.
কাইচাল
পুজোর ছুটি। ‘ঢাকা মেল’ ধরবার জন্যে ছুটে চলেছি। স্টেশন একেবারে জনারণ্য। তবু এ ভিড় অগ্রাহ্য করেই প্রতিবার বাড়ি যাওয়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে রওনা হয়েছি। একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে শেয়ালদা থেকে ট্রেন বেরিয়ে গেল। কলকাতার আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে চলেছি। চেনা চেনা গ্রাম ও শহরের পাশ দিয়ে হু হু করে এগিয়ে চলেছে ট্রেন। গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছি। আমার গ্রাম আমাকে ডাকছে ফরিদপুর জেলায় কাইচাল আমার গ্রাম।
ট্রেন থেকে নেমে নৌকোঘাটায় গিয়েছি, অমনি শত কণ্ঠে চিৎকার হয়েছে—’কোহানে যাবেন কত্তা, এদিকে আসেন।’ যে নৌকোখানি দেখতে একটু ভালো, গেলাম তার নিকট। মাঝির নাম মৈনুদ্দিন, এই তার আসল পেশা আর এমন বিশ্বাসী সে যে, নৌকোয় কিছু ফেলে গেলেও ফিরিয়ে দিয়ে যায়, সুতরাং ভাড়ার প্রশ্নই উঠল না।
নৌকো চলেছে। নৌকোর বাইরে বসে আছি, সব দেখছি। মাঝি বললে,–‘কর্তা, ছইর মধ্যে যান রইদ লাগবে।’ অবসন্ন দেহ, তবু ঝিম ধরে বসে আছি, কী যে এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। ফরিদপুরে ‘মাইজা মিয়ার খাল’ বিখ্যাত, তার মধ্যে নৌকো পড়েছে। মৈনুদ্দিন মাথাল নামিয়ে রেখে মাজার গামছা কষে নিল। চইরটাকে একটানে বের করে নিয়ে এক চিৎকার দিয়ে বলল, ‘যার যার হাতের বায়ে।’ তাড়াতাড়ি এগিয়ে এলাম, দেখি কিছু সাহায্য করতে পারি কি না। মৈনুদ্দিন দিল না, বলল—’আপনার নাগবে না, আপনি বসেন।’
নৌকো ছেড়ে দিলে, জিজ্ঞাসা করি কখন পৌঁছোতে পারব। সে বললে, সন্ধ্যাসন্ধি। পাট ভরতি, মুসুর ভরতি, আরও কতরকম পসরা ভরতি কত নৌকো ঝুপঝাঁপ শব্দে চলেছে নিকটবর্তী কোনো এক বন্দরের হাটে।
ঢাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বুঝলাম এসে পড়েছি, তবে আশপাশে ছোটো ছোটো আরও গ্রাম রয়েছে, তাই আমার গ্রাম কতদূর তা বুঝতে পারছি না! মৈনুদ্দিন বলল,–‘এই তো কাইচালের বিল, এটা পার হলেই আপনাগো গ্রাম দেহা যাবেনে।’
কাইচাল গ্রামের বাবুদের বিল। এর অনেক ইতিহাস আছে। আশপাশে ভূত-পেতনি ঘোরে আর বিলের মধ্যে সিন্দুকের ঘড় ঘড় শব্দও নাকি অনেকে শুনেছে। ফইটকার খালের মুখে একটা ভ্যাসালের কাছে গেলাম। সনাতন মাঝির ভ্যাসাল, ওপরে সে আছে, একটা ছোটো হ্যারিকেন লণ্ঠন বাঁধা। মাছটাছ আছে নাকি সনাতন?’ বলতেই একখান চার-পাঁচ সের ওজনের নলা এবং সের আড়াই পরিমাণ টাটকানি দিল সে। বলল, ‘লইয়া যান, দাম এখন দেওয়া নাগবে না। খালের ভেতর দিয়ে একখানা মুসলমান গ্রাম পার হতেই কানে ভেসে এল দোতারার ক্ষীণ শব্দ, বুঝলাম আমাদের গ্রামের নাপিতপাড়ার প্রসন্ন শীল। এ তল্লাটে ও ছাড়া আর কেউ এ যন্ত্র বাজায় না। আর জানতাম কর্মক্লান্ত দিনের শেষে রোজই ও দোতারা বাজায়। হঠাৎ ‘কাহার’ বাড়ির আলো দেখলাম, প্রশ্ন এল, ‘যায় কেডা?’ নৌকো গিয়ে ঘাটে লাগল।
গল্প শুনেছি যাতে বাইরের কোনো শত্রু কোনো হিন্দুর গ্রাম আক্রমণ করতে না পারে এইজন্যে এ তল্লাটের প্রায় প্রত্যেকখানি গ্রামই চতুর্দিকে মুসলমানদের দিয়ে ঘেরা। আমাদের গ্রামখানিও তেমনি। বহুপুরাতন গ্রাম, জমিদার প্রধান স্থান। কালীমন্দির শিবমন্দির, পুরোনো দিঘি, রামসাগর, শানবাঁধানো ঘাট ইত্যাদিতে তার সাক্ষ্য দেয়। বসু মজুমদারেরা পুরাতন বাসিন্দা। ছেলেগুলো উচ্চশিক্ষা পাওয়ায় সবাই প্রবাসী। তাই নাটমন্দিরের ওপরে উঠেছে বট পাকুড় গাছ, ভেতরে বাস করেছে কবুতর আর পেঁচা, তবু কিন্তু কোনো পুজো-অর্চনা বাদ যায় না।
প্রায় সমস্তরকমের জাতের বাস আছে এ গ্রামে। ভদ্র এবং শিক্ষিত লোকের সংখ্যা বেশি থাকায় আশপাশের সমস্ত লোকের আচার-ব্যবহার ভদ্র। উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত গৃহস্থের প্রায় সকলেরই ধানের গোলা, গাইগোরু এবং পুকুর আছে। তারপর প্রত্যেকখানি বাড়িই আম, নারিকেল, কলা, কাঁঠাল ইত্যাদি গাছে ঘেরা; প্রত্যেকের সঙ্গেই যেন নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধন। প্রত্যেকটি ঋতু উপভোগ করেছি পরিপূর্ণভাবে, কোকিলের কুহু কুহু রব, দোয়েলের শিস, পাপিয়ার তান। প্রকৃতিদেবী যেন আপন হাতেই সাজিয়েছেন গ্রামকে। উত্তর এবং দক্ষিণে প্রশস্ত মাঠ। শীতের দিনে দেখেছি পরিপূর্ণ যুবতীর ন্যায় মাঠখানি নানারকম রবিশস্যে ভরা–আবার বর্ষাকালে দ্বীপের ন্যায় মনে হয়েছে গ্রামটিকে। শীতের দিনে কাদের গাছি এসেছে খেজুর গাছে হাঁড়ি পাততে। ছেলেদের দল ছুটেছে তার পেছনে পেছনে,–‘ও গাছি একটা চুমড়ি দেবে?’ গাছি বলেছে, ‘পান নইয়া আইস।’ তার সাজ দেখলে মনে হত যেন সে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছে।
নির্মল ঘোষ, বিমল ঘোষমহাশয়রা বাড়ি আসছেন শুনলে সারাতল্লাটে সাড়া পড়ে যেত। আশপাশের গ্রামের লোকজন উদগ্রীব হয়ে উঠত দেখা করবার জন্যে। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা হয়ে উঠত চঞ্চল। খেলাধুলোর বন্দোবস্ত হত সকালে, দুপুরে, বিকালে–যাতে কেউ বাদ না যায়। সে কী আনন্দ! প্রত্যেকেই কিছু না কিছু পুরস্কার পেত। গ্রামের পূর্বদিকে সাত-আট মাইল দূর থেকে নির্মলবাবুর প্রতিষ্ঠিত স্কুল ঘর দেখে লোকে ‘ওই কাইচাল’ বলে এ গ্রাম ঠিক করে। কয়েক বৎসর হল একটি দাঁতব্য চিকিৎসালয়ও তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ ছাড়া দেশের ও দশের অনেক উপকার এবং কাজ এঁরা করেছেন। এঁদের কাজকর্ম দেখে সকলেই বলাবলি করত, লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্যে এঁরা দু-ভাই দৃঢ়সংকল্প।
