বল্লালদিঘির উত্তর পাড়ের সুদীর্ঘ গজারি গাছ আজও সেন রাজার উদার উন্নত মনের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে কি না জানি না, তবে চার বছর আগেও জীর্ণ সে-গাছের ছায়াতলে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছি প্রায় আটশো বছর আগের গৌরবময় অতীতকে। প্রচলিত ধারণা, রাজার হাতি বাঁধা থাকত এ গাছে। কিন্তু দৈবপ্রভাব ছাড়া শ-শ বছর ধরে কী করে একটা গাছ সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, বিক্রমপুরের মানুষের মনে এ জিজ্ঞাসা অতিপুরাতন। ছেলে-মেয়ের দীর্ঘায়ুর আশায় কত মা এই অমর গাছের শীতল ছায়ায় বসে মানত করেছে, প্রার্থনা জানিয়েছে ভগবানের কাছে। কিন্তু আজকের ভগবানের দরজায় কি মানুষের কোনো প্রার্থনাই পৌঁছোয়? পূর্ববাংলায় আজ যাঁরা ক্ষমতার মালিক তাঁদের দম্ভকে স্বীকার করে আজও কি সেই গজারি গাছ তার অমরত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে?
রামপালের হরিশ্চন্দ্রের দিঘির আশ্চর্য কাহিনিও বিস্মৃত হওয়ার নয়। কতবার মাঘী পূর্ণিমার দিনে এ দিঘির অলৌকিক ব্যাপার দেখতে গিয়েছি বড়ো ঠাকুরদার সঙ্গে, আশপাশের গ্রাম থেকে এসেছে দলে দলে নর-নারী আর ছাত্র-শিক্ষকের দল। সারাবছর ধরে যে দিঘির জল থাকে মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে ‘দাম’-বনজংলায় ঢাকা, মাঘী পূর্ণিমায় তার সে কী সজল হাসিমাখানো রূপ! যে দামে’-র ওপর গোরু চরে, ছেলেরা ঘুড়ি ওড়ায়, পাখি ধরে, সাপ তাড়া করে দৌড়োয় দিনের পর দিন, সে ‘দাম’ এই একটি দিনের জন্যে দিঘির জলের কোন অতল তলায় তলিয়ে যায় কে জানে? পূর্ণিমা পেরিয়ে গেলে আবার ভেসে ওঠে যেমনি তেমনি। ব্রিটিশ সরকার এ বিস্ময়ের যবনিকা উত্তোলনের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এ প্রাচীন কীর্তির অবমাননাকারীর দন্ড ঘোষণা করে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘হাকিম নড়লেও হুকুম নড়ে না, এ প্রবাদ হয়তো শুধু প্রবা দই। তা ছাড়া পুববাংলায় আজ হয়তো কোনো হুকুমেই পরোয়া নেই কারুর। মানুষের জীবনেরই কোনো মূল্য নেই যেখানে, সেখানে অজানা অতীতের হিন্দুকীর্তি রেহাই পাবে অমর্যাদার হাত থেকে এ আশা দুরাশা বই কী! তবু আশা হয়, ভেঙে গেছে যে স্বপ্ন, বাংলার বহ্নি-হৃদয়ে আবার উজ্জ্বল হয়ে আলো দেবে সেই স্বপ্ন।
কলকাতার মানুষ হয়ে গেছি আজ। কিন্তু জন্মেছিলাম যার আঁচলজড়ানো কোমল মাটির নরম ধুলোয় তাকে তো ভুলতে পারিনি। দুঃখ আছে মনে, দিন-রাত্রির খাটুনিতে অবসাদ নামে দেহে, আর্থিক দৈন্যও থেকেই যায়। তবু ছুটি পেলেই একছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে প্রায় তিন-শো মাইল দূরের সেই গ্রামে! বিক্রমপুরের স্বপ্ন-ছোঁয়া সেই শ্যামল গাঁয়ের পায়ে হাঁটা পথ দিয়ে চলতে চলতে ইচ্ছে করে ছেলেবেলার মতো আবার গলা ছেড়ে সুর ধরি : ‘সার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে। এদেশ জন্মদুখিনী, তবু এই আমাদের সাত রাজার ধন, এক-শো হিরে-মানিক জ্বলে তার আকাশে।
কলকাতা থেকে গাড়ি করে গোয়ালন্দ। সেখান থেকে স্টিমারে পদ্মা পেরিয়ে ধলেশ্বরীর কোলে কমলাঘাট স্টেশন। স্টেশনের পর বন্দর। তারই অদূরে মীরকাদিমের হাট পেরিয়েই শুরু আমার গাঁয়ের রাস্তা, যাকে আগে বলেছি ‘রাজপথ’। খানিক এগিয়ে এলেই আমার গ্রামের মুখে সুখবাসপুরের সেই কড়ই গাছ। এখানে এসে বিশ্রাম-সাধ না জেগেছে এমন লোক বড়ো নেই। সেই কড়ই গাছের তলায় তিনসিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কত দুপুর, কত রাতে প্রার্থনারত মুসলমানদের আজানের ডাক ভেসে এসেছে বাতাসে বাতাসে। মনে হয়েছে এ ডাক বন্ধুত্বের, মৈত্রীর, ভালোবাসার।
আর একটু যেতেই নিবারভাঙার পুল। আমাদের কত আড্ডা জমত সেখানে স্কুলপালানো, ঘরপালানো কৈশোরের ক্লান্তিহীন উল্লাসে। কৈশোরের সেই বাঁধন না-মানা উন্মাদনা নিয়ে গ্রামোন্নয়নের কাজে সেবাদল করেছি, ডন-কুস্তির আখড়া করেছি, আর সেইসবেরই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়েছিলাম শান্তিসুধা লাইব্রেরি। সেসব আজ দূর অতীতের গর্ভে। কিন্তু তা হলেও সে-অতীত একথাই প্রমাণ করে, গ্রামের ছেলেরা একজোট হয়ে কত ভালো কাজ করতে পারে। এসব কাজে আমরা পেয়েছিলাম জীবনদার সাহচর্য। সময়ে-অসময়ে কতদিন কতরকমে পালিয়ে পালিয়ে ছুটে গিয়েছি তাঁর কাছে, তাঁর কর্মকেন্দ্র মহকুমা-শহর মুনসিগঞ্জে। অগ্নিসাধক সেই জীবনদার কাছে দীক্ষা পেয়েছিলাম সেবার, দেশপ্রেমের, বিপ্লবের। আজ তাঁর সান্নিধ্য থেকে অনেক দূরে সরে থাকলেও মুক্তিপাগল শঙ্কাহরণ সেই জীবনদার অকপট আদর্শ-নিষ্ঠার কাছে আজও মাথা নোয়াই।
অসহযোগের যুগে কংগ্রেসনেতা সূর্য সোমের বক্তৃতা শুনেছি, বক্তৃতা শুনেছি নামজানা না জানা আরও অনেক দেশভক্তের। তখন আমি কতটুকু! কিন্তু জ্বলন্ত বিদ্রোহের যে আগুন তাঁরা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন মনে, সে-বহ্নিদাহনে জীবনের সব জড়তা, হীনতা-দীনতা পুড়িয়ে ছাই করে খাঁটি মানুষ হওয়ার প্রেরণা পেয়েছিলাম সেদিন। অনেক চ্যুতি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও বড়ো হয়ে স্নেহ পেয়েছি তাঁদের অনেকের, বিশেষ করে সূর্য সোমমশাইয়ের। বছর বারো আগে শেষদেখা হয়েছিল সোম মশাইয়ের সঙ্গে। অবকাশ যাপনে কিংবা কোনো উপলক্ষ্যে গিয়েছিলেন তিনি দেশের বাড়িতে কর্মস্থল ময়মনসিংহ থেকে। আমিও তখন গ্রামে রয়েছি ছুটিতে। আমার কথা শুনেই খবর পাঠালেন। প্রণাম করতেই পিঠ চাপড়ে পাশে বসিয়ে বললেন, ‘শেষজীবনটা গাঁয়ের মাটিতেই কাটাব ঠিক করেছি। তোরাও আসিস, যখন ফুরসত পাবি ছুটে আসবি। গ্রামগুলোকে যদি বাঁচিয়ে রাখতে পারিস তো দেশ আপনি এগিয়ে যাবে। কথাগুলো সবই ঠিক। কিন্তু শেষজীবনটা গাঁয়ে কাটাবার শখ আর তাঁর মেটেনি। অল্পদিন পরেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়েছে তাঁকে প্রকৃতির আহ্বানে। আজ যে পরিবেশ তাতে আমাদেরই কি আর গ্রামসেবার সে-সুযোগ ঘটবে?
