–আর তোর গিন্নীমা?
–এজ্ঞে, সাত-আট গজ হবে।
–শেম! ও তো টার্গেটে মারা নয়, পাহাড় শিকার করা। আচ্ছা, খগেন এখন কতদূরে আছে?
–অন্তত কুড়ি গজ হবে।
–তবে এই দ্যাখ—
খটাস করে বন্দুক ছুঁড়লেন আনন্দবাবু।
–বাপরে গেছি—
খগেন লাফিয়ে উঠল শূন্যে। তারপর মাটিতে পড়েই সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় লাফে চড়ে বসল মোটর সাইকেলে আর প্রাণপণে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করতে লাগল।
আনন্দবাবু বললেন–ভাবছিস হঠাৎ লাগল? তা নয়। তাদের সক্কলের চাইতে আমার হাতের টিপ যে কত ভালো, দ্যাখ আবার সেটা প্রমাণ করে দিচ্ছি।
আবার বন্দুক ছুঁড়লেন–খটাস।
–ওরেঃ বাবা!
এবার সিটের উপরেই দেড় হাত নেচে উঠল খগেন–আর তারপরেই ভট ভট আওয়াজ উঠল মোটর সাইকেলে। দেখতে দেখতে দাড়িগোঁফ আর সেই ধুসো-কোট সুষ্ঠু খগেনকে নিয়ে মোটর সাইকেল নক্ষত্ৰবেগে উধাও হয়ে গেল।
আনন্দবাবু বললেন কালীসাধনা করতে চলে গেল।
গোপাল মাথা নেড়ে বললে–এজ্ঞে, হ্যাঁ। মায়ের ডাক কিনা– বড্ড তাড়া।
(একটি বিদেশি গল্পের প্রভাবে)
জয়ধ্বজের জয়রথ (উপন্যাস)
শীতের মিষ্টি নরম রোদে জয়ধ্বজ মণ্ডল–যার ডাকনাম জয়–নতুন ঝকঝকে সাইকেলটায় চড়ে বেরিয়ে পড়েছিল।
সাইকেলটা এত নতুন, এত সুন্দর, আর প্যাড়লে পা ছোঁয়াতেই এমন তরতর করে চলে যে, জয়ধ্বজের মনে হচ্ছিল সে যেন একটা পক্ষিরাজ ঘোড়া কিংবা ময়ূরপঙ্খী নৌকোয় চড়ে এগিয়ে চলেছে। গ্রাম ছাড়িয়ে জয়ধ্বজ চলল স্টেশনের রাস্তায়। কোনও কাজ আছে, তা নয়। আজ রবিবার–দোকান বন্ধ। জয়ধ্বজের ছুটির দিন। এই দিনটাতে–স্টেশনের পাশে নেপালদার চায়ের দোকানে আড্ডাটা ভারি ভালো জমে। বিশেষ করে আচার্য বাড়ির সুকুমার–যাকে ট্যাঁপা বলে সকলে জানে, জয়ধ্বজের যে প্রাণের বন্ধু, তাকেও পাওয়া যাবে সেখানে। ক্রিসমাসে কলেজ বন্ধ, ট্যাঁপা কলকাতার হস্টেল থেকে দেশে এসেছে।
সাইকেলে করে যেতে যেতে ভারি ভালো লাগছিল জয়ধ্বজের। সাইকেলটা তাকে দিয়েছেন তার মামা ভীমরাজ পুরকায়েত। নাম ভীমরাজ হলেও মামা মোটেই ভীমের মতো দশাসই নন-লম্বা রোগা চেহারা, গলায় তুলসীর মালা, ভীষণ বৈষ্ণব–মাছ-মাংস-পেঁয়াজ স্পর্শ করেন না। মামীও খুব ভালো মানুষ-বাড়িতে বসে রঙ-বেরঙের দড়ি দিয়ে নানা রকম শিকে তৈরি করেন, থালার মতো সব বড় বড় ফুল-টুল কাটা বড়ি বানান, ক্ষীর আর নারকেল দিয়ে অনেক রকম মিষ্টি করতে পারেন। পলাশপুরের বাজারের সব চাইতে বড় কাপড়ের দোকানটার মালিক হলেন মামা। তাঁর ছেলেপুলে নেই, জয়ধ্বজ তাঁর একমাত্র ভাগনে। সবাই জানে, মামা তাঁর জমি-জমা, দোকানপাট সব জয়ধ্বজকেই দিয়ে যাবেন।
জয়ধ্বজের বাবা রেলে চাকরি করতেন। তার পাঁচ বছর বয়সের সময় তিনি একটা দুর্ঘটনায় মারা যান। সেই থেকে মামা বিধবা ছোট বোন আর ভাগনেকে দেখাশোনা করছেন।
লেখাপড়ায় জয়ধ্বজ যে খুব ভালো তা নয়। একবার ফেল করে যখন থার্ড ডিভিশনে স্কুল-ফাইন্যাল পাশ করল, তখন মামা বললেন, খুব হয়েছে, আর পড়ে কাজ নেই।
শুনে জয়ধ্বজের চোখে জল এসে গেল।
বা রে, আচার্যিদের ট্যাঁপা যে কলেজে পড়তে যাচ্ছে।
ভুরু কুঁচকে মামা বললেন, ট্যাঁপা ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করেছে–দুটো লেটার পেয়েছে। ও কলেজে পড়বে না তো কে পড়বে? আর তুই? স্কুল-ফাইন্যালে একবার ডিগবাজি খেলি, একশো-দেড়শো টাকার চাকরির জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াবি তো? কী লাভ তাতে, শুনি? ব্যবসাই লক্ষ্মী, জানিস তো? আমার দোকানে ভিড়ে পড় ব্যবসা শেখ–মানুষকে না ঠকিয়ে সৎপথে থাক–দেখবি, ধুলোমুঠো সোনা হয়ে যাবে।
জয়ধ্বজ গোঁ হয়ে বাড়ি চলে এল।
অবশ্য, জয়ধ্বজের নিজের যা জমিজমা আছে, তাতে এক রকম করে তার কলেজে পড়বার খরচটা যে চলে না যেত, তা নয়। ছেলের কষ্ট দেখে মারও দুঃখ হল। আর নিজের ছেলে বি-এ, এমএ পাশ করে পণ্ডিত হবে–কোন্ মা-ই বা তা চান না? কিন্তু দাদার বুদ্ধির ওপরে তাঁর অগাধ বিশ্বাস, তিনি জানেন, দাদা যা করেন তা ভালোর জন্যেই।
মা বললেন, মন খারাপ করিসনি বাবা-দাদা যা বলছেন, তাতে তোর ভালোই হবে। আমার বাবা তো সাত-আট বিঘে জমি আর বাস্তুভিটেটুকু ছাড়া কিছুই রেখে যাননি। দাদা নিজের চেষ্টায় অত বড় ব্যবসা গড়ে তুলেছে, অত সম্পত্তি করেছে। দাদার কথা শুনে চল, তাতে তোর উন্নতিই হবে।
কী আর করা–ভীষণ মন খারাপ করে জয়ধ্বজ মামার দোকানে চাকরি করতে গেল।
প্রথম প্রথম বেজায় বিরক্তি লাগত। কোথায় ট্যাঁপা কলকাতায় মজা করে কলেজে পড়ছে কত নতুন জিনিস শিখছে, ফাঁকে ফাঁকে কখনও যাচ্ছে গড়ের মাঠে খেলা দেখতে, কখনও চিড়িয়াখানায়; আর সে এই দোকানে বসে সমানে শুনছে : নামা ধনেখালি, আন শান্তিপুরী, দেখা বেগমপুর।
তারপর আস্তে-আস্তে সয়ে গেল। তারও পরে ভালো লাগতে শুরু করল। মামা ভীমরাজ পুরকায়েত আগাগোড়া নজর রাখেন তার দিকে। ভুলচুক হলে ছোটখাটো ধমকও দেন–এ ব্যবসার কাজ বাপু, সব সময় মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়।
অবশ্য মামার উদ্দেশ্য আলাদা। এত বড় ব্যবসাটা যার হাতে তুলে দিয়ে যাবেন, তাকে সব শিখিয়ে-পড়িয়ে যাওয়া দরকার- সব সময় লক্ষ রাখা উচিত তার ওপরে। ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে যে-দোকান তিনি গড়ে তুলেছেন, আনাড়ির হাতে তা নষ্ট হয়ে যাবে, ভীমরাজ তা কোনওমতেই সইতে পারবেন না।
