ট্যাঁপা আবার বললে, ওঠ জয়–এখন বসে থাকলে হবে না। দেরি করলে চোর যে কোথায় পালিয়ে যাবে ঠিক নেই। চল–চল
নেপালদা, বঙ্কিম পাণ্ডা আর সুরেশ হালদার সবাই একসঙ্গে বললে, হ্যাঁ, হ্যাঁ–দেরি করা ঠিক নয়। সুরেশ হালদার আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তক্ষুনি তাঁর ভীষণ কাশি এসে। গেল, আর বলতে পারলেন না।
জয়ধ্বজ উঠল, ট্যাঁপার সঙ্গে বেরিয়ে এল রাস্তায়। আর পেছনে নেপালদার দোকানে এই সাইকেল চুরির ব্যাপারটা নিয়ে দারুণ উত্তেজিত আলোচনা চলল, সুরেশ হালদার আরও বেশি করে কাশতে লাগলেন।
খানিকটা চুপচাপ করে–ট্যাঁপার সঙ্গে সঙ্গে গোঁজ হয়ে হাঁটতে লাগল জয়ধ্বজ। তারপর বললে, আমরা কোথায় যাচ্ছি রে ট্যাঁপা?
কেন, থানায়।
না, থানায় যাব না।
সে কী!–ট্যাঁপা আশ্চর্য হয়ে গেল; কী করবি তা হলে?
থানায় গিয়ে কী হবে?–জয়ধ্বজ বললে, ভূপেনকাকার বাড়িতে গত বছর চুরি হয়ে গেল, তারপর কী হল মনে নেই? পরদিন দারোগা এসে অনেক মিষ্টি-টিষ্টি খেয়ে বললেন, চোর ব্যাটাকে যদি একবার ধরে দিতে পারেন, তা হলে ওটাকে পিটিয়ে একেবারে তক্তা করে দেব। শুনে ভূপেনকাকা মনের দুঃখে বললে, চোরকে যদি ধরতেই পারব, তবে আপনাকে আর ডাকব কেন? আর ধরতে পারলে পিটিয়ে তক্তা করবার জন্য আপনাকে ডাকতে হবে না–ওটাও আমরাই পারব এখন। দারোগা রেগে বললেন, আপনার তো খুব চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। যান–যান, আপনার চোর আপনিই ধরুন গে। বলে সেই যে গেলেন, একেবারেই গেলেন। না, থানা-টানায় সুবিধে হবে না।
ট্যাঁপা বললে, কিন্তু–
জয়ধ্বজ বললে, দাঁড়া, একটু মাথা ঠাণ্ডা করে নিই। ওসব দারোগা-ফারোগার দরকার নেই। তুই আমাকে একটু হেলপ করতে পারবি?
কেন পারব না? কিন্তু তুই কী করতে চাস, সেইটেই আমি ঠাহর পাচ্ছি না।
জয়ধ্বজ বললে, যা করব, তোতে আমাতে।
–তোতে আমাতে।
–ট্যাঁপা আরও আশ্চর্য হল : আমরা কী করতে পারব?
–সব করতে পারব। উদ্ধার করব সাইকেলটা।
ট্যাঁপা বললে, তোর মাথা খারাপ হয়েছে, জয়! আমরা কি হেমেন্দ্রকুমারের জয়ন্ত না প্রেমেন মিত্তিরের পরাশর বর্মা? তুই বাংলা ডিটেকটিভ বই পড়ে পড়ে
মোটেই ডিটেকটিভ বই না।–জয়ধ্বজ বিরক্ত হল : তুই এ রকম ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র আর আমিও তো নেহাত হাঁদা গঙ্গারাম নই। দুজনে মিলে একটা কিনারা করতে পারব না? আয়, এই বাদাম গাছটার তলায় একটু বসা যাক। একটু ভেবেচিন্তে দেখা যাক সব–বুদ্ধি করা যাক একটা।
ট্যাঁপাকে প্রায় জোর করে টেনেই জয়ধ্বজ বাদাম গাছের তলায় এনে বসাল।
ট্যাঁপা বললে, কী পাগলামি করছিস তুই? মিথ্যে দেরি করে কী লাভ? বাদাম গাছের তলায় বসে আমরা প্ল্যান করব, আর সেই ফাঁকে চোর সাইকেলটা নিয়ে দশ মাইল রাস্তা পেরিয়ে যাবে।
জয়ধ্বজ বললে, না–যাবে না। আমার এই সাইকেল এদিক্কার সকলের চেনা। দিনে-দুপুরে ওটাকে নিয়ে কেউ বেশি দূর চালাতে সাহস পাবে না। যদি সরাতে হয় সরাবে রাতের বেলায়, দিনেও কোথাও লুকিয়ে রাখবে।
কিন্তু চোর যদি গাঁয়ের লোক না হয়? যদি পথ-চলতি কেউ ওটা নিয়ে সটকে থাকে?
পথ-চলতি কে এখন আসবে এদিকে? দুঘণ্টার মধ্যে ইস্টিশনে কোনও ট্রেন আসেনি, বাইরের কেউ খামকা এদিকে আসে না। নিয়েছে গ্রামেরই কেউ। কোনও চেনা লোক।
চেনা লোক।
সাইকেলটার ওপর অনেকেরই নজর পড়েছিল রে!
আচ্ছা জয়– ট্যাঁপার একটা কথা মনে হল :এমন তো হতে পারে, মজা দেখবার জন্যে কেউ ওটা নিয়ে লুকিয়ে রেখেছে একটুখানি?
হতে পারে, নাও পারে। কিন্তু মজা দেখবার জন্যেও যদি কেউ নিয়ে থাকে, তাকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে, জয়ধ্বজ মণ্ডলের সঙ্গে চালাকি চলে না। মোদ্দা কথা, আমরা ওটা খুঁজে বের করবই।
যদি খুঁজে না পাই?
পেতেই হবে।–জয়ধ্বজ গম্ভীর হয়ে বললে, মামা সাইকেলটা দেবার সময় আমাকে বলেছিল যত্ন করে রাখিস–কেউ চুরি-টুরি করে নিয়ে না যায়। আমি বলেছিলুম, কোনও চোরের ঘাড়ে তিনটে মাথা নেই যে, জয়ধ্বজ মণ্ডলের সাইকেল চুরি করে নেবে। মামা বলেছিল, বেশ, দেখব, কেমন হুঁশিয়ার ছেলে তুই। সাইকেলটা উদ্ধার না করে মামার কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারব আমি? প্রেসটিজ থাকবে আমার?
তা বটে–তা বটে– ট্যাঁপা ভাবনায় পড়ল।
তা ছাড়া সুরেশ হালদারকে তো জানিস। এক নম্বরের গেজেট। এখুনি খুকখুক করে কাশতে কাশতে মামার কাছে গিয়ে খবর দেবে–নেপালের চায়ের দোকান থেকে তোমার ভাগনের সাইকেল লোপাট। তখন আমার অবস্থাটা কী দাঁড়াবে, বল? নাঃ, এ অপমান সত্যু করা যায় না। সাইকেল উদ্ধার করে তারপর মামার কাছে গিয়ে বলব; দেখলে তো–জয়ধ্বজ মণ্ডলের জিনিস কেউ হজম করতে পারে না।
ট্যাঁপা অধৈর্য হয়ে বললে, তা নয় হল। কিন্তু এখানে বসে বসে ভাবলে তো আর ওটা ফিরে পাওয়া যাবে না।
দাঁড়া না–একটু বুদ্ধি খাটাই। আমি তোকে বলছি ট্যাঁপা, সন্ধের আগে গাঁ থেকে সাইকেল বেরুবে না। এখন বেলা সাড়ে নটা। তার মানে, প্রায় ঘণ্টা দশেক সময় রয়েছে আমাদের হাতে। আগে ভেবে দেখা যাক–কাকে কাকে সন্দেহ করা যেতে পারে!
আচ্ছা–ভাব।
প্রথমেই মোনা পাল।
শুনেই ট্যাঁপা চমকে উঠল : ঠিক বলেছিস। মোনা পাল দাগী চোর, চার বার জেল খেটেছে। একাজ ও ছাড়া আর কারুরই নয়।
দাঁড়া–দাঁড়া। দাগী চোর হলেও মোনা পাল গাঁয়ের কারও কিছু কখনও চুরি করেনি। ওকে লিস্টে প্রথমে রাখব না। তারপর নেউলে–
