দুই বন্ধু চুপ। ট্যাঁপার হাঁটুটা টনটনিয়ে উঠল আবার। ধুত্তোরখালি খালি ক্রোশখানেক হাঁটার পণ্ডশ্রম। তায় আবার ধুড়ম করে একটা আছাড় খেতে হল। পেল্লাদটা তো আচ্ছা হতভাগা! চারদিকের সবাই ওভারসিয়ারবাবুকে চেনে, আর সে চেনে না!
জয়ধ্বজই সামলে নিলে। বললে, পাখি-টাখি কিছু পেলেন মোহনকাকা? মোহনলাল ব্যাজার হয়ে বললেন, কই আর পেলুম! বরাতটাই খারাপ আজকে। বেশ মোটাসোটা একটা তিতির পেয়েছিলুম ঝোঁপের ভেতরে, বন্দুকের ঘোড়া টিপতে যাচ্ছি, পুটুস করে ঠিক সেই সময় একটা গেছে পিঁপড়ে দিলে বাঁ কানটায় কামড়ে! ভীষণ চমকে গেলুম, হাত নড়ে গেল–একটা চার নম্বরের টোটাই বরবাদ। আর টোটার যা দাম আজকাল!
এই বলে বাঁ কানটা খুচখুচ করে একটু চুলকে নিলেন মোহনলালবাবু। তারপর বন্দুকটাকে দুভাঁজ করে ভেঙে কাঁধের ওপর ব্যালান্স করলেন।
গুলির আওয়াজে সব তো পালিয়েছে এদিক থেকে। দেখি, দিঘির পাড়ির ওপরে এক-আধটা ঘুঘু-টুঘু পাই কি না। তার আগে কিছু খেয়ে নেওয়া যাক, ভারি খিদে পেয়েছে।–ক্যাম্বিসের থলেটা থেকে কলার ছড়া আর একটা পাউরুটি বের করতে করতে বললেন, এসো হে জয়ধ্বজ, শেয়ার করো। আর তুমি–তোমাকেও চেনা-চেনা ঠেকছে–হুঁ, আচার্যি-বাড়ির ট্যাঁপা না?
ট্যাঁপা বললে, আজ্ঞে।
তা হলে ব্রাহ্মণ-সন্তানকেই আগে দিতে হয়। নাও ধরো বলে একটা কলা বাড়িয়ে দিলেন।
আজ্ঞে না, না, আমাদের কিছু দরকার নেই—আমরা—
কিন্তু কে শুনছে সেকথা। মোহনলাল দুজনের হাতে দুটো কলা প্রায় জোর করেই খুঁজে দিলেন। তারপর বললেন, রুটি?
আজ্ঞে আর না– জয়ধ্বজ প্রাণপণে প্রতিবাদ করল : আমরা একটু আগেই ভাত খেয়ে বেরিয়েছি।
তা হলে থাক। বনবাদাড়ে আর ঘুরো না–বলতে বলতে হঠাৎ মোহনলালবাবুর চোখ মিটমিট করে উঠল : বুঝলে জয়ধ্বজ, এদিকে আসবার সময় রাস্তায় তোমার মামার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
মোহনলাল একেবারে আধখানা কলা মুখে পুরে দিয়ে বললেন, তিনি কথায় কথায় তোমার খুব প্রশংসা করছিলেন। বলছিলেন, যেমন কাজের ছেলে, তেমনি সাবধানী আর সেই রকম দায়িত্বজ্ঞান।
শুনে জয়ধ্বজের মুখটা লম্বা হয়ে ঝুলে পড়ল। সাবধানী আর দায়িত্বজ্ঞানই বটে! না হলে, সকালের এমন ঝিলমিলে রোদের ভেতরে নেপালদার চায়ের দোকান থেকে সাইকেলটা তার চুরি হয়ে গেল। এরপরে মামার সামনে গিয়ে সে দাঁড়াবে কোন মুখে?
কলার বাকিটুকু চিবুতে চিবুতে মোহনলাল আবার মিটমিট করে তাকালেন এদের দিকে।
যাও–যাও, রোদ্দুরে খামকা ঘুরতে নেই স্ট্রেট বাড়ি চলে যাও এবার। ভালো কথা ধাঁধার উত্তর-টুত্তর আসে তোমাদের?
ট্যাঁপা কলাটা ছুলতে যাচ্ছিল, থমকে গেল সে কথা শুনে। জয়ধ্বজ ভুরু কুঁচকে তাকাল।
ধাঁধা?
মোহনলাল মাথা নেড়ে বললেন, হুঁ–ধাঁধা। আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিল জবাব দিতে পারিনি। তোমরা ভেবে দেখো তো। ধাঁধাটা হল :
চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাতা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।
বুঝলে কিছু?
জয়ধ্বজ বললে, আজ্ঞে না।
ট্যাঁপা বিরক্ত হচ্ছিল। জয়ধ্বজের কানে কানে বললে, ধাঁধা-ফাঁধা নিয়ে কী পাগলামি আরম্ভ করলি জয়? ওদিকে এতক্ষণে সাইকেল-চোর–
মোহনলাল মুচকি মুচকি হাসলেন।
উত্তরটা বুঝি পেয়ে গেছ ট্যাঁপা?
আজ্ঞে না, উত্তর পাইনি। পেলে আপনাকে জানাব এখন। চল জয়, আমরা যাই
পাউরুটিতে মস্ত একটা কামড় দিয়ে মোহনলাল বললেন, হ্যাঁ, সেই ভালো। বাড়ি চলে যাও। তারপর কেমন মিটমটি করে তাকাতে লাগলেন ওদের দিকে। সেই তাকানোটা
জয়ধ্বজের ভালো লাগল না।
আবার সেই পুরনো রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরা। মন-মেজাজ দুজনেরই খারাপ।
ট্যাঁপা বললে, ধুং ফলস্ ক্লু।
জয়ধ্বজ বললে, বুঝতে পারিনি এখনও।
তার মানে?–ট্যাঁপা উত্তেজিতভাবে বললে, তুই কি ভাবছিস মোহনলালবাবুই সাইকেল-চোর? কিংবা চোরের দলের সঙ্গে যোগ আছে তাঁর?
জিভ কেটে জয়ধ্বজ বললে, আরে রাম!
তবে?
আমি ভাবছি ধাঁধাটার কথা।
দুত্তোর ধাঁধা–ট্যাঁপা চটে গেল : কোথাকার এক চিন্তামণি আর গৌ-মাতা! কোনও মানে হয় না। যত সব বোগাস লোক।
হয়তো একটা মজা করলেন।
তা হবে। কিন্তু ট্যাঁপা–তুই তো লেখাপড়ায় দারুণ ভালো ছেলে। ধাঁধাটা মনে আছে তোর?
কেন মনে থাকবে না?–
চিন্তামণি নেই রে বনে,
থাকেন তিনি ঘরের কোণে।
গৌ-মাথা তার বলেন হেসে
খড় দেবে যে, দুধ খাবে সে।
কিন্তু ধাঁধা চুলোয় যাক। এখন তাড়াতাড়ি পা চালা।
কোথায় যাওয়া যাবে এবার?
মোনা পালের কাছে। দাগী চোরকয়েকবার জেল খেটেছে।
জয়ধ্বজ বললে, কিন্তু মামা বলছিল, মোনা নাকি আজকাল আর চুরি-চামারি করে না–স্রেফ ভালোমানুষ হয়ে গেছে?
ধুর বাজে কথা। চোরের স্বভাব বদলায় কোনওদিন?
তা ছাড়া মোন কোনওদিন গাঁয়ের কারও জিনিস চুরি করেনি।
চোরের আবার ধম্মোজ্ঞান!
আরে যে দাগী চোর সে তো বোঝে, কারও কোনও কিছু খোয়া গেলে পুলিশ প্রথমেই তাকে সন্দেহ করবে, আর তাকে ধরেই পিটুনি লাগাবে।
তুই বড্ড এঁড়ে তক্কো করিস জয়! ট্যাঁপা ভীষণ বিরক্ত হল : পিটুনি খেলে চোরের কিচ্ছু হয় না। ওসব ওদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। ওরা জানে, পেটে খেলে পিঠে সয়।–রেগে গিয়ে ট্যাঁপা এবার খোসাসুদ্ধ কলাটাই মুখে পুরে ফেলল : আমি বলছি, মোনা পালকেই একবার বাজিয়ে দেখি।
