পিলটুর পিসিমা–অর্থাৎ কল্যাণীর দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
কিছুই হল না। কেবল আনন্দবাবুর ঘর-সংসার করেই তাঁর জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল।
বন্দুকটা হাতে নেবার পর থেকেই ক্রমাগত হাতটা যেন তাঁর নিশপিশ করছে।
একটা কিছু করা চাই–যে-কোনও একটা লক্ষ্যভেদ। দেওয়ালে টিকটিকি নেই–এত রাতে চড়ুই পাখিই বা তিনি পাবেন কোথায়? মনে পড়ল, একবার দাদার বন্দুকটা নিয়ে গাছে কী একটা পাখির দিকে তাক করেছেন, হঠাৎ একটা মস্ত বড় গোৰু শিং নেড়ে ফোঁস ফোঁস করে তেড়ে এসেছিল তাঁর দিকে। কল্যাণী ছোট হলেও তাঁর সাহস কম ছিল না। পাখি ছেড়ে গোরুটার দুটো শিংয়ের ঠিক মাঝখানে খটাস করে গুলি করে বসলেন।
গোরুটা থমকে দাঁড়াল। তারপরেই লেজ তুলে উলটো দিকে ভোঁ দৌড়!
কল্যাণীর চোখে যেন স্বপ্ন ঘনিয়ে এল।
বাগানের মধ্যে কে যেন বসে আছে। জ্যোৎস্নায় চওড়া পিঠটা দেখা যাচ্ছে তার। কল্যাণীর মনে হলো, ওই সেই শিং-ওলা গোরুটা ছাড়া আর কিছুই নয়। ওকেই গুলি করব? করি, করে দেখি না–কী হয়!
কল্যাণী বন্দুক তুললেন, নিশানা ঠিক করলেন।
তার একটু আগেই চাপাটি খেতে খেতে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গিয়েছিল খুবলাল সিংয়ের। সকালে যে-ছাগলটাকে সে বাগানে বেঁধে রেখেছিল, সেটাকে ঘরে আনা হয়নি। যদি শেয়ালের পেটে যায়?
চটপট বাগানে চলে এল খুবলাল।
আর খুঁটি থেকে ছাগলটার দড়ি খুলে দিতে গিয়েই দেখল–জানলায় গিন্নীমা দাঁড়িয়ে। চাঁদের আলোতে যেন ফ্রেমের ভিতর একখানা ছবি। আর তাঁর হাতে বন্দুক।
কিন্তু জানলায় দাঁড়িয়ে ও কী করছেন গিন্নীমা? আরে আরে–সোজা খগেনবাবুর পিঠ বরাবর তাক করছেন যে!
খুবলাল চোখ কচলাল। স্বপ্ন দেখছে না তো সে?
–খটাস—
–বাবা গো, গেছি—
প্রাণপণে লাফ মারল খগেন। আর গিন্নীমা টুপ করে জানলার নীচে বসে পড়লেন!
.
পিলটুর পিসিমা সোজা এসে বিছানায় আশ্রয় নিলেন। ততক্ষণে চটকা ভেঙেছে তাঁর।
ছিঃ ছিঃকরেছেন কী তিনি! শেষকালে তিনিও কিনা খগেনের পিঠে—
বাইরে কার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। কে এসে যেন ঘা দিল তাঁর দরজায়।
কল্যাণী উঠে দরজা খুললেন। বাইরে আনন্দবাবু আর খুবলাল সিং দাঁড়িয়ে।
স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে একবার কাশলেন আনন্দবাবু। তারপর বললেন–এই খুবলাল সিং বলছিল, ওর ভাইপো দুবলালকে যদি আমাদের হিনুর বাগানটায়–
কল্যাণী চটে উঠলেন।
–সেইজন্যে তুমি এত রাতে ওকে নিয়ে আমায় বিরক্ত করতে এলে? আমি তো বলেই দিয়েছি, ও-সব লোক দিয়ে আমার কাজ চলবে না?
–তা না হয় না-ই চলল। কিন্তু এই খুবলাল বলছিল, তুমি নাকি একটু আগেই বন্দুক দিয়ে খগেনের পিঠে–
কল্যাণী মেঝেয় বসে পড়তে পড়তে সামলে গেলেন। সামলে খাবি খেলেন বার কয়েক।
ভক্তিভাবে একটা সেলাম ঠুকল খুবলাল।
–তাই আমি বোলছি মাঈজী, দুবলালের নোকরিটা যদি মিলে যায়, তব হামি খুবলাল সিং কুছু দেখেনি, কুছু জানে না, কুছু বোলে না। নেহি তো–
কল্যাণী প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন–না-না, তুমি কিছু দেখোনি, কিছু জেনেও তোমার কাজ নেই। বাবুর যদি আপত্তি না থাকে, তা হলে কালই তোমার ভাইপো হিনুর বাগানের কাজে বাহাল হয়ে যাবে।
–মাঈজীর বহুৎ দয়া!
আর একটা জোর সেলাম ঠুকে বেরিয়ে গেল খুবলাল। আর বাইরে গিয়ে ছাগলটাকে কাঁধে তুলে নাচতে নাচতে চলল নিজের ঘরের দিকে। এই ছাগলটাই তার লক্ষ্মী–এরই গুণে তার অকর্মার ঢিবি ভাইপোটার গতি হয়ে গেল!
সেই সময় গগনভেদী রোল তুলে গিন্নীর ঘরে এসে প্রবেশ করল খগেন।
–কাকিমা–আবার!
কল্যাণী ভুরু কুঁচকে বললেন–কী আবার?
–আমার পিঠে গুলি মেরেছে।
শুনে চটে চেঁচিয়ে উঠলেন এবার কল্যাণী।
–তোর মাথাই খারাপ হয়েছে খগেন। রাতদিন কে তোর পিঠে গুলি মারতে যাবে, শুনি?
–কে মেরেছে কেমন করে বলব? তবে একেবারে কমলানেবুর মতো ফুলে উঠেছে। এবার।
আনন্দবাবু বললেন–বাত।
খগেন তারস্বরে বললে–না, বাত নয়।
–তবে আমবাত।
–আমবাতও নয়।
–ওহো, তা-ও বটে।–আনন্দবাবু মাথা নেড়ে বললেন কমলানেবুর মতো ফুলে উঠেছে বলছ যখন, তখন ওটা বোধহয় নেবুবাত।
–না, নেবুবাতও নয়। খগেনের আবার প্রবল প্রতিবাদ শোনা গেল।
–এজ্ঞে, বাত না হলে বাতিক। বাতের বাড়াবাড়ি হলেই বাতিক।–ইতিমধ্যে গোপাল এসে আসরে পৌঁছেছিল, শেষ কথাটা সেই ঘোষণা করল।
–বাতিকই বটে! পিলটুর পিসিমা এবার একমত হলেন গোপালের সঙ্গে।
খগেন এবার নিদারুণভাবে চেঁচিয়ে উঠল।
–ওসব বাজে কথা বুঝি না। এবাড়ি হচ্ছে স্রেফ মানুষ-মারা কল। এখানে আর আমি একদিনও থাকব না। আমার সমস্ত পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। কালই আমি বদরিকা আশ্রমে কালীসাধনা করতে চলে যাব।
কল্যাণী ঝামটা দিয়ে বললেন–তাই কর গে যা। আমার হাড় জুড়োয়।
আনন্দবাবু বললেন, হ্যাঁ, সেই ভালো। নইলে কাঁকের পাগলা গারদেই পাঠাতে হবে তোমাকে।
–হুঁম?—
ঝাঁকড়া দাড়িগোঁফের ভিতর থেকে এক বিকট হুঙ্কার ছেড়ে দাপাতে-দাপাতে চলে গেল খগেন।
.
পরদিন সকাল।
গেটের বাইরে নিজের মোটর সাইকেলটাকে ঠিক করছিল খগেন। এ বাড়িতে আর সে থাকবে না। মুরগি, সন্দেশ, আপেল আর দুশো টাকা মাইনের আশাতেও নয়।
একটু দূরে বাগানের ভিতর পিলটুর বন্দুক হাতে আনন্দবাবু আর গোপালের প্রবেশ। আনন্দবাবু গোপালকে জিজ্ঞেস করেলন-তুই কদুর থেকে মেরেছিলি খগেনকে?
–এজ্ঞে বাবু, বারো গজ হবে।
