আমি?–নেউলে এবার চটে গেল–বেশ মজা তো! না হয় তোমার মামার বাগানে ঢুকে দুটো কুলই খেয়েছি, তাই বলে রাস্তার লোকের সাইকেলে আমি ঢিল ছুঁড়ব? আমি পাগল নাকি?
না, তুই একটা বুদ্ধ তোর মগজে কেবল খুঁটে–এই বলে জয়ধ্বজ টকাস করে একটা টোকা মারল নেউলের মাথায় : যা ভাগ। কিন্তু খবরদার, আর কখনও মামার বাগানে ঢুকেছিস তো–
শেষ কথা আর কে শুনছে? ছাড়ান পেয়ে নেউলে তখন বাড়ির দিকে ভোঁ-দৌড়!
আশ্চর্য হয়ে ট্যাঁপা বললে, ছেড়ে দিলি ওকে?
ব্যাজার মুখে জয়ধ্বজ বললে, ছেড়ে দেব না তো কী করব? ওর মুখ দেখে বুঝতে পারছিস না? মামার বাগানে ঢুকে কুল চুরি করেছে, ডাল ভেঙে পালিয়েছে। ভেবেছে, মামা আমাদের লেলিয়ে দিয়েছে ওকে পিট্টি দেবার জন্য। তাই অমনভাবে পালাচ্ছিল। সাইকেলের ও কিছু জানে না।
কিন্তু এমন তো হতে পারে যে, ও আমাদের ধোঁকা দিয়ে গেল?
জয়ধ্বজ একটু হাসল।
অতই যদি ওস্তাদ হবে তা হলে ও গোয়েন্দা-গল্পের কোনও দস্যু-সর্দার-টদার হতে পারত, বাবার ঘড়ি চুরি করে ঠ্যাঙানি খায়? না–নেউলে নয়, ও সাইকেল চুরির কিছু জানে না। ওকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হল।
তা হলে?
মাথার ওপর মিষ্টি নীল আকাশ। টুকরো টুকরো সাদা মেঘে রোদের সোনা জ্বলছে। মাথার ওপর দিয়ে এক জোড়া চখা-চখী উড়ে গেল কোনও নদীর চরের দিকে। একটু চুপ করে থেকে জয়ধ্বজ বললে, চল, ওঠা যাক।
কোথায় যাবি? মোনা পালের ওখানে? না, পঞ্চ সামন্তের কাছে?
ভেবে দেখি।
দুজনে মাঠ পেরিয়ে একটা কাঁচা রাস্তায় এসে পড়ল। নেউলে দৌড় করিয়ে তাদের অনেকদূর নিয়ে এসেছে, অনেকটা হেঁটে তাদের গ্রামের দিকে ফিরতে হবে।
ভাবতে ভাবতে চলেছিল, হঠাৎ ট্যাঁপারই চোখে পড়ল। দারুণ উত্তেজিত হয়ে খপ করে জয়ধ্বজের জামা টেনে ধরল।
জয়, দেখেছিস?
কী দেখব?
লক্ষ কর কাঁচা রাস্তার ওপর। সাইকেলের টায়ারের দাগ।
দুজনেই ঝুঁকে পড়ল তক্ষুনি।
কাঁচা রাস্তায় সাইকেলের চাকার দাগ থাকা খুব স্বাভাবিক, কত লোকেরই তো সাইকেল আছে আশেপাশে। কিন্তু একটু বিশেষত্ব ছিল এই দাগগুলোর। প্রথম কথা, সাইকেলটা খুব অল্প আগেই এই রাস্তা দিয়ে চলে গেছে কারণ তার ওপরে এখনও পথচলতি মানুষের পায়ের ছাপ কিংবা গোরুর গাড়ির চাকার দাগ পড়েনি। আর দ্বিতীয় কথা–
দ্বিতীয় কথা, চাকার দাগগুলো ভারি স্পষ্ট। আনকোরা নতুন টায়ারের দাগ যেমন পড়ে। শিউরে উঠে ট্যাঁপা বললে, তোর সাইকেলের দাগ।
জয়ধ্বজ ভুরু কুঁচকে বললে, হতে পারে, না-ও হতে পারে।
না-ও হতে পারে মানে? একেবারে নতুন সাইকেল?
আর কেউ যে একটা নতুন সাইকেল কিনতে পারে না, এমন তো কথা নেই।
কিন্তু এদিকের কেউ নতুন সাইকেল কিনলে নিশ্চয়ই জানা যেত। বাজারে সে আসতই।
হয়তো আজকাল কেউ কিনে এনেছে, আমরা দেখিনি।
ট্যাঁপা বিরক্ত হয়ে বললে, তর্ক করিসনি। আমার মন বলছে, এ তোরই সাইকেল। চল, ফলো করি।
জয়ধ্বজ বললে, চল।
কিন্তু কত দূর চলে গেছে সাইকেল, এ পথ কোন গ্রাম থেকে কোথায় এগিয়ে গেছে, কে জানে তার খবর! তবু দুজনে সেই দাগ ধরেই এগিয়ে চলল। একটু দূরে আম-জামের ছায়ায় ছোট্ট একটা গ্রাম দেখা যায়–দাসপুকুর। হয়তো দাসপুকুরেই লুকিয়ে আছে সাইকেল চুরির চাবিকাঠি!
আর তখন তাদের দেখা হল সেই রাখাল ছেলেটার সঙ্গে। একপাল মোষ তাড়িয়ে নিয়ে আসছিল সে।
ট্যাঁপা তাকে ডাকল : এই শোন।
.
চার
রাখাল ছেলেটা আসছিল গান গাইতে গাইতে। বেশ খুশি মেজাজ। একটা লালচে মতন মোষের বাচ্চার গায়ে হাতের ছোট লাঠিটা দিয়ে টুকটুক করে তাল দিচ্ছিল, আর গাইছিল : দেখে এলেম নদীয়ায় সোনার গোরাচাঁদে রে–
ট্যাঁপা আবার ডাকল : এই গোরাচাঁদ, শুনছিস?
গান থামিয়ে ছেলেটা বললে, আমার নাম পেল্লাদ, গোরাঁচাঁদ নয়।
ঠিক আছে, পেল্লাই হল। তোর বাড়ি কোথায়?
ওই কুমিরডাঙায়। দাসপুকুরের বাঁয়ে।
তা বেশ। কিন্তু একটা লোককে তুই দেখেছিস?
পেল্লাদ হি-হি করে হাসল।
একটা লোক কেন গো, কত লোককেই তো দেখেছি। এই তোমাদেরও তো দেখছি।
কথাটা ভুল হয়েছে বুঝে ট্যাঁপা মাথা চুলকোল। বললেন, নানা, একটা সাইকেলে-চড়া লোক। সাইকেলে চেপে কেউ এদিক দিয়ে যায়নি?
হুঁ, গেছে বই কি। একটু আগেই তো গেল।
কী রকম সাইকেল? নতুন?
নতুন কিংবা পুরনো–সে আমি কেমন করে জানব? তবে পেল্লাদ একটু ভেবে নিল : তা রোদ্দুরে বেশ চিকিমিকি করছিল বটে।
ঠিক ধরেছি তা হলে।–ট্যাঁপা একই সঙ্গে উৎসাহ আর রোমাঞ্চ বোধ করল : বুঝলি জয়, তা হলে ওই লোকটাই। আচ্ছা পেল্লাদ, লোকটা সাইকেল নিয়ে কোনদিকে গেল বলতে পারিস?
দাসপুরের দিঘির বাগেই তো গেল মনে হচ্ছে।–পেল্লাদ এবার চোখ মিটমিট করল : কেন গো, বিত্তান্তটা কী? এত খোঁজখবর নিচ্ছ কেন?
সে খবরে তোর দরকারটা কী?–ট্যাঁপা বিরক্ত হল : মোষ চরাতে যাচ্ছিলি তাই চরা গে। চল জয়, আমরা দাসপুরের দিঘির দিকে এগোই।
পেল্লাদ ব্যাজার মুখে বললে, বেশ লোক তো। নিজেরা আমায় সাত কাহন কথা জিজ্ঞেস করলে, আর আমি কিছু জিজ্ঞেস করলেই দোষ? ঠিক আছে, আর কিছু বলব না। আমি। বলেই বাচ্চা মোষটার পিঠে আবার লাঠির ঠোকা দিয়ে গান ধরল : দেখে এলেম নদীয়ায়–
জয়ধ্বজ একটাও কথা বলছিল না এতক্ষণ, চুপ করে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিল। ট্যাঁপা তাকে একটা খোঁচা দিয়ে বললে, দাঁড়ালি কেন, চল না।
