তারপর ঘুমন্ত শিশুর মাথায় হাত দিয়া বলিলেন দীর্ঘায়ু হোক, ভাগ্য প্ৰসন্ন হোক।
কথা শেষ করিয়া গায়ের চাদরের ভিতরের খুঁট খুলিয়া বাহির করিলেন দুই গাছি বালা। হস্ত প্রসারিত করিয়া বলিলেন-ধর।
দেবু ও বিলু অবাক হইয়া গেল—এ বালা যে খোকারই বালা! আজই বন্ধক দেওয়া হইয়াছে।
–ধর। আমার কথা অমান্য করতে নেই। ধর মা, তুমি ধর।
বিলু হাত বাড়াইয়া গ্রহণ করিল হাত তাহার কাঁপিতেছিল।
–ছেলেকে পরিয়ে দাও মা। আজ অশোক-ষষ্ঠীর দিন, অশোক আনন্দে সংসার তোমাদের পরিপূর্ণ হোক।
তারপর হাসিয়া বলিলেন–বিশ্বনাথের স্ত্রী, আমার রাজ্ঞী শকুন্তলা। তিনি এসে আমায় সংবাদটা দিলেন। বাউরি-বায়েনদের গরু খোঁয়াড়ে দেওয়ার সংবাদ আমি পেয়েছিলাম। ভাবছিলাম কাউকে পাঠিয়ে দিগরুগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে আসুক। গো-মাতা ভগবতী অনাহারে থাকবেন। আর ওই গরিবদের হয়ত যথাসর্বস্ব যাবে গরুর মাসুল দিতে। এমন সময় সংবাদ পেলাম-দেবু মণ্ডল গরুগুলি ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। আশ্বস্ত হলাম। মনে মনে তোমাকে আশীর্বাদ করলাম। মনে হল-বচব, আমরা বাঁচব। মনে হল সেই গল্পের কথা। সঙ্কল্প করলাম—একদিন তোমাকে ডাকব, আশীর্বাদ করব। সন্ধ্যার সময় বিশ্বনাথের স্ত্রী এসে বললে—দাদু, শিবকালীপুরের পণ্ডিতের কাজ দেখুন তো! ষষ্ঠীর দিন আজ সে ছেলের হাতের বালা বন্ধক দিয়েছে আমাদের চাটুজ্যেদের গিন্নির কাছে। গিনি আমায় দেখিয়ে বললে—দেখ তো নাতবউ, পনের টাকায় ভাল হয় নাই? আমার মনটা আবার ভরে উঠল, মণ্ডলমশায়, অপার আনন্দে। মনে মনে বারবার তোমাকে আশীর্বাদ করলাম। তবু মন খুতখুঁত করতে লাগল। ষষ্ঠীর দিন, শিশুর অলঙ্কার, অলঙ্কারের জন্য শিশু হয়ত কেঁদেছে। আমি তৎক্ষণাৎ নিয়ে এলাম ছাড়িয়ে। কারও হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিতে প্রবৃত্তি হল না। নিজেই এলাম। তোমাকে আশীর্বাদ করতে এলাম। তুমি দীর্ঘজীবী হও, তোমার কল্যাণ হোক। ধর্মকে তুমি বন্দি করে রাখ কর্মের বন্ধনে। তোমার জয় হোক। দাও মা; বালা পরিয়ে দাও ছেলেকে। মণ্ডল, টাকা যখন তোমার হবে, আমায় দিয়ে এসো; তোমার পুণ্য, তোমার ধর্মকে আমি ক্ষুণ্ণ করতে চাই না।
টপ টপ করিয়া দেবুর চোখ হইতে জল ঝরিয়া পড়িল।
বিলুর চোখ হইতে ধারা বহিতেছিল। সে বালা দুই গাছি ছেলেকে পরাইয়া দিল।
ন্যায়রত্ন বলিলেনকেঁদো না, একটা গল্প বলি শোন।
এমন সময় যতীন আসিয়া ডাকিল—দেবুবাবু!
–যতীনবাবু আসুন—আসুন!
ন্যায়রত্ব হাসিয়া প্রশ্ন করিলেন–ইনি?
দেবু যতীনের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিল।
যতীন কয়েক মুহূর্ত ন্যায়রত্নকে দেখিল; তারপর তাঁহাকে প্রণাম করিয়া বলিল—আপনার নাতি বিশ্বনাথবাবুকে আমি চিনি।
ন্যায়রত্ন প্রথমে নমস্কার করিয়া, পরে যতীনকে আশীর্বাদ করিলেন। তারপর প্রশ্ন করিলেন-চেনেন তাকে? আপনাদের সঙ্গে সে বুঝি সমগোত্রীয়?
এ প্রশ্নে যতীন প্রথমে একটু বিস্মিত হইল; তারপর অর্থটা বুঝিয়া হাসিয়া বলিল—গোত্র এক, গোষ্ঠী ভিন্ন।
ন্যায়রত্ন চুপ করিয়া রহিলেন, কোনো উত্তর দিলেন না।
যতীন বলিল—তারা নাপিত আমায় সংবাদ দিলে, আমি ছুটে এলাম। আপনাকে দেখতে এলাম।
–দেখবার বস্তু আর কিছু নাই—দেশেও নাই মানুষেও নাই। প্ৰকাণ্ড সৌধ, বটবৃক্ষ জন্মে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। চোখেই তো দেখছেন। তারপর হাসিয়া বলিলেন—তাই মধ্যে মধ্যে যখন দুর্যোগে বজ্রাঘাতের আঘাতকে প্রতিহত করতে দেখি সেই সৌধের কোনো অংশকে, তখন। আনন্দ হয়। আজ মণ্ডল আমাকে সেই আনন্দ দিয়েছে।
দেবু কথাটা পরিবর্তন করিবার জন্য বলিল—আপনি একটা গল্প বলবেন বলছিলেন।
–গল্প? ফাঁ বলি শোন।–-এক ব্রাহ্মণ ছিলেন, মহাকর্মী, মহাপুণ্যবান। জ্যোতির্ময় ললাট, সৌভাগ্যলক্ষ্মী স্বয়ং ললাট-মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিটি কর্ম ছিল মহৎ এবং প্রতি। কৰ্মেই ছিল সাফল্য; কারণ যশোলক্ষ্মী আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁর কর্মশক্তিতে। তাঁর কুল ছিল। অকলঙ্ক, পত্নী-পুত্র-কন্যা-বধূর গৌরবে অকলঙ্ক কুল উজ্জ্বলতর হয়ে উঠেছিল—কারণ কুললক্ষ্মী তার কুলকে আশ্রয় করেছিলেন। পাপ অহরহ ঈর্ষাতুর অন্তরে ব্রাহ্মণের বাসভূমির চারিদিকে অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তার সহ্য হয় না। বহু চিন্তা করে সে একদিন সঙ্গে করে আনল অলক্ষ্মীকে। বাড়ির বাইরে থেকে ব্রাহ্মণকে ডাকলে। ব্রাহ্মণ বললেন—কি চাও বল?
পাপ বলল—আমি বড় দুর্ভাগা। দুঃখ-কষ্টের সীমা নাই। আমার সঙ্গিনীটিকে আপনি কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিন—এই আমার প্রার্থনা।
ব্রাহ্মণ বললেন-আমি গৃহস্থ, আশ্রয়প্রার্থী দুস্থকে আশ্রয় দেওয়া আমার ধৰ্ম। বেশ, থাকুন। উনি। বধূ-কন্যার মতই যত্ন করব। ইচ্ছা হলে যতদিন দুর্ভাগ্যের শেষ না হয়, ততদিন তুমিও থাকতে পার। এস, তুমি এস।
আহ্বান সত্ত্বেও পাপ কিন্তু পুরপ্রবেশ করতে সাহস করল না। কারণ ব্রাহ্মণকে আশ্রয় করে রয়েছেন ধর্ম।
যাক অলক্ষ্মীকে আশ্রয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপর্যয় ঘটল। ফলবান বৃক্ষগুলির ফল যেন নীরস হয়ে গেল, ফুল ম্লান হল।
রাত্রে ব্রাহ্মণ জপ করছেন—এমন সময় শুনতে পেলেন এক করুণ কান্না। কেউ যেন করুণ সুরে কাঁদছে। বিস্মিত হয়ে জপ শেষ করে উঠতেই তিনি দেখলেন তারই ললাট থেকে বেরিয়ে এল এক জ্যোতি, সেই জ্যোতি ক্রমে এক নারীমূর্তি ধারণ করল। তিনিই এতক্ষণ কাঁদছিলেন।
ব্ৰাহ্মণ প্রশ্ন করলেন-কে মা তুমি?
রমণী মূর্তি বললেন—আমি তোমার সৌভাগ্যলক্ষ্মী। এতদিন তোমার ললাটে আশ্রয় করেছিলাম, তোমায় ছেড়ে যেতে হচ্ছে, তাই কাছি।
