তবে কি এ সব ভৌতিক ব্যাপার?
ব্যস, মনে করতেই আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। এইবার বুঝতে পারলুম, গাড়ির এই কামরটা নিশ্চয় ভুতুড়ে। তাই জংশন স্টেশনে লোকগুলো সব হুড়মুড়িয়ে এই গাড়ি থেকে নেমে পালিয়েছে, তাই মাড়োয়ারী দুজন এ-গাড়িতে উঠতে এসেও অমন ঊর্ধ্বশ্বাসে উলটো দিকে দৌড় দিয়েছে।
আর আমি এমন নিরেট গর্দভ যে এসব দেখেও কিছু বুঝতে পারিনি! এই মারাত্মক ভুতুড়ে কম্পার্টমেন্টে উঠে নিশ্চিন্তে ঘুম লাগিয়েছি!
কী করব এখন? নেমে পড়ব গাড়ি থেকে? তারপর যেদিকে চোখ যায়, টেনে দৌড় লাগাব?
কিন্তু এই অন্ধকারে চোখ আর কোন্ দিকে যাবে? দিগবিদিক দূরে যাক, নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না যে। আর পালাব? চোর-ডাকাতের হাত থেকে পালানো যায়, পুলিশের হাত থেকেও হয়তো যায়, কিন্তু ভূতের পাল্লা থেকে? খপ করে ত্রিশ গজ লম্বা একখানা হাত বাড়িয়ে ঘাড়টি টেনে ধরবে।
হঠাৎ টপ-টপ-টপাৎ। মাথার ওপর কয়েক ফোঁটা ঠাণ্ডা জল পড়ল। তারপরেই বাইরে বিটকেল ছারাৎ ছারাৎ আওয়াজ। ঠিক মনে হল, কে যেন একটা লম্বা পাইপ দিয়ে জল ছুঁড়ছে।
শুধু মনে হওয়া নয়-ঘারাৎ করে কোত্থেকে একরাশ বিচ্ছিরি জল আমার নাকে মুখে এসে আছড়ে পড়ল।
–বাপরে, গেছি গেছি বলে আমি জানলা বন্ধ করে ফেললুম। সমানে সেই আওয়াজটা চলতে লাগল-মনে হল, সেই অথই অন্ধকারে পেত্নীর বাচ্চা আলকা গোলা নিয়ে গেলি খেলছে।
আমি বসে বসে রঘুপতি রাঘব-টাঘব গাইতে চেষ্টা করলুম। গলা দিয়ে গান বেরুল না, খালি বঁ-বুঁ করে এমন যাচ্ছেতাই আওয়াজ বেরুতে লাগল যে আঁতকে উঠে চুপ করে গেলুম।
ভয়ে কাঠ হয়ে কতক্ষণ বসে আছি জানি না, জলের সেই ছারছ্যারানি কখন থেমে গেছে তা-ও টের পাইনি। আচমকা–সেই কালিঢালা অন্ধকার আর সাদা কুয়াশার ভেতরে একা লাল আলো। বিশ্বাস করবিনি প্যালা, শুধুই একটা লাল আলো। ঠিক গাড়িটার দিকে এগিয়ে আসছে–জানলার কাঁচের মধ্য দিয়ে আমি স্পষ্ট দেখলাম। আমার মনে হল, একচোখা যেন একটা দৈত্য হাঁ করে চলে আসছে আমার দিকে।
এতক্ষণ চুপ করেই দিলুম, এইবার আমি বাপ্ রে মা-রে করে একটা আকাশফাটানো চিৎকার ছাড়লুম। আর লাল আলোটা যেন শূন্যের ভেতরে থমকে দাঁড়াল-তারপরেই ধাঁ করে কোন দিকে যেন মিলিয়ে গেল।
আমার আর চোখ মেলে চেয়ে থাকবার সাহস ছিল না। বেশ বুঝতে পারছিলুম, আজ এই ভুতুড়ে রেলগাড়ির কামরাতেই অপঘাতে আমার প্রাণটা যাবে। একবার গলায় হাত দিয়ে পৈতেটা খুঁজে দেখলুম–কিন্তু তাকে তো সেই সাত বছর আগে জামার সঙ্গে ধোপাবাড়িতে চালান করে দিয়েছি, এখন আর কোথায় পাওয়া যাবে।
বেশ বুঝতে পারলুম, আজ আমার বারোটা বেজে গেল। আমাকে নিয়ে এই ভুতুড়ে কামরাটা যে কোন নরকে গিয়ে হাজির হয়েছে জানি না, কিন্তু এরপর একটার পর একটা বিভীষিকা আসতে থাকবে, আমার রক্ত একদম জমাট বেঁধে যাবে, তারপরেই সোজা হার্টফেল। বাড়িতে মা বাবার কাছে আর পৌঁছুতে পারব না–এখন থেকেই সোজা ভূতের। দলে ভর্তি হয়ে যাব।
চোখ বুজে মনে মনে রাম রাম জপ করছি, এমন সময়—
বাজখাই গলায় কে বললে, ইউ রোগ!
আঁতকে লাফিয়ে উঠলুম। অন্ধকার জায়গায় কোত্থেকে ঝলমলে আলো। আর সেই আলোয় ইয়া ঢ্যাঙা এক সাহেব দাঁড়িয়ে। আবার বাজখাই স্বরে বললে, ইউ রোগ! তুম্ কোন্ হ্যাঁয়?
ওরে বাপরে সাহেব ভূত! আমার রাম নাম গিয়ে ব্রহ্মরঞ্জে পৌঁছুল। আবার একখানা মোক্ষম চিৎকার ছেড়ে আমি গাড়ির মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়লুম। বিশ্বসংসার মুছে গেল!
এই পর্যন্ত বলে বলটুদা থামল। আমি আকুল হয়ে বললুম, তারপর?
–তারপর আর কী? ভীষণ যা-তা ব্যাপার।
—মানে?
–মানে আবার কী? কামরাটা খারাপ, জংশন স্টেশনেই সেই জন্যে ট্রেন থেকে কেটে নিয়ে শেডের মধ্যে ঢুকিয়েছিল আমাকে সুষ্ঠু। ঘুমের ঘোরে কিচ্ছু টের পাইনি আমি। জুত পেয়ে একটা কালো কুকুর আমার বিছানায় এসে উঠেছিল, গাড়ি ধোয়ার জল ছরছর করে আমার মুখে এসে পড়েছিল, লাল লণ্ঠন হাতে একটা কুলি এদিকে আসছিল, আমার চিৎকারে ভয় পেয়ে ডেকে এনেছিল ওদের ইন্সপেক্টারকে। আর তাকে দেখেই আমার দাঁতকপাটি লেগে গিয়েছিল।
আমি বললুম, অ্যাাঁ!
বলটুদা বললে, হ্যাঁ-হ্যাঁ। আমি তোদের টেনিদার মতো বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলি না, এ হল রিয়্যাল ভূতের ব্যাপার। আচ্ছা, এবারে বাড়ি যেতে পারিস।
এই বলে বলটুদা উঠে পড়ল। হনহন করে নিজেই হেঁটে চলে গেল আলেকজান্ডারের ভঙ্গিতে।
মৎস্যপুরাণ
বঙ্গে আর যাব কোথায়, বঙ্গেই তো আছি—একেবারে ভেজালহীন খাঁটি বঙ্গসন্তান। আসলে গিয়েছিলাম বঙ্গেশ্বরী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে।
সবে দিন সাতেক ম্যালেরিয়ায় ভুগে উঠেছি। এমনিতেই বরাবর আমার খাইখাইটা একটু বেশি, তার ওপর ম্যালেরিয়া থেকে উঠে খাওয়ার জন্যে প্রাণটা একেবারে ত্রাহি ত্রাহি করে। দিনরাত্তির শুধু মনে হয় আকাশ খাই, পাতাল খাই, খিদেতে আমার পেটের বত্রিশটা নাড়ি একেবারে গোখরো সাপের মতো পাক খাচ্ছে। শুধু তো পেটের খিদে নয়, একটা ধামার মতো পিলেও জুটেছে সেখানে—আস্ত হিমালয় পাহাড়টাকে আহার করেও বোধহয় সেটার আশ মিটবে না।
সুতরাং বঙ্গেশ্বরী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে বসে গোটা তিনেক ইয়া ইয়া রাজভোগকে কায়দা করবার চেষ্টায় আছি।
