জয়ধ্বজ বললে, আমার কিন্তু একটা কথা মনে হচ্ছে ট্যাঁপা! সাইকেল গাঁয়ের ভেতরেই কোথাও আছে, বাইরে যায়নি।
তুই বললেই হল?–ট্যাঁপা চটে গেল : তা হলে একটা নতুন সাইকেল নিয়ে দাসপুরের দিঘির দিকে কে গেল? মাইন্ড ইট–দাসপুরের দিঘি। তার একদিকে ভাঙা একটা শিবমন্দির, দুদিকে জঙ্গল। গ্রাম বেশ খানিকটা দূরে। কেন লোকটা সাইকেল নিয়ে ওদিকে যাবে?
কেন?
এটাও বুঝতে পারলিনে?–ট্যাঁপার হঠাৎ মনে হল, সে শার্লক হোমস হয়ে গেছে : সাইকেলটা দিনকয়েক ওই ভাঙা মন্দিরে কিংবা জঙ্গল-টঙ্গলে লুকিয়ে রেখে দেবে। তারপর
এদিকের হইচই থেমে গেলে ওটাকে বের করে এনে সরিয়ে ফেলবে।
ভুরু কুঁচকে একটু চুপ করে রইল জয়ধ্বজ। তারপর বলল, আচ্ছা, চল।
দুজনে এগিয়ে চলল। ট্যাঁপার উৎসাহই বেশি।
একটু তাড়াতাড়ি পা চালা জয়! লোকটা সাইকেলটা লুকিয়ে ফেলে যদি একবার সরে পড়তে পারে, তা হলে মুস্কিল হবে।
পথের ধুলোয় টায়ারের দাগ মধ্যে মধ্যে পরিষ্কার চোখে পড়ছে। যাচ্ছে দাসপুরের দিকেই। পেল্লাদ মিথ্যে কথা বলেনি।
দুজনে দাসপুর পাশে রেখে দিঘির দিকে চলল।
পুরনো দিঘি, পুরনো শিবমন্দির। কতকাল আগেকার কেউ জানে না। দিঘির উঁচু পাড়িতে বেলগাছের সার, আশেপাশে জঙ্গল। অনেককাল আগে এখানে নাকি বাঘ আসত।
এখানেও টায়ারের দাগ। এতক্ষণে জয়ধ্বজেরও উৎসাহ হচ্ছিল। একটা গোলমাল কিছু আছে নিশ্চয়ই। নইলে খামকা একটা লোক কেন আসতে যাবে এই জংলা দিঘির ধারে?
দিঘির ভাঙা ঘাটটার ওপর ওরা এসে দাঁড়াল। জল চোখেই পড়ে না। হাওয়ায় শালুক দুলছে, পদ্মপাতা দুলছে। ফড়িং উড়ছে–পদ্মপাতার ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে খঞ্জন আর জলপিপি। মাথার ওপর ঝিরঝির করছে বেল আর শিরীষের পাতা।
কিন্তু কোথায় সাইকেল–কোথায় কে!
লোটা এর মধ্যেই সরে পড়ল নাকি?
ট্যাঁপা বললে, শিবমন্দিরটা একবার দেখি, আয়।
মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। মাথার ওপর পাকে পাকে জড়িয়ে একটা অশ্বথের গাছ। মন্দিরের দরজা নেই–ভেতরে একরাশ কালো ছায়া, ভাঙা দেওয়াল দিয়ে রোদের দু-একটা টুকরো পড়েছে ফুটিফাটা বেদীর ওপর। কয়েকটা চামচিকে ইট আঁকড়ে ঝুলে আছে কোনায় কোনায়। আর কিছুই নেই।
জয়ধ্বজ বললে, এখানে নেই।
ট্যাঁপা বললে, তাই তো দেখছি।
হঠাৎ দিঘির পাড়ির তলা দিয়ে দুড়দাড় করে শব্দ। কেউ যেন ছুটে পালাচ্ছে।
জয়, সেই লোকটা!–ট্যাঁপা লাফিয়ে উঠল : পালাচ্ছে।
দুজনে দৌড়ল সেইদিকে। ঢালু পাড়ি বেয়ে হুড়মুড় করে নামতে গিয়ে ট্যাঁপা পা পিছলে পড়ে গেল, গড়িয়ে পড়ল হাত তিনেক। জয়ধ্বজ তাকে টেনে তুলল।
কিন্তু পরিশ্রমটা মাঠেই মারা গেল।
যে দুড়দাড় করে দৌড়ে যাচ্ছে–তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। সে মানুষ নয়, পাটকিলে রঙের অল্পবয়েসী গোরু একটা। ওদের মধ্যে মধ্যে ওরকম আচমকা ফুর্তি জেগে ওঠে, তারপরে অকারণেই লেজ তুলে দৌড়ে বেড়ায় খানিকটা।
জয়ধ্বজ বললে, ধেৎ–গোরু!
ট্যাঁপা পায়ে হাত বুলাতে বুলোতে বললে, , গোরুই তো। কোনও মানে হয় না–মাঝখান থেকে হাঁটুটাই খানিক ছড়ে গেল আমার।
দুজনে কিছুক্ষণ চুপ।
জয়ধ্বজ মাটিতে বসে পড়ে একটা শুকনো বেল কুড়িয়ে নিয়ে ভাঙা ইটের ওপর ঠুকতে লাগল।
ট্যাঁপা বললে, কী করা যায়, জয়?
ভাবছি।
তুই তো খালি ভেবেই চলেছিস। কিন্তু লোকটা যে কোথায়–
জয়ধ্বজ জবাব দিল না, একমনে বেলটাকে ঠুকতে লাগল।
চটে, তার হাত থেকে বেলটাকে কেড়ে নিলে ট্যাঁপা।
নে–ওঠ ওঠ–আর বসে বসে ছেলেমানুষি করতে হবে না। চল, জঙ্গলের ভেতরে দেখি একবার।
কিন্তু ওকে কি আর পাওয়া যাবে! কোনদিকে চলে গেছে এতক্ষণে।
যাবে আর কোনদিকে, জঙ্গল ছাড়া? রাস্তার দিক দিয়ে যদি যেত, তা হলে তো আমরাই দেখতে পেতুম। চল জয় সামনের জঙ্গলে খুঁজে দেখি। নিশ্চয় কোথায় ঘাপটি মেরে আছে এখানে।
আচ্ছা, চল—
বেল, শিরীষ আর আগাছার বনের মধ্যে ওরা কয়েক পা কেবল এগিয়েছে, এমন সময়—
দুম্ করে একটা বন্দুকের শব্দ। একসঙ্গে দুজনের বুক চমকে উঠল একেবারে।
লোকটাকে দেখা গেল বনের মধ্যে, সাইকেলটাকেও। তার হাতে বন্দুক। সেই বন্দুক থেকে তখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছে। আর জ্বলন্ত চোখে সে চেয়ে আছে ওদের দিকেই।
.
পাঁচ
লোকটির মাথায় শোলার হ্যাঁট, গায়ে সাদা হাফশার্ট। মালকোঁচা করে ধুতি পর। বন্দুক থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে তখনও। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপার দিকে।
আর সাইকেলটা হেলান দেওয়া রয়েছে একটা শিমুল গাছের গায়ে, তার ক্যারিয়ারে বাঁধা একটা ক্যাম্বিসের থলে, একছড়া কলা বেরিয়ে আছে তা থেকে। হ্যাঁন্ডেলে ঝুলছে একটা জলের বোতল।
সাইকেলটা জয়ধ্বজের নয়। কস্মিনকালেও নয়।
আর বন্দুক-হাতে লোকটি কিছুক্ষণ এদের দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আরে–জয়ধ্বজ না? এখানে কী মনে করে?
আরে রাম রাম, সেই পেল্লাদের কথা শুনে–এ কী কাণ্ড! এ যে জেলা বোর্ডের ওভারসিয়ার মোহনলালবাবু! ভীমরাজ পুরকায়েতের সঙ্গে খুব খাতির, দোকানে প্রায় আসেন কখনও কাপড়-চোপড় কিনতে, কখনওবা নিছক গল্পগুজব করতে।
ট্যাঁপা গোটা দুই খাবি খেল। জয়ধ্বজ মাথা চুলকোতে লাগল।
আজ্ঞে কিছু না–এই একটু বেড়াতে বেড়াতে–
মোহনলাল বললেন, না হে, এদিকটায় বেশি এসো-টেসো না। পুরনো ইটের পাঁজা চারদিকে বিস্তর গোখরা সাপ আছে। আমি অবিশ্যি মধ্যে মধ্যে আসি, ঘুঘু মারি, বন-মুরগিও পাওয়া যায় এক-আধটা। আর আমার সঙ্গে তো বন্দুক থাকেই।
