সতীশ বলিল-উষুধ আমার অব্যৰ্থ।
দুর্গা বলিল-আমাকে নিয়ে ওপরে চল, বউ!
উপরে বিছানায় বসিয়া দুর্গা মাথার খোঁপার একটা বেলকুঁড়ির কাটা খুলিয়া আলোর সম্মুখে তাহার অগ্রভাগটা ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিল।
পাতুর বউ বলিল—সাপ তুমি দেখেছ, ঠাকুরঝি? কি সাপ?
দুর্গা বলিল—কালসাপ!
অতি প্রচ্ছন্ন একটি হাসির রেখা তাহার ঠোঁটের কোণে কোণে খেলিয়া গেল। সাপে তাহাকে কামড়ায় নাই। কর্মকারের বাড়ি হইতে ফিরিবার পথেই সে মনে মনে স্থির করিয়া ঘাটে আসিয়া বেলকুঁড়ির কাঁটাটা পায়ে ফুটাইয়া রক্তমুখী দংশনচিহ্নের সৃষ্টি করিয়াছিল। নইলে কি সকলে পালাইবার অবকাশ পাইত, না জমাদার তাহাকে নিষ্কৃতি দিত? মদ খাইয়া জমাদারের যে মূর্তি হয় মনে করিয়া সে শিহরিয়া উঠিল। একটা ভয় ছিল, লোকে তাহার অনিরুদ্ধের বাড়ি যাওয়ার কথাটা প্রকাশ করিয়া ফেলিবে। ভাগ্যক্রমে সে কথাটা কাহারও মনেই হয় নাই।
কিন্তু নজরবন্দি, জামাই-পতি তাহার এ অবস্থার কথা শুনিয়া একবার তাহাকে দেখিতেও আসিল না?
কেহই তো সত্য কথা জানে না, তবু আসিল না? নজরবন্দির না-হয় রাত্রে বাহির হইবার হুকুম নাই। জমাদার হাজির ছিল গ্রামে, ছিরু পাল রহিয়াছে, তাই নজরবন্দির না আসার কারণ আছে। কিন্তু জামাই-পণ্ডিত? জামাই-পণ্ডিত একবার আসিল না কেন?
অভিমানে তাহার চোখে জল আসিল। জগন ডাক্তার আসিয়াছিল, অনিরুদ্ধ আসিয়াছিল, জামাই-পণ্ডিত একবার আসিল না।
পাতুর বউ প্রশ্ন করিল-ঠাকুরঝি, আবার জ্বলছে?
–যা বউ, যা তুই। আবার একটুকুন শুই।
–না। ঘুমুতে তুমি পাবে না আজ।
দুর্গা এবার রাগে অধীর হইয়া বলিলঘুমোব না, ঘুমোব না। আমার মরণ হবে না, আমি মরব না। তুই যাতুই যা এখান থেকে।
পাতুর বউ এবার রাগ করিয়া উঠিয়া গেল। দুর্গা বালিশে মুখ গুঁজিয়া পড়িয়া রহিল।
–কে? নিচে কে ডাকিতেছে?
–-পাতু, দুৰ্গা কেমন আছে রে?
হ্যাঁ, জামাই-পণ্ডিতের গলা। ওই যে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ।
–কেমন আছিস দুর্গাঃ পাতুর সঙ্গে দেবু ঘরে ঢুকিল।
দুর্গা উত্তর দিল না!
–দুৰ্গা!
দুর্গা এবার মুখ তুলিল, বলিল—যদি এতক্ষণে মরে যেতাম জামাই-পণ্ডিত।
দেবু বলিল—আমি খবর নিয়েছি, তুই ভাল আছিল। রাখালছোঁড়া দেখে গিয়ে আমাকে বলেছে।
দুর্গা আবার বালিশে মুখ লুকাইল; রাখালছোঁড়া খবর করিয়া গিয়াছে? মরণ তাহার।
দেবু বলিলবাড়ি গিয়ে বসেছি আর মহাগ্রামের ঠাকুরমশায় হঠাৎ এলেন। কি করি? এই তাকে এগিয়ে দিয়ে আসছি।
—মউগাঁয়ের ঠাকুরমশায়!
দুর্গার বিস্ময়ের আর অবধি রহিল না।
মহাগ্রামের ঠাকুরমশায়! মহামহোপাধ্যায় শিবশেখর ন্যায়রত্ন সাক্ষাৎ দেবতার মত মানুষ। রাজার বাড়িতেও যিনি পদার্পণ করেন না, তিনি?
***
ন্যায়রত্ন দেবুর বাড়িতে আসিয়াছিলেন। ইহাতে দেবুর নিজেরই বিস্ময়ের সীমা ছিল না। নিতান্ত অতর্কিতভাবে যেন তিনি আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। ব্যাপারটা ঘটিয়াছিল এই
যতীনের ওখান হইতে আসিয়া সে ঘরে বসিয়া দুর্গার কথাই ভাবিতেছিল। ভাবিতেছিল দুর্গা বিচিত্ৰ, দুর্গা অদ্ভুত, দুর্গা অতুলনীয়। বিলু সমস্ত শুনিয়া দুর্গার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইয়া দুর্গার কথাই বলিতেছিল। বলিতেছিল–গল্পের সেই লক্ষহীরে বেশ্যার মত–দেখো তুমি, আসছে। জন্মে ওর ভাল ঘরে জন্ম হবে, যাকে কামনা করে মরবে সেই ওর স্বামী হবে।
ঠিক সেই সময়েই বাহির দরজায় কে ডাকিল—মণ্ডলমশায় বাড়ি আছেন?
কণ্ঠস্বর শুনিয়া দেবু ঠাহর করিতে পারিল না—কে? কিন্তু সে কণ্ঠস্বর আশ্চর্য সম্পূর্ণ। সে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিলকে?
বলিয়া সঙ্গে সঙ্গেই বাহির হইয়া আসিল।
আমি। আলো হাতে একটি লোকের পিছন হইতে বক্তা উত্তর দিলেন—আমি বিশ্বনাথের পিতামহ।
দেবু সবিস্ময়ে সম্ভ্ৰমে হতবাক হইয়া গেল। তাহার সর্বাঙ্গে কটা দিয়া উঠিল। বিশ্বনাথের পিতামহ পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় শিবশেখর ন্যায়রত্ব! তাহার শরীর থরথর করিয়া কাঁপিয়া উঠিল। পরক্ষণেই আপনাকে সংযত করিয়া সেই পথের ধুলার উপরেই সে ন্যায়রত্নের পায়ে প্ৰণত হইল।
—তোমাকে আশীর্বাদ করতেই এসেছি। কল্যাণ হোক, ধর্ম যেন তোমাকে কোনোকালে পরিত্যাগ না করেন। জয়স্তু। তোমার জয় হোক।
বলিয়া তাহার মাথার উপর হাত রাখিলেন। বলিলেন ঘরটা খোল তোমার, একটু বসব।
দেবুর এতক্ষণে খেয়াল হইল। সে তাড়াতাড়ি ঘর খুলিয়া দিল; দরজার আড়ালে দাঁড়াইয়া বিলু সব দেখিয়াছিল, শুনিয়াছিল। সে ভিতরের দিক হইতে বাহিরের ঘরে আসিয়া পাতিয়া দিল
তাহার ঘরের সর্বোত্তম আসনখানি। তারপর একটি ঘটি হাতে আসিয়া দাঁড়াইল।
ন্যায়রত্ন বলিলেন–পা ধুইয়ে দেবে মা? প্রয়োজন ছিল না।
বিলু দাঁড়াইয়া রহিল। ন্যায়রত্ন এবার পা বাড়াইয়া দিয়া বলিলেন–দাও।
বিলু পা ধুইয়া দিয়া সযত্বে একখানি পুরাতন রেশমি কাপড় দিয়া পা মুছিয়া দিল।
আসন গ্রহণ করিয়া ন্যায়রত্ন বলিলেন তোমার ছেলেকে আন মণ্ডল। তাকে আমি আশীর্বাদ করব।
বিস্ময়ে যেন দেবুর চারিপাশে এক মোহজাল বিস্তার করিয়াছিল; কোন্ অজ্ঞাত পরমভাগ্যে তাহার কুটিরে এই রাত্রির অন্ধকারে অকস্মাৎ নামিয়া আসিয়াছেন স্বর্গের দেবতা; পরম কল্যাণের আশীর্বাদ-সম্ভার লইয়া আসিয়াছেন তাহার ঘর ভরিয়া দিতে!
বিলু ঘুমন্ত শিশুকে আনিয়া ন্যায়রত্নের পায়ের তলায় নামাইয়া দিল।
ন্যায়রত্ন শিশুটির দিকে চাহিয়া দেখিয়া সস্নেহে বলিলেন–বিশ্বনাথের খোকা এর চেয়ে ছোট। এই তো সবে অন্নপ্রাশন হল, তার বয়স আট মাস।
