বন্দুকে আওয়াজ উঠল–খটাস্।
আর সঙ্গে সঙ্গে ছটাস করে বাগদা চিংড়ির মতো লাফিয়ে উঠল খগেন। হেঁড়ে গলার আর্তনাদ উঠল কাঁপিয়ে–বাপরে–গেলুম!
গিন্নীর ড্রেসিং টেবিলের উপর বন্দুকটা নামিয়ে রেখে গোপাল তৎক্ষণাৎ ঘর ছেড়ে উধাও হল।
.
ছয় – শেষ মার
–কাকিমা–কাকিমা–কাকিমা—
রাঁচি নামকুম, হিনু–ডুরান্ডা সব একসঙ্গে কাঁপিয়ে খগেন গগনভেদী চিৎকার করতে লাগল।
রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন গিন্নী।
–কী হয়েছে! অত চেঁচামেচি কেন?
–চেঁচাব না? দক্ষযজ্ঞ করব এইবারে। আবার কে আমায় গুলি করেছে।
পিলটুর পিসিমা অবাক হয়ে গেলেন।
–পাগল নাকি? বন্দুক তো আমার ঘরে। কে গুলি করবে তোকে?
–তা জানি না, কিন্তু এই দ্যাখো, পিঠটা প্রায় ফুটো করে দিয়েছে এবার।
–অসম্ভব। পিলটু কখনও আমার ঘরে ঢুকবে না। তুই খেয়াল দেখেছিস খগেন।
–খেয়াল, খগেন হাঁই-মাই করে উঠল–পিঠটা টোম্যাটোর মতো ফুলে উঠেছে, আর তুমি বলছ খেয়াল! ও সব বদখেয়াল আমার নেই।
গিন্নী চিন্তায় পড়লেন। তারপর খগেনকে নিয়ে এগোলেন কর্তার ঘরে।
–শুনছ? আবার কে খগেনকে বন্দুক মেরেছে।
আনন্দবাবু এবার সত্যি সত্যিই আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
–কিন্তু বন্দুক তো তোমার ঘরে গুলি করবে কে? যত সব আজগুবি কথা! আমি তো আগেই বলেছি, অতগুলো মুরগির ডিম খেয়ে খগেনের পেট গরম হয়ে গেছে। তাই আবোল-তাবোল বকছে।
খগেন জোরালো গলায় প্রতিবাদ করল।
–না, আমি মোটেই আবোল-তাবোল বকছি না।
–নিশ্চয় বকছ! রাঁচিতে যখন এসেছ তখন আর একটু এগোলেই তুমি কাঁকেতে পৌঁছবে। সেইখানেই যাও, সেইটিই তোমার পক্ষে আদত জায়গা।
গিন্নী বললেন–থামো। খগেন, তা হলে তুমি বলতে চাও ভূতেই তোমাকে গুলি করেছে?
–ভূত-ফুত জানি না। আমার পিঠটাকে যেন ঝাঁঝরা করে দিল। কাকিমা, তুমি যদি এর ব্যবস্থা না করো, তা হলে এখানে আমি আর থাকব না। এখান থেকে সোজা বদরিকা আশ্রমে তপস্যা করতে চলে যাব।
আনন্দবাবু বললেন–আঃ, থামো না তুমি। শোনো খগেন, এখন এ-ভাবে আর দাপাদাপি কোরো না। আজ রাতে ভালো করে খেয়েদেয়ে গিয়ে ঘুমোও। কাল সকালে আমি যা হয় এর একটা ব্যবস্থা করব।
–বেশ, একটা রাত আপনাদের সময় দিচ্ছি। কাল সকালের মধ্যে যদি এর প্রতিকার না হয়–তা হলে আমি কিন্তু কেলেঙ্কারি করে ছাড়ব।
দাপাদাপি করতে করতে কাকিমার পিছনে পিছনে বেরিয়ে গেল খগেন।
খগেন মিথ্যা নালিশ করেনি, আনন্দবাবু তা বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু গুলিটা সত্যিই করল কে? পিলটু নয়–তিনিও নন। তবে কি ভূতের কাণ্ড?
ভাবতেই আনন্দবাবুর গা ছমছম করে উঠল, ভূতকে দারুণ ভয় পান তিনি। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, খগেনকে ভগবানও ভয় পান-ভূতের সাধ্য কি ওকে গুলি করে?
–বাবু?
ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ ঘরে এসে ঢুকল গোপাল।
–কী রে গোপাল, কাঁদছিস কেন?
গোপাল এসে আনন্দবাবুর পা জড়িয়ে ধরল।
–আমার মাইনেটা দিয়ে দিন বাবু, আমি এখান থেকে চলে যাব।
–সে কী রে? হঠাৎ কী হল তোর?–আনন্দবাবু আকাশ থেকে পড়লেন কুড়ি বছর চাকরি করে তুই হঠাৎ চলে যাবি মানে? তোর গিন্নীমা বকেছে বুঝি?
–কেউ বকেনি বাবু। আমি ভারি অন্যায় করেছি।–গোপাল ফোঁস ফোঁস করতে লাগল সমানে।
–কী অন্যায় করেছিস?
–আমি–আমি–খগেনবাবুর পিঠে গুলি করে দিয়েছি বাবু। হঠাৎ বন্দুকটা দেখে মাথাটা কেমন হয়ে গেল। ভাবলাম, ছেলেবেলায় অমন তাক ছেলে–একেবারেই ভুলে। গিয়েছি নাকি? তারপর–তারপর কী যে করে ফ্যালোম–
আনন্দবাবু হা হা করে হেসে উঠলেন।
–তা হলে ওটা তোর কাণ্ড! যাক–চেপে যা। বেমালুম চেপে যা। কিছু অন্যায় করিসনি। খগেনের পিঠে তাক করার রাইট সকলেরই আছে। কোনও দোষ করিসনি তুই।
–কিন্তু গিন্নীমা যদি সন্দেহ করেন—
–কোনও ভয় নেই, আমি আছি।
.
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে রাত সাড়ে এগারোটা বাজল। পিঠের ব্যথা ভোলবার জন্যে একটা আস্ত মুরগির রোস্ট একাই সাবাড় করল খগেন। তারপর বাগানে এসে বসল।
ওদিকে কাজকর্ম সেরে পিলটুর পিসিমা তাঁর জানলার সামনে এসে দাঁড়ালেন। পিলটুর পিসিমার মনে পড়ল, ছোটবেলায় তাঁর দিনগুলো আসামে কেটেছে।
যে শহরে তাঁরা থাকতেন, সেখান থেকে দূরে বর্মা সীমান্তের নীল পাহাড়গুলোকে দেখা যেত। মেঘ ঘনিয়ে আসত সেগুলোর উপর দিয়ে। গাছপালায় ভিজে হাওয়া মর্মর তুলত। কত ফুল ফুটত–আর কত প্রজাপতি! কী আনন্দে বনের ভিতর খেলা করে বেড়াতেন তিনি।
আর, কী দুরন্ত ছিলেন নিজেও!
তাঁর দাদার এয়ার গান ছিল একটা। তিনিও সুযোগ পেলেই দখল করতেন সেটা।
বেশ টিপও হয়ে গিয়েছিল হাতের। চড়ই মেরেছেন, দেওয়াল থেকে টিকটিকি নামিয়ে এনেছেন কতবার! সে আজ প্রায় চল্লিশ বছরেরও আগেকার কথা। এখনও কি সে হাতের টিপ তাঁর আছে?
ভাবতে ভাবতে একসময় পিলটুর বন্দুকটা টেবিল থেকে তুলে নিলেন তিনি।
দাদার বন্দুকটা এত সুন্দর ছিল না। কিন্তু বড় ছিল এর চাইতে। পিলটুর পিসিমা বন্দুকটা নিয়ে নাড়াচাড়া করে দেখতে লাগলেন। ঠিক এইভাবেই গুলি ভরতে হত। সবই প্রায় এক রকম।
তারপর কী খেয়াল হতে বন্দুকে গুলি ভরে দেওয়ালের দিকে চাইলেন একবার।
না–একটা টিকটিকিও কোথাও নেই। হাতে তখনও বন্দুকটা রয়েছে।
বাবা কত ভালবাসতেন। বলতেন, ইয়োরোপের মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে যায়। সিংহ, হিপো, আরো কত কী শিকার করে। আমার মেয়েকেও বিদেশি মেয়েদের মতো গড়ে তুলব। বাঙালীর মেয়েরা কেবল ঘরের কোণে বসে থাকে আমার কল্যাণী বাঙালী মেয়েদের অপবাদ দূর করে দেবে।
