরে মোনা পাল আবার খাঁটিয়া তুলে আছাড় মারল একটা।
জয়ধ্বজ বললে, ওভাবে ছারপোকা সাবাড় করতে পারবে না–খাঁটিয়ায় আগুন লাগাও। কিন্তু ব্যাপার কী, আমাদের কথার জবাব দিচ্ছ না কেন?
মোনা পাল বললে, আমি আজকাল কানে কম শুনি।
কবে থেকে?–জয়ধ্বজ হেসে ফেলল : পরশুও তো হাটে তুমি বেশ দর-দাম করে বেগুন কিনছিলে?
মোনা পাল নিরুত্তরে আবার আছাড় মারল খাঁটিয়ায়।
মোনাদা, কবে থেকে কানে কম শুনছ?–আবার জিজ্ঞেস করল জয়ধ্বজ।
আজ থেকে।
কিন্তু আমি এবার এত আস্তে আস্তে বললুম, তবু তো শুনতে পেলে?
মধ্যে মধ্যে শুনতে পাই, কিন্তু আর পাব না–বলে মোনা পাল গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর মাটিতে চোখ নামিয়ে ছারপোকা খুঁজতে লাগল।
জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা এ-ওর দিকে তাকাল।
হুঁ–পরিস্থিতি বেশ গুরুতর। সন্দেহের নিবিড় মেঘে আকাশ ঘনীভূত।
.
ছয়
ট্যাঁপা ডাকল : ও মোনাদা!
মোনাদার সাড়া নেই। মাটির দিকে চোখ রেখে সমানে ছারপোকা খুঁজছে সে। ট্যাঁপা বিরক্ত হয়ে বললে, আরে শোনোই না মোনাদা! কানে না হয় একটু পরেই কম শুনো, তার আগে সোজা বাংলায় দুএকটা কথার জবাব দাও দিকি?
মোনা পাল এবার কানে হাত দিয়ে কেমন ঘোলা ঘোলা চোখে ট্যাঁপার দিকে তাকাল। তারপর বললে, অ্যাঁ–জবাই? আমি তো মুরগি জবাই করি না। কালু মিঞার কাছে যাও।
না–না-জবাই না, জবাব। মানে উত্তর।
মোনা পাল বললে, উত্তরপাড়া? সে হল গে তোমার কোন্নগরের কাছে।
ট্যাঁপা চটে গিয়ে বললে, আমাদের, কী বলে, লাইফ অ্যান্ড ডেথ–মানে জীবন-মরণ সমস্যা, আর তুমি মস্করা করছ আমাদের সঙ্গে?
মোনা বললে, গুশকরা? না–না, সে ইদিকে কোথায়? নলহাটি লাইনে যেতে হয়।–আর… বলেই খাঁটিয়াটা তুলে আর একবার চিৎকার ছাড়ল একটা।
সোজা কথায় জবাব দাও মোনাদা-নইলে একটা বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে যাবে, তা বলে দিচ্ছি। জয়ের নতুন সাইকেলটা নেপালদার দোকানের সামনে থেকে চুরি হয়ে গেছে। সে সাইকেল তুমি দেখেছ?
মাইকেল? মাইকেল তো পদ্য লেখেন। পাঠশালার পণ্ডিতমশাইয়ের মুখে শুনিছি।
ট্যাঁপা আবার চেঁচিয়ে উঠল : ও–কিছুতেই কানে শুনবে না ঠিক করেছে? খানিকটা ফুটন্ত গরম জল এনে কানে ঢেলে দিচ্ছি তোমার, দেখি, শুনতে পাও কি না।
মোনা এটাও শুনতে পেল না। মাটিতে ছারপোকা খুঁজতে লাগল আবার।
ট্যাঁপা তড়াক করে লাফ মারল একটা, বোধহয় কারও বাড়ি থেকে এক কেটলি গরম জল আনার জন্যেই দৌড়ে যাচ্ছিল সে। জয়ধ্বজ চটে যায়নি, বরং সমস্ত ব্যাপারটায় তার বেশ মজা লাগছিল।
আঃ, থাম না ট্যাঁপা। মোনাদা যদি কানে শুনতে না-ই পায়, তা হলে কী করা যাবে আর।
না, কানে শুনতে পায় না! সবটাই চালাকি।
দাঁড়া–দাঁড়া, মাথা গরম করিসনি। আমি দেখছি।–ও মোনাদা!
মোনাদা তেমনি কানে হাত দিয়ে ঘোলা চোখে জয়ধ্বজের দিকে তাকাল।
পোনার কথা বলছ? তোমার মামা এবার অনেক পোনা ছেড়েছে তালডাঙার পুকুরে।
ট্যাঁপা খেঁকিয়ে উঠতে যাচ্ছিল, জয়ধ্বজ তার মুখে হাত চাপা দিয়ে দিলে। তারপর বললে, মামা যে অনেক পোনা ছেড়েছে তালডাঙার পুকুরে, সে আমি ভালোই জানি। সে-খবর তোমায় দিতে হবে না। কিন্তু জিজ্ঞেস করছি, আমার সাইকেলটার কথা।
মোনা বললে, কিছু শুনতে পেলুম না।
পাবে—পাবে–জয়ধ্বজ একটু হাসল : মামা আমার সাইকেলটার কথা তোমায় কিছু বলেছিল?
ট্যাঁপা লক্ষ করল না, কিন্তু জয়ধ্বজ টের পেল, মোনা পাল যেন চমকে উঠল একটু।
জামা? খামকা জামা গায় দেব কেন?
জামা নয়–মামা।
ধামা? কিনবে? তা আমাকে বলছ কেন? বুনোপাড়ায় যাও, ওরা ধামাকুলো তৈরি করে বেচে। যত ধামা চাও-দেবে।
ট্যাঁপা রাগে সাপের মতো ফুঁসছিল। বললে, কী ওর সঙ্গে বকবক করছিস জয়! ও কোনও জবাব দেবে না। সোজা আঙুলে যে ঘি ওঠে না–সে তো দেখতেই পাচ্ছিস। চল, থানায় যাই। সাইকেল এ-ই সরিয়েছে–নির্ঘাত।
মোনা বললে, ভাত খাবে? এই বেলা তিনটের সময়? কেন–দুপুরে খাওয়া হয়নি নাকি?
দাঁত কিড়মিড় করে ট্যাঁপা বললে, জয়, এর সঙ্গে আর দুমিনিট কথা বললে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে-রিয়্যালি! থানাতেই চল। দারোগা ধরে নিয়ে গিয়ে একে বেশ করে ঠ্যাঙাকসুড়সুড় করে সত্যি কথা আপনিই বেরিয়ে আসবে।
না। থানায় যাব না। মোনাদা যাতে এক্ষুনি কানে শুনতে পায়, সে ব্যবস্থা আমি করছি।–বলেই জয়ধ্বজ মুখটাকে মোনা পালের বাঁ কানের কাছে নিয়ে গেল। তারপর কানের ফুটোয় মুখ রেখে আকাশ কাঁপানো এক বাজখাঁই হাঁক ছাড়ল : মো-না-দা!
সেই নিদারুণ চিৎকারে ট্যাঁপার পর্যন্ত পিলে চমকে উঠল। আর মোনা আঁতকে গিয়ে এক লাফে হাতখানেক শূন্যে উঠে পড়ল, তারপর ধপাৎ করে বসে গেল মাটিতে।
জয়ধ্বজ বললে, এতেই শুনতে পাবে, না ডান কানেও আর একটা আওয়াজ দেব?
