আরতির ধূপছায়ার মধ্য দিয়ে দেখা ঝাপসা দেবী প্রতিমার মতো আজও চোখে ভাসছে আমার সেই ছোট্ট গ্রামটি–তার মধ্যে দেখেছি রূপকথার খুঁটেকুড়নি মায়ের নির্বাক বেদনার প্রতিমূর্তি। কালের একতারায় তাঁর অশ্রুর অশ্রুত রাগিণী যেন ডানা-ভাঙা পাখির মতো আজ কেঁদে কেঁদে ফিরছে।
গ্রামের নাম বায়নগর। ত্রিপুরা জেলার ছোট্ট একটি গ্রাম। শোনা যায়, আসলে এর নাম ছিল নাকি ‘রায়নগর’। এ গাঁয়ের জমিদার ছিলেন রায়েরা। রায়বংশের শেষপুরুষ অঘোর রায়ের প্রতাপ ছিল দোর্দন্ড। পাকা সবরি কলার মত গায়ের রং, উন্নত ঋজু নাসা আর ভোজালির মতো একজোড়া তীক্ষ্ণ গোঁফ ছিল রায়ের। অঘোর রায় যেমন ছিলেন বাঘের মতো ভয়ানক তেমন তাঁর রাগও ছিল প্রচন্ড। আকস্মিক উত্তেজনার বশে একদিন তিনি এমন একটি কান্ড করে বসেন যার ফলে তাঁকে শেষপর্যন্ত এ গ্রাম ছেড়ে যেতে হয়।
ঘটনাটি সম্পর্কে জনশ্রুতি এরকম। বাড়ির লাগোয়া একফালি জমিতে তিনি নানা দূরদেশ থেকে প্রচুর অর্থব্যয় করে নানারকম বাহারি ফুলের চারা এনে লাগিয়েছিলেন। ফুল আর ফুলকপির চাষে ছিল তাঁর সমান আগ্রহ, সমান অধ্যবসায়। একদিন ভিন গাঁয়ের এক জমিদারনন্দনের সদ্য ক্রীত টাট্ট ঘোড়াটি মালির সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে বাগানে ঢুকে পড়ে। খবর শুনেই তো অঘোর রায়ের ব্রহ্মরন্ধ্রে বারুদ জ্বলে উঠল–দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দুর্গাপুজোর সময় যে খঙ্গ দিয়ে মহিষ বলি দেওয়া হত তাই নিয়ে ঝড়ের মতো ছুটলেন তিনি বাগানের দিকে। পেছনে পেছন ছুটল তাঁর স্ত্রী, পাইক, বরকন্দাজ আর সব। খঙ্গের শানিত চোখ দুটি রক্তের তৃষ্ণায় ধকধক করে জ্বলছে, আর জ্বলছে অঘোর রায়ের ভাঁটার মতো দুটি চোখ। বাগানে ঢুকেই তিনি একলাফে গিয়ে ঘোড়াটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অশ্বদেহ দ্বিখন্ডিত করে সেই প্রচন্ড খড়ের কিয়দংশ মাটিতে ঢুকে গেল। রাজগন্ধার উজ্জ্বল লাল রক্তের ছোপ–সবুজ ফুল শাখায় বীভৎস ক্ষতের মতো রক্তের চাপ–অন্তঃপুরিকাদের অস্ফুট আর্তনাদ আর পাইক বরকন্দাজের শোরগোল সে এক বিকট দৃশ্য। কাঁপতে কাঁপতে অঘোর রায় হলেন ধরাশায়ী। তার পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। জমিদারে জমিদারে এ নিয়ে শুরু হলে প্রচন্ড বৈরিতা। মামলা-মোকদ্দমা আর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে বিপর্যস্ত হয়ে অঘোর রায় হলেন দেশত্যাগী। তারপর কালক্রমে রায়নগর রূপান্তরিত হল বায়নঘরে।
গ্রামটি মুসলমানপ্রধান–দু-দিকে মালীগাঁ আর থৈরকোলাতে হিন্দু প্রায় একজনও নেই। কিন্তু হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে জীবনযাত্রার আদান-প্রদানের তাগিদে এমন একটি সহজ হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল যে, কেউ কাউকে পর মনে করত না। গ্রামসুবাদে বয়ঃকনিষ্ঠরা পরস্পর পরস্পরকে দাদা, পুতি (কাকা), ঠাকুরভাই প্রভৃতি বলে ডাকত। এর আসল কারণটা প্রধানত অর্থনৈতিক। জীবিকার ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে এতটা ঘনিষ্ঠ ছিল যে, জীবনেও তার প্রভাব আসতে বাধ্য। গ্রামের হিন্দুদের মধ্যে যারা কৃতী পুরুষ তাঁরা প্রায় সবাই থাকতেন বিদেশে। এঁদের জোতজমি চাষবাসের ভার ছিল মুসলমান প্রধানিয়াদের হাতে। তাঁরা হাল-লাঙল দিয়ে জমি চষতেন, ফসল তুলতেন। যাঁরা বাড়িতে থাকতেন তাঁদের অর্ধেক ফসল দিয়ে দিতেন। এমনও হয়েছে যে, জমির মালিক হয়তো চিঠি লিখেছেন–তাঁর প্রাপ্য ফসলের মূল্য মনিঅর্ডার করে পাঠাতে। মুসলমান বর্গাদার প্রধানিয়ারা কড়াক্রান্তি হিসেব করে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন–কোথাও একবিন্দু ফাঁকি বা কারচুপি ছিল না। যেন মনে হত অলক্ষ্যে কোনো অদৃশ্য চক্ষু তাঁদের কারবার সব দেখছে–এমনি ধর্মভীরু আর নিরীহ ছিলেন তাঁরা। একটা নিশ্চিত বিশ্বাসের শক্ত জমিতে ছিল তাঁদের জীবনের ভিত, সদাসন্তুষ্ট কঠোর পরিশ্রমী আর নিরীহ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দেখেছি হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী অমায়িক আর প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার করতে। আমার কাকা ছিলেন ডাক্তার। বাড়িতেই প্র্যাকটিস করতেন। সন্ধ্যাবেলায় তাঁর বৈঠকখানায় এসে জুটতেন একে একে হাজি বাড়ির বড়ো হাজি, উত্তরপাড়ার আকবর আলি, পাঞ্জৎ আলি, মুনশি গ্রামের প্রধানিয়ারা। গাছপিঁড়িতে বসে যেতেন এঁরা–মাটির মালসাতে (দেশে বলে ‘আইল্যা’) তুষের আগুন জিইয়ে রাখা হত টিকে ধরাবার জন্যে। গভীর রাত্রি পর্যন্ত চলত বৈঠক, আর চলত ছিলিমের পর ছিলিম তামাক। যুদ্ধের সময়টা এখানে ভিড় হত বেশি। সবাই যেন শুনতে চায় আশার বাণী, আশ্বাসের বাণী- সবাই যেন প্রাণপণে বিশ্বাস করতে চায় এ দুর্দিনের অন্ত আছে। ডাক্তার কাকার কাছে তাই অনেকে ছুটে আসত, তাঁর কাছ থেকে সমর্থনের বাণী শুনবার জন্যে। কেউ খেতে পাচ্ছে না–রোগে ওষুধ নেই, পথ্য নেই, ডাক্তারকাকা তাঁকে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। স্বাস্থ্যোজ্জ্বল বলিষ্ঠদেহ মুসলমান চাষিদের দেহে বুভুক্ষা আর অনাহারের ছাপ ব্যাণ্ডেজ খোলা পোড়া ঘায়ের মতো মুখে শুকনো হাসি–যেমন করুণ তেমনি বীভৎস। রাজনৈতিক আধি আর ঝোড়ো হাওয়ার অন্তরালে একটি সহজ সরল জীবনের সমতল ভূমিতে সবাই হাতে হাত মিলিয়ে চলত এখানে। আমাদের বাড়ির কিছুদূরেই ছিল হাজিবাড়ি। এ বংশের কোন পুরুষ কবে একবার মক্কা গিয়ে ‘হজ’ করে এসেছিলেন, তাই থেকে এরা সবাই হাজি’। বড়ো হাজির কথা আজ মনে পড়ে। মেহেদি রঙের দাড়ি আর চোখদুটিতে ছিল একটা সরল বিশ্বাসের ছাপ, চোখ এমন করে হাসতে জানে–একথা এর আগে আমার জানা ছিল না। শেষরাত্রে তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের ‘আজান আমাদের পাতলা ঘুমের আস্তরণ ভেদ করে কানে এসে বাজত। আমাদের ভালো কোনো খবর পেলে এই মুসলমান বৃদ্ধটি সত্যি সত্যি খুশি হতেন–প্রাণখোলা হাসির ছটায় মেহেদি রঙের দাড়িতে একটা আলোর ঝিলিক ঠিকরে পড়ত যেন।
