বুঝতে পারলুম, টেনিদা বলটুদার প্রাণে দারুণ দাগা দিয়ে গেছে, আড়াই টাকার শোক আর বলটুদা ভুলতে পারছে না। আমি সান্ত্বনা দিয়ে বললুম, টেনিদার কথা ছেড়ে দাও, ও ওই রকম। তোমার ভূতের গল্পটাই বলল।
–গল্প? আমি বানিয়ে বলার মধ্যে নেই। যা বলব, একদম সত্য ঘটনা।
–আচ্ছা, বলতে থাকো।
তখন বলটুদা আর একবার বেশ করে কান চুলকে নিলে, তারপর বলতে থাকল।–
আমার বড়দির বড় মেয়ে–দিল্লিতে জমেছে বলে যার নাম রাজধানী, ছোটবেলায় যাকে আমি ভুল করে ‘দাদখানি’ বলে ডাকতুম, আর বড়দি যাকে বলত ‘ধানী লঙ্কা’, তার বিয়ে হয়েছে এক কোলিয়ারির ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে। এবার পুজোর ছুটিতে আমি দেখানে বেড়াতে গিয়েছিলুম।
দিন দশেক বেশ আরামে থেকে, খুব খেয়ে দেয়ে, ওদের মটর গাড়িতে অনেক বেড়িয়ে-টেড়িয়ে কলকাতায় ফিরে আসছিলুম। সন্ধের পরে গাড়ি বদলাতে হল ছোট একটা জংশন স্টেশনে। ট্রেনে বেজায় ভিড়, শেষে দেখি, পেছন দিকের একটা ছোট সেকেন্ড ক্লাস কামরা থেকে সব যাত্রী হুড়মুড় করে নেমে যাচ্ছে। দেখে খুব মজা লাগল, আমি ফাঁকা গাড়িটায় টুপ করে উঠে বসলুম। সতরঞ্চি-জড়ানো ছোট বিছানাটা পেতে, মাথার কাছে সুটকেসটা রেখে বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে বসে পড়া গেল।
ট্রেন আরও প্রায় কুড়ি মিনিট এখানে থাকবে, আমি বসে বসে দেখতে লাগলুম। অন্য সব গাড়িতে লোক উঠছে-নামছে, এদিকে কেউ আর আসছে না। বোধহয় পেছন দিকের গাড়ি বলেই এটার ওপর কারও নজর নেই। আমার ভীষণ ভালো লাগছিল। একটা রেলের কামরায় একলা যেতে ভারি মজা লাগে নিজেকে বেশ লাট-বেলাটের মতো মনে হয়।
এর মধ্যে জন দুই মাড়োয়ারী যাত্রী অনেক লাটবহর নিয়ে আমার গাড়ির দিকেই তাক করে আসছে বলে বোধ হল। ভাবলুম–এই রে, এসে ঢুকল বুঝি! হঠাৎ একজন লোক তাদের কী যেন বললে, অমনি তারা সঙ্গে সঙ্গে উলটো দিকে ছুটল। আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল বটে, কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলুম না। তারপরেই মনে হল, ওদের বোধ হয় থার্ড ক্লাসের টিকিট ছিল, ওই লোকটা বলে দিয়েছে এটা সেকেন্ড ক্লাস, সেই জন্যেই সরে পড়ল।
যাই হোক, বেশি ভেবেচিন্তে লাভ নেই। গাড়ি ছাড়তে আরও কিছু দেরি আছে, কিন্তু আমি আর বসতে পারছিলুম না। একে তো আসবার আগে রাজধানী বিস্তর খাইয়েছে, বলেছে, ‘ছোট মামা, রেলে খালি পেটে যেতে নেই, শরীর খারাপ করে।’ আমিও তাই শুনে লচিমাংস-মিষ্টিতে গলা পর্যন্ত ঠেসে নিয়েছি, তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেল, পেটে এখনও দেড় মন ভার। তায় রাত প্রায় সাড়ে দশটা বাজে, দারুণ ঘুম পাচ্ছিল। গাড়িতে যে ওঠে উঠুক, আমি তো আপাতত লম্বা হই।
যা ভাবা তাই করা। আমি শুয়ে পড়লুম। গাড়ি ছাড়তে বোধহয় মিনিট দশেক দেরি ছিল তখনও, কিন্তু আমার ঘুমিয়ে পড়তে তিন মিনিটও লাগল না। আর সেই ঘুমের ভেতরেই টের পেলুম ট্রেনের হুইসেল বাজছে, কামরাটা নড়তে আরম্ভ করেছে। প্রাণপণে চেষ্টায় আধখানা চোখ খুলে দেখলুম অন্য যাত্রী আর কেউ ওঠেনি। নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাক তবে।
নিশ্চিন্তেই আমি ঘুমোলুম।
রাত তখন কত হয়েছে জানি না, হঠাৎ আমার চটকা ভাঙল। ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে আর কী রকম একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে লাগছে। চমকে চেয়ে দেখি, গাড়িটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। কামরায় নিতল অন্ধকার–গোটা চারেক আলো জ্বলছিল, পাখা ঘুরছিল, কিন্তু এখন আলো নেই, পাখাও চলছে না।
ব্যাপারটা কী? বাইরে তাকালুম-কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না, শুধু কালো পাঁচিলের মতো থমথমে অন্ধকার। সে-অন্ধকারে একটাও তারা নেই, জোনাকি নেই, কিছু নেই। জানলার অন্য দিকে তাকালুম, ঠিক এক দৃশ্য। যেন রাতারাতি গাড়িটাকে কেউ একটা আলকাতরার সমুদ্রের ভেতর তলিয়ে দিয়েছে। তারপর মনে হল, কেবল আলকাতরা নয়, ধোঁয়ার মতো কী যেন কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে তার ভেতর–নিশ্চয় কুয়াশা।
ব্যাপারটা কী?
রাত যে কখনও এত অন্ধকার হয়, সে আমি স্বপ্নেও জানতুম না। আকাশে যদি ঘন কালো মেঘ দেখা দেয়, তার ভেতরেও অন্তত আবছা একটা আলোর আভাস থাকে, মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকায়। তাও যদি না হয়, লাইনের ধারে ঝোপে-জঙ্গলে অন্তত দুটো একটা জোনাকির ফুলকি জ্বলে। এমন কাণ্ড তো কখনও দেখিনি।
ট্রেন কি কোনও স্টেশনে থেমে আছে? তা হলে আলো কই? স্টেশনের বাইরে লাইন-ক্লিয়ার না পেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে? তা হলে সিগন্যালের বাতিও তো দেখা যাবে। কোথায় সেসব?
এদিকে একটা অদ্ভুত গন্ধ পাক খাচ্ছে আমাকে ঘিরে ঘিরে। আর কী নিদারুণভাবে যে মশা কামড়াচ্ছে–সে আর তোকে কী বলব প্যালা! তার ওপর দুর্দান্ত গরম! আমি বসে বসে ঘামতে লাগলুম।
বেঞ্চির ওপর পা ছড়িয়ে বসেছিলুম, মশাদের যত নজর দেখছি পায়ের ওপরেই। শেষে জেরবার হয়ে যেই একটা চাঁটি হাঁকড়েছি-তোকে কী বলব প্যালা–সেটা আমার পায়ে লাগল না!
খরখরে লোমওলা নরম কী একটা জিনিসের ওপর ঘপাৎ করে গিয়ে চড়টা পড়ল। ঘুৎ করে কী একটা বিটকেল আওয়াজ হল, কালো মতন কে যেন শুন্যে লাফিয়ে উঠল, আমার চোখের সামনে দুটো সবুজ আগুন দপদপ করে উঠল, তারপরেই কী যেন ধপাৎ করে বাইরে পড়ে গেল।
আমি বুঝতে পারলুম, কামরার দরজাটা খোলা!
উঠে বন্ধ করব কি, হাত-পা আমার আতঙ্কে ঠাণ্ডা হয়ে এল! কে এই কালো জীব–কী সে? ট্রেনের ভেতরে সে আমার পায়ের কাছে কোত্থেকে এল, কেনই বা চড় খেয়ে খুঁৎ করে লাফিয়ে উঠল, আর লাফিয়েই বা গেল কোথায়? অমন অস্বাভাবিক দুটো সবুজ চোখই বা কেন–আর সে চোখে কোন্ হিংস্র প্রতিহিংসা লুকিয়ে ছিল?
