আজ দুবছর ধরে ভাগনের কাজকর্ম দেখে মনে হয়েছে, না–ছেলেটার বুদ্ধিসুদ্ধি আছে, ওর ওপর ভরসা করা যায়। খদ্দেরের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করে, কথা কইতে জানে, আগের চাইতে বরং দোকানের কাটতি বেড়েছে। তাই খুশি হয়ে এবার ভীমরাজ জয়ধ্বজকে একখানা ভালো সাইকেল কিনে দিয়েছেন।
সাইকেল তো নয়–যেন রাজত্ব। যেদিন সকালে ব্রাউনপেপারে মোড়া নতুন সাইকেলটা তাকে দেখিয়ে মামা বললেন, ওটা তোর, তোকে দিলুম– সেদিন জয়ধ্বজ প্রথমটা বিশ্বাসই করতে পারেনি। একটা সাইকেলের শখ যে তার কতদিনের–সে কথা তার চাইতে বেশি আর কে জানে! এ যে না চাইতে হাতে স্বর্গ পেয়ে যাওয়া।
সাইকেলে চড়ে যেদিন প্রথম পথে বেরোল–মনে হল সে যেন মূর্তিমান সম্রাট।
নতুন সাইকেল-ঝকঝক তকতক করছে। তার রঙের গন্ধ, তার নতুন সিটের গন্ধ, তার চকচকে চেন, তরতর করে তার ছুটে চলা আঃ। গ্রামে তো আরও অনেক সাইকেলই আছে, কিন্তু রংচটা, ঝরঝরে, বুড়োটে। তার সাইকেল তাদের মাঝখানে রাজার রাজা।
বাঃ বেড়ে সাইকেলটি তো। লোকে মুগ্ধ হয়ে বলে।
হুঁ-হুঁ, মামা দিয়েছে।
তা দেবেই তো। ভীমরাজের তো আর পয়সার অভাব নেই।
এই সাইকেল নিয়ে জয়ধ্বজ পাগল। দুবেলা ধুয়ে-মুছে তকতকে করে রাখে। সবার সাইকেল থাকে বাড়ির বারান্দায় কিংবা উঠনে, কিন্তু জয়ধ্বজ রাত্রে তুলে রাখে শোওয়ার ঘরে। যতক্ষণ ঘুম না আসে, চেয়ে-চেয়ে সাইকেলটাকে দেখে। আলো-নেবানো ঘরে সাইকেলটা চিকচিক করে–মনে হয়, জয়ধ্বজের দিকে তাকিয়ে খুশির হাসি হাসছে সে।
নতুন সাইকেল পিচের রাস্তায় প্রাণের খুশিতে এগিয়ে যাচ্ছিল জয়ধ্বজ। সাইকেল তো চলেছে না, যেন উড়ছে। মাঠে তখনও শীতের শিশিরের গন্ধ–ছোলা আর কলাই শাকে ধানকাটা মাঠে সবুজের ছোপ, খেজুরগাছের ঝরা রসের কলসিতে ভিড় জমিয়েছে মৌমাছি আর ভীমরুলের ঝাঁক। জয়ধ্বজের মনে হল, জগতে এই মুহূর্তে তার মতো সুখী বোধহয় আর কেউ নেই!
সুখের মাত্রাটা আরও বাড়ল, যখন নেপালদার চায়ের দোকানের সামনেই চোখে পড়ল ট্যাঁপাকে।
ট্যাঁপা বললে, তোর নতুন সাইকেল বুঝি? চমৎকার হয়েছে তো।
কিন্তু সাইকেল তো আছেই। ট্যাঁপাকেই পাওয়া যাবে না। কদিন পরেই তার কলেজ খুলবে, সে চলে যাবে কলকাতায়। কত গল্প জমে আছে তার কাছে, কত খবর শোনবার আছে কলকাতার। সাইকেলটা দোকানের সামনে রেখে ট্যাঁপার গলা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে জয়ধ্বজ দোকানে ঢুকল। চেঁচিয়ে বললে, নেপালদা-দুগেলাস ভালো চা আর সব চেয়ে ভালো বিস্কুট।
.
ঘণ্টা দুই জমাট আড্ডা চলল। তারপর ট্যাঁপা বললে, চল, তোর নতুন সাইকেল দেখি।
তুই দেখে কী করবি?–জয়ধ্বজ হাসল : তুই তে পড়ুয়া ভালো ছেলে, সাইকেলে চাপতে পর্যন্ত জানিসনে।
তোর ক্যারিয়ারে উঠব।
খুব ভালো কথা। জয়ধ্বজ খুশি হয়ে বললে, আজ দিনটা ভারি সুন্দর, চল–তোকে ক্যারিয়ারে বসিয়ে ঈশানীতলার কালীমন্দির পর্যন্ত বেড়িয়ে আসি।
ট্যাঁপা আনন্দে হাততালি দিয়ে বললে, গ্র্যান্ড আইডিয়া।
কিন্তু বাইরে বেরিয়েই–
জয়ধ্বজ চমকে উঠল : ট্যাঁপা, সাইকেলটা তো দেখছি না।
সে কী রে।
এখানে–এই জায়গাতেই তো ছিল। তালা দিয়ে গিয়েছিলুম।জয়ধ্বজের মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল মাটিতে এই তো চাকার দাগ। কিন্তু সাইকেলটা কোথায় গেল? কেউ চুরি করে নিলে না তো?
চুরি!–ট্যাঁপা খাবি খায় : সে কী রে।
তা হলে যাবে কোথায়? নেপালদা–নেপালদা–
একটা ভাঙা পেয়ালায় ডিম ফেটাচ্ছিল নেপালদা, সেইটে হাতে করে লাফিয়ে বেরিয়ে এল সে। এল দোকানের আরও তিনজন খদ্দের। না, সাইকেলের খবর তারা কেউ জানে না। শীতের এই সকালে চারদিকের এই আলোর ভেতর-নতুন সাইকেলটা–জয়ধ্বজের ময়ূরপঙ্খী যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
জয়ধ্বজ একেবারে ধপ করে বসে পড়ল ধুলোর উপর।
.
দুই
সত্যিই সাইকেলটা উধাও! দিনে-দুপুরে হাওয়া!
না–কেউ কিছু জানে না। অথচ নেপালদা যেখানে দাঁড়িয়ে চা বানায়, ওমলেট তৈরি করে কিংবা টোস্ট ভাজে, সেখান থেকে তিন-চার হাত দূরেই সাইকেলটা ছিল। সাইকেলটা ছিল, বলতে গেলে, নেপালদার একেবারে চোখের সামনে। যে বাচ্চা ছেলেটা নেপালদার অ্যাসিসট্যান্ট সে তো সারাক্ষণই বাইরে ঘোরাঘুরি করছিল। তা হলে কে এর মধ্যে সাইকেলটা নিয়ে সরে পড়ল?
এ যে পি সি সরকারের ম্যাজিককে হার মানিয়েছে।
অবিশ্যি বাচ্চাটা একবার একটু দূরের টিউবওয়েলটায় জল আনতে গিয়েছিল; নেপালদাও হয়তো ভেতরে তখন চা-টা কিছু দিচ্ছিল তার খদ্দেরদের। সেই ফাঁকেই নিয়ে সটকেছে খুব সম্ভব। খুব ওস্তাদ চোর বলতে হবে! একেবারে তক্কে তক্কে ছিল।
ভারত্তিক বঙ্কিম পাণ্ডা বললেন, যা–নন্দীগ্রাম থানায় খবর দিয়ে আয়।
নেপালদা বললে, ছাই হবে। পুলিশের দারোগা থাকে তার হাজারো রকমের কাজকর্ম নিয়ে। সাইকেল-চোর খুঁজতে তার বয়ে গেছে।
বঙ্কিম পাণ্ডা মাথা নেড়ে বললেন, তা বটে, তা বটে। তবু চুরির ব্যাপার যখন, পুলিশে খবর একটা দিতেই হয়।
ট্যাঁপা বললে, তাই ভালো জয়, চল–আমরা থানাতেই যাই। অমন করে বসে পড়লে তো চলবে না–এমন চমৎকার ঝকঝকে সাইকেলটা, যেমন করে তোক উদ্ধার করতেই হবে।
সুরেশ হালদার গলায় একটা মাফলার জড়িয়ে এতক্ষণ খুকখুক করে কাশছিলেন। এবার একটু সামলে নিয়ে বললেন, দিনে-দিনে দেশের হল কী? চারদিক চোর-হেঁচড়ে একেবারে। ছেয়ে গেল নাকি?
