উত্তরে ধলেশ্বরী, দক্ষিণে প্রমত্তা পদ্মা। মাঝখানে বহুর মধ্যে এক এই গ্রাম। বর্ষার প্লাবনে খরস্রোতা নদীর ঢেউ দোলন লাগিয়ে যায় আমার গ্রামের স্নিগ্ধ মাটির বুকে। বর্ষার বিক্রমপুরের রূপ অপরূপ! জলে জলময় ছল-ছল সব পল্লি। একবারের কথা বিশেষ করে মনে পড়ে। একেবারে ছেলেবেলাকার কথা। ঘরে ঘরে সাঁকো। এবাড়ি-ওবাড়ি যেতে আসতে নৌকো। তার ওপর বর্ষার জলে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের ভাসিয়ে দেওয়া ছোটো-বড়ো কাগজি নৌকো, কলার মোচা ও কলাগাছের বাকলের নৌকোর ছড়াছড়ি। বাড়ির উঠোনে খেলে যায় ছোটো ছোটো মাছ। সে-মাছ ধরার জন্যে ছোটোবেলায় সে কী মত্ততা! সন্ধে হতেই পাটখেতে ধানখেতে বঁড়শি পেতে রেখে আসার হিড়িক। ঘণ্টা দু-ঘণ্টা পর পর লণ্ঠন হাতে জল ঝাঁপিয়ে যেতে অনেক সময় হাসতে হাসতেই বঁড়শিতে সাপও তুলে নিয়ে এসেছে আমাদের মধ্যে অনেকে মাছের সঙ্গে সঙ্গে। সাপের ভয় ভয়ই নয় যেন! পুল থেকে দল বেঁধে লাফিয়ে পড়ে বর্ষার জলস্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার আনন্দও ভুলে যাওয়া চলে না। এমনি কত কী! শারদ বঙ্গের মাধুর্যও যেন ম্লান এখানে এক হিসেবে। মনে হয় বর্ষার বিক্রমপুরকে যারা দেখেনি, বিক্রমপুরের আসল রূপের সঙ্গেই তারা অপরিচিত।
আরও পরের কথা। আকাশে একটি-দুটি করে সবেমাত্র তারা ফুটতে শুরু করেছে। তারই ছায়া পড়েছে গোয়ালিনির কাকচক্ষু দিঘির জলে। কতকাল আগের কোন গোয়ালিনির স্মৃতি বয়ে চলেছে এ দিঘি জানা নেই। তবে সে অজানা গোয়ালিনির আভিজাত্য অস্বীকারেরও উপায় নেই। আমাদের বাড়ির সমুখ দিয়েই চলে গেছে বজ্রযোগিনী-মীরকাদিমের সড়ক। এই সড়কই আমাদের রাজপথ। রাজপথের ধারে অনেক দিঘির মতো গোয়ালিনি দিঘিরও একদিন মর্যাদা ছিল। কিন্তু আজ সে হৃত যৌবনা, তার কচুরিপানাময় জঞ্জাল রূপ আজ আর হয়তো কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। আমরা ছোটোবেলায় এ দিঘির ঘাটে বসে কত সময় কাটিয়েছি, কত গল্প করেছি, ছুরিতে কেটে, ঘেঁদা ঝিনুকে চেঁছে দিনের পর দিন খেয়েছি কত কড়া-কাঁচা আম! সে সবই আজ স্মৃতি।
দিঘির পাড়ের শ্মশানের আগুনের শিখাও চোখে ভাসে। কিন্তু আমার বাঙাল দেশজুড়ে আজ যে আগুন জ্বলছে তার লেলিহান শিখার, তার দাহিকা শক্তির প্রচন্ডতার বুঝি তুলনা নেই! সে-আগুনে ছাই হয়েছে মরা মানুষের অস্থি-মজ্জা-মেদ, এ আগুনে পূর্ণাহুতি তাজা তাজা হাজারো জীবন।
আমার গাঁয়ে পথচলতি মানুষ দলে দলে চলে উত্তরে দক্ষিণে–কাজ সেরে কেউ বাড়িমুখো, কেউ বাড়ি ছেড়ে কাজে, আবার কেউ বা হয়তো চলেছে আড্ডায়। রাত পড়তেই পথের এপাশে-ওপাশে কোনো-না-কোনো বাড়িতে নিশিকান্ত বা হরলালের কীর্তন আর না হয় শিশরির ‘ত্রিনাথের মেলা’-র গান শুরু হয়েছে বা হয়নি। এমনি ছিল আমার গাঁয়ের প্রায় প্রতিদিনকার সান্ধ্য পরিবেশ। সুখবাসপুরের সুধাকণ্ঠ গায়ক দুর্গামোহন মুখোপাধ্যায় আমাদের বাড়িতে প্রায় রোজই শ্যামাসংগীতের আসর বসাতেন এবেলা-ওবেলা। আর আমার ভক্তপ্রবর ঠাকুরদা স্বর্গীয় রাজমোহন বসু মজুমদার কেঁদে বুক ভাসাতেন সেসব গান শুনে। ভক্তিরসের বাহুল্য দেখে সেই ছোটোবেলায় আমরা হয়তো অনেক সময়ই হেসেছি। কিন্তু দুর্গামোহনের,
মা আছেন আর আমি আছি,
ভাবনা কি আর আছে আমার?
মায়ের হাতে খাই পরি
মা নিয়েছেন আমার ভার।
এসব সুললিত গানের কথা আজও যে ভুলতে পারিনি! কর্মক্লান্ত দিনের অন্যান্য অবকাশে কলকাতার ফুটপাথে চলতে চলতে কতদিন এসব ছায়াছবির মতো ভেসে উঠেছে মনের পর্দায়।
আজও মনে ক্ষণে ক্ষণে জেগে ওঠে বিক্রমপুরের সেই গ্রাম, যে গ্রামের নাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার নাড়ির যোগ। যখনই চিন্তায় হাতড়াই, কাছে এসে পড়ে বজ্রযোগিনী গ্রামের স্বপ্ন-মাখানো স্নেহভরা সেই স্মৃতি। মায়ের মতো ভালোবেসেছি এই গ্রামকে। আমার প্রায় সব-ভুলে-যাওয়া শৈশব আর সব মনে-থাকা কিশোর-জীবনের কান্না-হাসির দোলায় স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে আমার সেই ছেড়ে আসা গ্রাম।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বজ্রযোগিনীর নাম অবিস্মরণীয় সত্তা। শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও ঐতিহ্যে এ গ্রাম লক্ষ গ্রামের দেশ বাংলায় যেকোনো একটি নয়, স্বমহিমায় এ সবিশেষ। সুদূর অতীতের অন্ধকার যুগে বাংলার সত্যসন্ধানী যে ছেলে একদিন জ্ঞানের আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে দূরধিগম্য হিমাচলের দুস্তর গিরিমালা অতিক্রম করে তুষারঘেরা ঘুমের দেশ তিব্বতে উপনীত হয়েছিলেন ভগবান তথাগতের বাণী নিয়ে, সেই জ্ঞান-তাপস দীপংকর শ্রীজ্ঞান অতীশের পুণ্য জন্মভূমি এই গ্রাম। কিন্তু আজ আর পুকুরপাড়ায় সেই দীপংকরের ভিটেয় সন্ধ্যাদীপ জ্বলে না লক্ষ জনের কল্যাণ কামনায়, চলার পথে আজ আর হয়তো কোনো মানুষ সে-মহামানবের অসীম করুণার প্রত্যাশায় মাথাও নোয়ায় না ভক্তিবিনম্রচিত্তে ‘নাস্তিক পন্ডিতের ভিটে’-র সমুখ দিয়ে যেতে যেতে।
পাশের ঐতিহাসিক গ্রাম সেন রাজাদের অধিষ্ঠানভূমি রামপাল আজ শ্রীহীন। তার ভগ্নাবশেষের স্কুপের তলায় আশপাশে অতীত স্মৃতির যেটুকু শুচিতা অবশিষ্ট ছিল তারও সবটাই হয়তো আজ বিনষ্ট। মাইল দীর্ঘ রামপালের সেই বল্লাল দিঘি। প্রজার জলকষ্টে দুঃখপীড়িতা রাজমাতা ছেলের কাছে জানিয়েছিলেন তাঁর মনের বেদনা। পরদিনই দিঘি খননের আদেশ হল। রাজমাতা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে যতদূর পথ পায়ে হেঁটে যেতে পারবেন ততদূর দীর্ঘ ও তার অর্ধেক প্রস্থ জলাশয় হবে, বল্লাল রাজার এই হল প্রতিশ্রুতি। প্রজার জলাভাব মোচনে পথ চলায় রাজমাতার বিরাম নেই। রাজ-পারিষদগণের চোখে-মুখে দেখা দেয় উদবেগের ছাপ। শেষটায় কি সারারাজ্য জলময় হয়ে যাবে! পায়ের সামনে অজ্ঞাতে আলতা ঢেলে দিয়ে কৌশলে তখন কে থামিয়ে দেয় রাজমাতাকে পুরো একমাইল পথ হাঁটার পর। রক্তচিহ্ন দেখে ভয়ে থমকে দাঁড়ান মা-রানি। মাইলব্যাপী দিঘির জন্ম হল রাতারাতি। সারারাজ্য মুখর হয়ে উঠল বল্লালরাজ ও রাজমাতার জয়ধ্বনিতে। কিন্তু আজ? আজ আর প্রজার দুঃখে রাজার মন কাঁদে না, এমনকী রাজমাতা, রানি বা রাজ-ভগিনীদেরও নয়। সেখানে আজকের রাজা প্রজারক্ষায় নয়, প্রজাহননে যেন উল্লসিত–রাজপুরুষেরা তারই নানা সাফাই গায় বেতারে, বক্তৃতায়! আজ আর জয়ধ্বনিতে নয়, ক্রন্দন আর্তনাদে সারারাজ্য মুখরিত।
