এঁরা যখন চলে এসেছেন তখনও নির্জীব হয়নি গ্রাম। ছোটো হিস্যার খোকাদার কাছারিঘরের দোতলায় প্রায় সব সময় চলেছে নাচের মহড়া–এক, দুই, তিন। বড়ো হিস্যার কাছারিতে চলেছে নামকরা অভিনেতাদের পার্ট, কত অঙ্গভঙ্গি সহকারে মাস্টার তাদের শেখাচ্ছেন। তারপর মণীন্দ্রমোহন বসু মজুমদারের কাছারিতে চলেছে গান-বাজনার তোড়জোড়।
গ্রামে ছিল পোস্ট-অফিস। দূর গ্রাম থেকে কোনো লোক এসেছে দরকারে, যত শীঘ্র সম্ভব ফিরে যাবে; কিন্তু ভুলে গেছে সে তার জরুরি কাজ। একাছারি ওকাছারি ঘুরে দেখেশুনে ডাকঘরে যেতে যেতে ডাকঘর হয়ে গেছে বন্ধ!
গ্রামের মোহন শীল বিকট কালো পোশাক পরে কপালে বড়ো একটা সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে খাড়াহাতে জল্লাদের ভূমিকায় যখন থিয়েটারের আসরে অবতীর্ণ হয়েছে তখন অনেক ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে ভয়ে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। খোকাদার প্রকান্ড আটচালা ঘরে হচ্ছে যাত্রাগান–গ্রামের রাশভারী প্রকৃতির লোক সুরেশচন্দ্র ঘোষমহাশয় দলের সেক্রেটারি, দক্ষিণারঞ্জন বসুমহাশয় ম্যানেজার, শ্রোতার সংখ্যা অধিকাংশই মুসলমান, কিন্তু ‘টু’ শব্দটি নেই। কারণ জমিদার বাড়িতে গান, তারপর স্বয়ং জমিদাররা উপস্থিত। জায়গায় জায়গায় পেয়াদা এবং বরকন্দাজরা বাঁশের এবং বেতের লাঠি হাতে দন্ডায়মান হয়ে খবরদারি করছে।
যখন চড়ক পুজো এসেছে, তখন কী মাতামাতিই না শুরু হয়েছে। বালা সন্ন্যসীরা নানারূপ কৃচ্ছসাধন করে এই জাগ্রত এবং ক্রুদ্ধ দেবতার পুজোর জন্যে তৈরি হয়েছে। খোকাদার বেলতলা পুকুরের মধ্যে প্রকান্ড একটি আস্ত গাছ ডুবে আছে–যে সে গাছ নয়, ওর ভেতর রয়েছে দেবতা! প্রবাদ আছে চড়ক পুজোর ঢাকের বাজনা শুনলে ওই গাছ ভেসে ওঠে। এই পুজোর দিন যত সব ভূত, পেতনি, দানব, দত্যি নেমে আসে এবং অবাধে যাতায়াত করে; তাই ওইদিন আগে থেকেই সাবধান হয় ছেলে-মেয়েরা।
গাজন গান হবে। গ্রামের অক্ষয় পাল এবং নগরবাসী মন্ডল পুরাণ আলোচনার জন্যে তৈরি হয়ে এসেছে, কতলোক জমেছে। জ্ঞানীজন সব বসেছে সম্মুখে, পাশে দুটো ঢাক তৈরি হয়ে রয়েছে। হচ্ছে গাজন গান, কী সে আনন্দ! একবার শ্যাওড়া গাছের ডাল কাটায় গ্রামের একটা ছেলে ভীষণ অসুখে আক্রান্ত হয়। বাঁচবার আশা তার মোটেই ছিল না। পরে প্রকৃত ঘটনা জেনে মানত করে পুজো দেওয়া হয় গাছের গোড়ায়। তারপর সে রোগমুক্ত হয়। আমি নিজে দেখেছি। কাজেই অবিশ্বাস করতে পারি না। তবে হতে পারে কাকতালীয়।
বীজ বপনের সময় বৃষ্টির পাত্তা নেই। সারামাঠ প্রখর রৌদ্রতাপে ফেটে খাঁ খাঁ করছে। কৃষককুল হায় হায় করছে। অহোরাত্র কীর্তন হচ্ছে। হঠাৎ কেউ বলল গ্রামের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত নিশাতলা–ওখানকার দেবতা স্বপ্নে বলেছে পুজো দিতে! অমনি সবাই মিলে সেখানে গিয়ে দেবতার পুজো দেয়, তিন-চার মন দুধ দিয়ে যে যে গাছে দেবতা আছে তাদের স্নান করায়। আমরা দেখেছি সেই দিনই কি পরের দিন ভীষণ বৃষ্টি হয়ে মাঠ ভাসিয়ে দিয়েছে! বুদ্ধিতে এসবের ব্যাখ্যা চলে না। কী হিন্দু কী মুসলমান সবাই ওই জায়গাটিকে ভয় করে এবং ভক্তিও করে। হায়, আর কি কোনোদিন ফিরে যাব না সে দেশে, আমার সোনার গাঁয়ে!
কালীবাড়িতে আছেন জাগ্রত কালী, পাশে সাতটি শিব। প্রত্যহই পুজো হয়। আমরা শুনেছি আমাদের কালীবাড়িতে নরবলি পর্যন্ত হয়েছে!
ফাগুন মাস। কলকাতা থেকে সুধাংশুবাবু এসেছেন। অনেক গুলি এনেছেন। বাড়িতে তাঁদের বন্দুক আছে। ছেলের দল সব তৈরি হয়েছে ঘোড়ামারার বিলে পাখি শিকারে যাবে। কত আনন্দ এতে পেয়েছে গ্রামের ছেলেরা। তিন-চারটে বাতাবি লেবুর গাছ ছিল, কেউ কোনোদিন পাকা লেবু দেখেনি–কারণ ওসব দিয়ে ফুটবলের কাজ চালাতে হয়েছে।
পশ্চিমপাড়ার ঠিক কোনায় ছিল নগেন-ক্ষিতীশদের বাড়ি। তাদের মার সঙ্গে আমার মায়ের ছিল খুব ভাব। দুজনেই বিধবা। নিজের তিনটি ছেলে থাকা সত্ত্বেও কী ভালোই না বাসতেন তিনি আমাকে। প্রত্যেকদিনই গিয়েছি তাঁদের বাড়িতে আর কিছু মুখে না দিয়ে কোনোদিনই ফিরতে পারিনি। অনেকে মনে করিয়ে দিত, আমি ব্রাহ্মণের ছেলে, কিন্তু মাসিমার অপত্য স্নেহের কাছে কোনো কথাই টিকত না। মনেপ্রাণে মাসির মুখে হাসি দেখতে চেয়েছি। নগেন ক্ষিতীশ থাকত বিদেশে। মাসির দুঃখ, তারা ঠিকমতো চিঠি দেয় না। নগেন বড়োভাই হয়েও ক্ষিতীশের বিয়ের জন্যে চেষ্টা করছে না, আরও কত কী মাসি নালিশ জানাত আমার কাছে। আজ নগেন, ক্ষিতীশ, মাখন তিনজনেই সংসারী হয়েছে, বেশ সুখে-শান্তিতেই আছে। কিন্তু মাসি তাঁর বউ আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে দেশে থাকতে পারলে তাঁর কত বেশি আনন্দ হত!
তারপর বিশ্বকর্মা পুজোয় ভাঙার গাঙে নৌকাবাইচ। রতন সর্দার সকালেই তার বাবরি চুলে সাবান দিয়ে ফুলিয়েছে, কপালে বড়ো সিঁদুরের ফোঁটা দিয়েছে, লাল গামছা একখানা পরেছে, আর একখানা মাজায় বেঁধে এক হাতে ঢাল এবং অপর হাতে লকলকে ধারালো খঙ্গ নিয়ে নৌকোর ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে। আশিহাত লম্বা নৌকো, দশ-বারো হাত হবে তার গলুই। দু-পাশে পেতলের চক্ষু, আরও কত কী দিয়ে সাজানো। গলুই-এর ওপরে পেতলের দুটি সাপ ফণা তুলে রয়েছে এবং নৌকোর দোলায় দোলায় উভয়ে উভয়কে আঘাত করছে। রতন সর্দার বোল বলছে,
