মহুলি তাদের সংস্থা ছেড়ে চলে গিয়েছে অন্য কোথাও। বলে যায়নি তাকে। সেদিন যদি সে চন্দ্রাবলীকে ত্যাগ করত, কিছুই হত না। হয়তো চন্দ্রাবলী আরও একবার ছুটে আসত ভোরবেলা। যেমন এসেছিল যুবকটি। মহুলির কাছে। আর ফেরত গিয়েছিল। সেও ফেরত দিয়ে দিত চন্দ্রাবলীকে। ফেরত। কারও কাছে দিত। তার কাছে তো চন্দ্রাবলীকে প্রত্যর্পণ করেনি কেউ, চন্দ্রাবলী স্বয়মাগতা। কোনও দায়বদ্ধতা ছিল না তার। তবুও পারল না সে। পারল না। মানুষ ভালবাসে পরস্পর, নিকটতম হয়, কোনও কিছুই আড়াল করে না। প্রাণের সঙ্গে প্রাণ মিশিয়ে এক থালায় ভাত খায়, একই গ্লাসে জল, তবুও, মনের বিচিত্র গতি কোন অলক্ষ্যে প্ররোচিত করে তাদের। কোনও মুহূর্তে বিরুদ্ধভাবে ফুঁসে উঠে পরস্পরকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে। উভয়েই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে কারণ ততক্ষণে জয়-পরাজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আত্মসম্মান।
সেদিন মহুলির বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিল সে। মহত্ত্ব দিয়ে জয়ী হয়েছিল। পিতৃ-মাতৃহীন, স্বামীপরিত্যক্তা চন্দ্রাবলীকে ত্যাগ করতে না চাওয়ার মধ্যে তার মহত্ত্ব ছিল আকাশ পরিমাণ।
হঠাৎ তখন কথা বলেছিল চন্দ্রাবলী। পার থেকে নৌকা তখন অনেকখানি দূরে। ছোট্ট ডিঙি জল কেটে কেটে চলেছিল, চন্দ্রাবলী তরুণ মাঝিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল। দূরে একটি ছোট্ট দ্বীপ। সেইখানে সে যেতে চায়। মাঝি সেই দিকে নৌকা বাইছিল। আর গভীর সবুজ জলের মধ্যে, খোলা আকাশের নীচে অপার নৈঃশব্দ্যের মধ্যে চলতে চলতে শুভদীপের সমস্ত কাম, সমস্ত ক্রোধ আপনা হতে প্রশমিত হয়ে গিয়েছিল। চন্দ্রাবলী তখন একটি জীবনবিমার কথা বলে। সে সম্প্রতি বিমা করিয়েছে জীবন। এবং বিমা করিয়েছে তার গানের ইস্কুল। কেন-না ইস্কুলে আছে ভাল কিছু হারমোনিয়াম, তানপুরা, তবলা। আছেএস্রাজ ও সরোদ। সব তার বাবার করা। সব সে বিমা করিয়েছে এবং জীবনবিমার উত্তরাধিকার .সে দিয়েছে শুভদীপকে। যদি হঠাৎ কিছু হয়ে যায় তার, যদি জলে পড়ে যায় হঠাৎ আর ডুবে যায়…শুভদীপ মুখ ফিরিয়ে নেয়। থামিয়ে দেয় চন্দ্রাবলীকে। এই গভীর প্রকৃতির মাঝে তার জীবনবিমা ভাল লাগে না। চন্দ্রাবলী কথা বন্ধ করে না। যদিও শুভদীপকে সে যথাসাধ্য মান্য করে। কিন্তু আজ সে ব্যতিক্রম। শুভদীপের বারণ সত্ত্বেও সে কথা বলে যায়। পরের দিন দোলপূর্ণিমা, মনে করে দেয়। তাদের পরিচয়ের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি।
তখন ঝাকুনি লাগে নৌকায়। নৌকা পারে ভিড়েছে।
J.C. Leegwood
Royal Army Service Corps
Died on 17th August 1945. Age 31.
The Call was short
The shock severe
To part with one
We love so dear
—শেষের আহ্বান। শোকে নিমজ্জন। বিচ্ছেদ সইছে না। থাকে তীব্র ভালবাসি।
বুদ্বুদের মতো ভেসে ওঠা ছোট্ট একখানি দ্বীপ। বুনো কুল ও শেয়ালকাটার ঝোপ। গোলাকৃতি। মাঝবরাবর কচ্ছপের পিঠের মতো উঁচু।
তরুণ মাঝি একটি বুনোকুলের গাছের সঙ্গে নৌকা বেঁধে নেয়। বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে তখন। সূর্য দিগন্তগামী। লাল রং গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। তাদের দ্বীপে নামিয়ে দিয়ে আধঘণ্টা থাকতে পারার আশ্বসুদৈয় সে। চন্দ্রাবলী একটি নির্ভার, লঘু বালিকার মতো লাফিয়ে নামে দ্বীপে এবং মম্ভব্য করে, আয়তনে তার গানের ইস্কুলের সমান। শুভদীপ চারপাশ সন্তর্পণে দেখে নেয়। জল আর জল, দ্বীপ আর দ্বীপ্তা অনেক দূরে পার। ঢালু জমি বেয়ে ওপরে ওঠে তারা। শেয়ালকাটায় হাত ছড়ে যায়। মাকড়সার জাল লেগে যায় মুখে। কুলগাছের কাঁটায় চন্দ্রাবলীর দোপাট্টা আটকে যায়। তারা সাপ, বিছে, পোকা-মাকড়ের ভয় ডিঙিয়ে যে-দিকে মাঝি আর নৌকা আছে, তার উল্টোদিকে চলে যায়। জল ছুঁয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে দু’জনে। সূর্যও টকটকে লাল বেশ ধরে জল ছুঁয়ে ঠিক তাদের মুখোমুখি এসে পঁড়িয়ে থাকে। তাদের গায়ে বসন্তের সর্যাস্তরাগ মাখামাখি হয়ে যায়। চন্দ্রাবলী শুভদীপের দিকে অপলক তাকায়। শুভদীপকে তার লাগে অপরূপ। অগ্নিবর্ণ। রূপ ঠিকরোনো পুরুষ। শুভদীপও চন্দ্রাবলীতে চোখ রাখে। চন্দ্রাবলীকে তার মনে হয় উঁচু খোল থেকে বের হয়ে আসা একখণ্ড মাংসল শামুক।
আর শামুক তখন রূপ ঠিকরানো পুরুষের বুকে মাথা রাখে। সূর্য অল্প ডুব দেয়। আরও লাল হয়ে ওঠে। জড়িয়ে ধরে শামুক আর মুখ তোলে। হাত বাড়িয়ে পুরুষের মুখ টেনে নেয় মুখে। সূর্য তরতর করে অনেকখানি ডুবে যায়। লাল রঙে লালের ছোপ বাড়ে।
জিভের সঙ্গে জিভ জড়িয়ে যায়, শরীর জড়ায় শরীরে। বুনো কুল ও শেয়ালকাটার ঝোপে আঁধার লাগে। দূরবর্তী দ্বীপগুলির মাথায় গাছে গাছে তমসাবৃতা। সূর্য এখন রক্তের মতো লাল। নাক অবধি ডুবিয়ে, শুধু চোখ চেয়ে আছে সে। তার একফালি আলো এসে পড়েছে চন্দ্রাবলীর মুখে। সেখানে প্রেম, বিহুলতা, সমর্পণ, কামনা এবং প্রার্থনা টুকরো টুকরো হয়ে লেগে আছে জড়োয়া গয়নায় মণিমুক্তোর মতো। রোদুরের শেষ ফালিটুকু পড়ে ঝলমল করে উঠছে সেই সব। আর চন্দ্রাবলী বলছে, এই যে এই নির্জনতম দ্বীপ, তাদের একার দ্বীপ, তালসারির সমুদ্রপারের মতো একার—এই যে সূর্যকে সাক্ষী রেখে ঘনিষ্ঠতা, চুম্বন, জড়িয়ে থাকা, একেই কি বিবাহ বলে না?, সমাজের অনুষ্ঠানের মূল্য কি এর চেয়েও বেশি? আজকের পরেও কি বিবাহিত হয়ে রইল না?
শুনতে শুনতে সূর্য ডুবে যায়।
১৫. অবশেষে সূর্যালোক নিভে গেলে
অবশেষে, সূর্যালোক নিভে গেলে একজন আলোকবর্তিকা হাতে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। সাধারুণ পোশাকের সাধারণ লোক। শুধু চোখ দুটি করুণাময়। মুখে প্রসন্নতা কিন্তু দৃষ্টি ব্যথাতুরী যেন প্রত্যেকের যন্ত্রণা আহরণ করে দিনান্তে কাঁদবেন তিনি।
