টুকরো-টুকরো কত ছবি আজ মনে পড়ে! মনে পড়ে স্বরূপদাস সাধুর কথা। একটা জীর্ণ আলখাল্লা গায়ে-হাতে খঞ্জনি আর কাঁধে শতচ্ছিন্ন ভিক্ষার ঝুলি। কিন্তু মুখে নিশ্চিত প্রত্যয়ের কী অপূর্ব প্রশান্তি এক পা ঊর্ধ্বে খঞ্জনি বাজিয়ে সে গাইত, ।
এতদিন পরে ঘরে এলি রে রামধন,
মা বলে ডাকে না ভরত,
মুখ দেখে না শত্রুঘন-ন-ন।
তখন অনুতপ্তা কৈকেয়ীর মর্মজ্বালা যেন যুগযুগান্ত পেরিয়ে আমাদের মনের ভেতর ছুঁয়ে যেত। বাড়ির সবাই এসে জড়ো হয়েছে উঠোনে, স্বরূপদাস খঞ্জনি বাজিয়ে নেচে-নেচে গান গাইছে। বাড়ির কুকুরটা পর্যন্ত অবাক হয়ে দেখছে–মাঝে-মাঝে কান খাড়া করে বোধহয় গানও শুনছে। সকলে ফরমাশ করে যাচ্ছেন–স্বরূপদাস অক্লান্তভাবে গান গেয়ে চলেছে কখনো-বা দেহতত্ত্ব, কখনো-বা শ্যামাসংগীত, কখনো-বা কৃষ্ণ-রাধিকার বিরহ-মিলন-কথা। যাওয়ার সময় কয়েক মুঠো চাল, কারও দেওয়া কিছুটা ডাল এবং আনাজ ঝুলিতে পুরে গুনগুন করে চলে যেত স্বরূপদাস।
আমাদের গ্রামে সংকীর্তনের রেওয়াজ ছিল খুব বেশি। প্রতিসন্ধ্যাতেই কীর্তন হত। রমণী পালের হাত ছিল মৃদঙ্গের বোল ফোঁটাতে ওস্তাদ। সরু লিকলিকে চোহারা–চুলগুলি বড়ো বড়ো। কীর্তনের সময় মৃদঙ্গটি কাঁধে ঝুলিয়ে সে যেভাবে লাফাতে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাতে আমরা অবাক হয়ে যেতাম। বড়ো-বড়ো চুলগুলি একবার এপাশে আর একবার ওপাশে কাত হয়ে পড়ছে, এক একবার এক-একটি প্রচন্ড লাফ দিয়ে সে যাচ্ছে ডান দিক। থেকে বাঁ-দিকে আর মৃদঙ্গের বোলে আওয়াজ উঠছে যেন গম্ভীর ওঙ্কারধ্বনির মতো। একবার জ্বরগায়ে অষ্টপ্রহর সংকীর্তনে মৃদঙ্গ বাজাতে গিয়ে রমণী পাল মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল অস্নাত, অভুক্ত অবস্থায়। কিন্তু তবু সে মৃদঙ্গ ছাড়েনি। কিন্তু আজ–আজ সে রমণী পালের। কাঁধে আর মৃদঙ্গ নেই-শান-বাঁধানো শহর কলকাতার পথে-পথে সে আজ ফিরি করে ফিরছে।
এক সময় আমাদের গ্রামে ‘নিমাই সন্ন্যাস’ পালাকীর্তনের ঢেউ আসে। প্রথম পালাকীর্তনের অনুষ্ঠান হয় আমাদের বাড়িতে। উত্তরপাড়ার বংশী, খগেশ, নীরু, আবু–এসব ছেলেরা এতে অংশগ্রহণ করে। বলা বাহুল্য, সেদিন উত্তেজনা ছিল প্রচুর–আয়োজন ছিল না। সাজপোশাকের কোনো বালাই ছিল না। খগেশ নিমাই সন্ন্যাসের পালায় শ্রীরাধার ভূমিকায় অভিনয় করে। শুক-শারি এসে গাইছে,
ওঠ-ওঠ রাইশ
শীভোর হল অমানিশি
ও হরি! শ্রীমতী রাধিকা প্যান্ট পরেই সলজ্জ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে শুক-শারির প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। কিন্তু সমস্ত দর্শকসমাজ এমনি অভিভূত হয়ে ছিল যে, এতে তাদের বিন্দুমাত্র রসবোধের ব্যাঘাত ঘটেনি।
শচীমাতার বিলাপে হিন্দু-মুসলমান সকলের চোখ সজল হয়ে ওঠে। ভোর হতেই পালা শেষ হয়ে বের হল প্রভাতফেরি। কাঁপা-কাঁপা, টানা-টানা সুরে সে কী গান–আমাদের বাড়ির দ্বাররক্ষী ছিল দুটো বড়ো তেঁতুল গাছও তল্লাটে এত প্রকান্ড গাছ আর ছিল না। তার চিকনচিকন পাতার ঝালর ছিঁড়ে সূর্যের আঁকাবাঁকা আলো এসে পড়ছে; আলো আর সুরে কী নেশাই না সেদিন লেগেছিল।
আমাদের গ্রাম থেকে কয়েক মাইল দক্ষিণে সাঁচার। সেখানকার রথযাত্রা’ আমাদের অঞ্চলে বিখ্যাত। প্রতিবছরই আমাদের বাড়ির নৌকা করে আমরা সবাই রথযাত্রায় যেতাম। সকাল সকাল খেয়ে-দেয়ে আমরা রওনা দিতাম। আশপাশে আরও কত নৌকা–কত দূরদেশ থেকে, কত ভিন গাঁ থেকে এরা আসছে। নৌকার ছইয়ের ওপর কারও কারও দেখছি জ্বালানি কাঠ বাঁধা–অর্থাৎ ২। ৩ দিন আগে থেকেই তারা রওনা দিয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় বাজার বা গঞ্জে নৌকা ভিড়িয়ে তারা আহারপর্ব সমাধা করে।
জগন্নাথদেব দর্শন ও রথের রশি ছোঁয়া নিয়ে ধর্মভীরু যাত্রীদের সে কী উন্মত্ত উন্মাদনা! কারও জামা ছিঁড়ে গেছে, রথের রশির কাদায় সর্বাঙ্গ চিত্রবিচিত্র হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেদিকে কারও লক্ষ নেই–মুখে শুধু ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনি। অদূরে অপেক্ষমান মেয়েরা হুলুধ্বনি দিচ্ছেন, ক্রমাগত শঙ্খ-কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ, নারীকন্ঠের হুলুধ্বনি জনতার জয়ধ্বনি মিলে মিশে একটি বিরাট শব্দস্তম্ভ রচনা করেছে যেন–চারিদিকে মানুষের কেবল মাথার সমুদ্র তার মধ্য দিয়ে চলেছে জগন্নাথের রথ। বিকেলের সূর্য তার ওপর আবির ছড়িয়ে দিচ্ছে মুঠোমুঠো। সে-দৃশ্য কি কখনো ভুলতে পারি?
রথযাত্রা শেষে যাত্রীদের বাড়ি ফেরার পালা। সন্ধ্যার অন্ধকার এসেছে ঘন হয়ে। নৌকায় নৌকায় সবাই ফিরছে–আর চারিদিকে খোঁজাখুঁজি চলছে যারা এখনও ফেরেনিঃ মাঝি তাদের হাঁক দিচ্ছে সন্ধ্যার শান্ত আবহাওয়ায় কাঁপা কাঁপা ঢেউ তুলে সে-ডাক আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। ছেলেরা কেউ সদ্য ক্রীত মেলার বাঁশিতে তুলেছে বিচিত্র বেসুরো আওয়াজ–কেউ ধরেছে গান।
এমনি কত কথা–কত ছবি আজ মনে পড়ে। কত কথা বলব আর কত ছবি আঁকব? বুকের পাঁজর খুলে দিতে কী ব্যথা তা কি কেউ কখনো বলে বোঝাতে পারে? হয়তো এমন দিন আসবে, যেদিন স্বরূপদাসের সেই গান–সেই গান গেয়ে কেউ আমাদের জন্যে এগিয়ে এসে বলবে,
এতদিন পরে ঘরে এলি রে রামধন,
মা বলে ডাকে না ভরত, মুখ দেখে না শত্রুঘন–
সেদিন কতদূরে?
.
চান্দিসকরা
বাড়ি থেকে চিঠি এসেছে : আমাদের কপালে যা আছে তাই ঘটবে, কিন্তু তুমি এ অবস্থায় কিছুতেই গ্রামে এসো না।
