নেউলে?
আরে নিয়োগীদের নেউলে। ওর হাতটান আছে, বুঝলি? একবার ওর বাবার হাতঘড়ি চুরি করে মহিষাদলে কাকে বেচে এসেছিল না? তারপর ধরা পড়ে বাপের হাতে রাম-ঠ্যাঙানি খেয়েছিল। আমার সাইকেলটার দিকে কবার ও আড়ে আড়ে তাকিয়েছে–আমি লক্ষ, করেছি।
তা হলে নিশ্চয় এ নেউলে নিয়োগীরই কাণ্ড।
জয়ধ্বজ বিরক্ত হয়ে বললে, নাঃ, তুই জ্বালালি ট্যাঁপা। আরে সবটা আগে ভাল করে ঠাউরে নিতে দে না। তিন নম্বর, পঞ্চ সামন্ত। লোকটা সুবিধের নয়-জানিস তো। তার ওপর একটা সাইকেলের দোকান আছে তমলুকে। সেখানে ওটা অনায়াসেই বেচে দিতে পারে।
ট্যাঁপা প্রায় বলতে যাচ্ছিল, তবে ওটা পঞ্চু সামন্তই নিয়েছে–কিন্তু জয়ধ্বজের চোখের দিকে তাকিয়ে সামলে গেল।
জয়ধ্বজ বললে, আপাতত এই তিনজনকে দিয়েই শুরু করি। তারপরে অন্যদের কথা ভাবা যাবে। প্রথমে কার কাছে যাওয়া যায় বল দিকি?
মোনা পাল।
না, মোনা নয়। আগে নেউলে নিয়োগী। বলেই উঠে দাঁড়াল জয়ধ্বজ : চল ট্যাঁপা–নাউ টু অ্যাকশন।
নেউলে নিয়োগীর দেখা পেতে দেরি হল না। তার বাড়ির দিকে এগোতেই চোখে পড়ল, এক হাতে একটা ঠোঙা নিয়ে নিবিষ্ট মনে ডালমুট খেতে খেতে কোথায় চলেছে সে।
দূর থেকে ট্যাঁপা ডাকল :এই নেউলে, একটু দাঁড়া। তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।
শুনেই নেউলে দারুণ চমকে উঠল। হাত থেকে পড়ে গেল ডালমুটের ঠোঙাটা। তারপর আর কোনও দিকে না তাকিয়ে–মাঠের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে–টেনে দৌড়।
.
তিন
এই নেউলে, দৌড়চ্ছিস কেন? দাঁড়া না–আবার চেঁচিয়ে উঠল ট্যাঁপা।
কিন্তু কে কার কথা শোনে? নেউলে ছুটছে তো ছুটছেই–মনে হল, একেবারে হলদিয়ার বন্দরে পৌঁছবার আগে সে আর থামবে না। একটা পাটকিলে রঙের এঁড়ে গোৰু খুব যত্ন করে ঘাস-টাস খাচ্ছিলে, নেউলে উলটে পড়ল তার ঘাড়ে। গোরুটা লেজ তুলে দৌড় লাগাল–ম্যা ম্যা করে তিন-চারটে ছাগলও ছিটকে পড়ল চারদিকে।
আর নেউলে যে-ভাবে ছুটল, তাতে বোধহয় অলিম্পিক রেকর্ড হয়ে যেত একটা।
এই নেউলে–এই নেউলে–পালাচ্ছিস কেন?–পেছনে ছুটতে ছুটতে জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা সমানে ডাকতে লাগল। নেউলে একবার ফিরে তাকায়, আবার দৌড়তে থাকে। যেন
অলিম্পিক রেকর্ডটা না করে কোনওমতেই সে থামবে না।
তা রেকর্ডটা হয়েও যেত, খুব সম্ভব হলদিয়ায় পৌঁছেও যেত সে। কিন্তু খেতের আলের ওপর একটা মাটির চাঙাড়ে টক্কর খেয়ে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থমকে গেল। একটা ঝোঁপের ওপরে উলটে পড়ে কোলা ব্যাঙের মতো হাত-পা ছুঁড়তে লাগল সে, আর সেই ফাঁকে ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ গিয়ে তাকে ক্যাঁক করে চেপে ধরল, নেউলে আর একবার উঠে পড়বার চেষ্টা করবার আগেই।
নেউলে হাঁসফাঁস করে জয়ধ্বজকে আঁচড়ে দিলে, ট্যাঁপাকে কামড়াবার চেষ্টা করল। রেগে আগুন হয়ে গেল জয়ধ্বজ।
ভালো করে ওর হাত দুটো চেপে ধর তো ট্যাঁপা! হতভাগা আঁচড়ে কামড়ে দেবার চেষ্টা করছে! এক চড়ে আমি ওর একপাটি দাঁত খসিয়ে দিচ্ছি।
ট্যাঁপা পটলডাঙার টেনিদাকে কোট করে বললে, কিংবা এক চাঁটিতে ওর কান কানপুরে পাঠিয়ে দেওয়া যাক।
বেগতিক দেখে নেউলে হাঁউমাউ করতে লাগল : তোমরা আমায় মারছ কেন? ছেড়ে দাও বলছি।
তুই আমাকে আঁচড়ে দিলি কেন? ট্যাঁপাকে কামড়াচ্ছিলি কী জন্যে?
তোমরা কেন আমাকে মারতে এলে?
আমরা তো তোকে মারতে আসিনি। কেবল একটা কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছিলুম।
হুঁ, জিজ্ঞেস করতে!–নেউলে গজগজ করতে লাগল : আমি যেন কিছু জানি না। ভীম জ্যাঠার বাগান থেকে নারকোলী কুল পেড়ে খেয়েছি বলে তোমরা আমাকে ঠ্যাঙাতে এসেছ।
নারকোলী কুল!
ট্যাঁপা আর জয়ধ্বজ আশ্চর্য হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, আলগা হয়ে গেল হাতের মুঠো, আর ফাঁক বুঝে নেউলে উঠে পড়ল এক লাফে, চম্পট দেবার চেষ্টা করল।
কিন্তু জয়ধ্বজের ফুটবল খেলার অভ্যাস আছে, বেকাদায় পড়লে কেমন করে ফাউল করতে হয়, সেটাও তার বিলক্ষণ জানা। বসা-অবস্থাতেই সে চট করে একখানা পা ছুঁড়ে দিলে এবং তৎক্ষণাৎ আর একবার চিত হল নেউলে।
ওরে বাবা রে, মেরে ফেলল রে–! নেউলে চেঁচাতে লাগল।
গোঁ গোঁ করে জয়ধ্বজ বললে, ফের পালাবার চেষ্টা করবি তো ঠ্যাং ভেঙে দেব এবার। হয়রান হয়ে নেউলে বললে, সত্যি বলছি, আমি পাঁচিল টপকে ঢুকেছিলুম বটে, কিন্তু আট-দশটার বেশি কুল আমি খাইনি। দোতলার বারান্দা থেকে ভীম জ্যাঠা কে রে বাগানে? বলতেই আমি দৌড়ে পালিয়ে এসেছি। কুলগাছের ডাল কে ভেঙেছে তার কিছু জানি না কাঁদো কাঁদো হয়ে নেউলে সমানে বলে যেতে লাগল : সত্যি বলছি কিছু জানি না।
জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা আবার চুপ। নেউলে বলতে লাগল : সত্যি ভাই, আমায় ছেড়ে দাও। হতে পারে, দুচারটে কুল আমি বেশি খেয়েছি, লাফিয়ে নামবার সময় কুলগাছের এক-আধটা ডাল ভেঙেও যেতে পারে কিন্তু তোমার দিব্যি, আর কোনওদিন আমি তোমার মামার বাগানে ঢুকব না।
জয়ধ্বজ আর ট্যাঁপা আবার এ-ওর দিকে তাকাল। কী বলা যায় ভেবে পেল না।
তারপর একটু সামলে নিয়ে ট্যাঁপা বললে, আর সাইকেল?
কিসের সাইকেল?–নেউলে হাঁ করে তাকাল।
ট্যাঁপা আবার কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু আঙুলের একটা খোঁচা দিয়ে জয়ধ্বজ থামিয়ে দিল তাকে। ট্যাঁপাকে একবার চোখ টিপে বললে, তুই নাকি কার সাইকেলে ঢিল মেরে দুটো স্পোক ভেঙে দিয়েছিস?
