ব্ৰাহ্মণ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—একটা প্রশ্ন করব, মা? আমার অপরাধ কি হল?
—তুমি আজ অলক্ষ্মীকে আশ্রয় দিয়েছ। ওই মেয়েটি অলক্ষ্মী। অলক্ষ্মী এবং আমি তো একসঙ্গে বাস করতে পারি না।
ব্রাহ্মণ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। সৌভাগ্যলক্ষ্মীকে প্রণাম করলেন, কিন্তু কোনো কথা বললেন না। তিনি চলে গেলেন।
পরদিন সকালে দেখলেন বৃক্ষের ফল খসে গেছে, ফুল শুকিয়ে গেছে। সরোবর হয়েছে। ছিদ্ৰময়ী, জল ছিদ্রপথে অদৃশ্য হয়েছে। ভূমি হয়েছে শস্যহীনা, গাভী হয়েছে দুগ্ধহীনা। গৃহ হয়েছে শ্ৰীহীন।
রাত্রে আবার সেই রকম কান্না। আবার দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন এক দিব্যাঙ্গনা। তিনি বললেন—আমি তোমার যশোলক্ষ্মী। অলক্ষ্মীকে তুমি আশ্রয় দিয়েছ, ভাগ্যলক্ষ্মী তোমাকে পরিত্যাগ করেছেন, সুতরাং আমিও তোমাকে পরিত্যাগ করে যাচ্ছি।
ব্ৰাহ্মণ নীরবে তাকে প্রণাম করলেন। তিনিও চলে গেলেন।
পরদিন তিনি শুনলেন-লোকে তার অপযশ ঘোষণা করছে—ব্রাহ্মণ লম্পট, ওই যে। মেয়েটিকে আশ্রয় দিয়েছে—তার দিকে তার কুদৃষ্টি পড়েছে। তিনি প্রতিবাদ করলেন না।
সেদিন রাত্রে আর এক নারীমূর্তি তাঁর দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি তার কুললক্ষ্মী। বললেন—অলক্ষ্মী এসেছে, ভাগ্যলক্ষ্মী চলে গেছেন, যশোলক্ষ্মী চলে গেছেন, লোকে তোমার কলঙ্ক রটনা করছে; আমি কুললক্ষ্মী, আর কেমন করে থাকি তোমাকে আশ্রয় করে? তিনিও চলে। গেলেন।
পরদিন ব্রাহ্মণের দেহ থেকে বেরিয়ে এলেন আর এক মূর্তি। নারী নয়—পুরুষ মূর্তি। দিব্য ভীমকান্তি, জ্যোতির্ময় পুরুষ।
ব্ৰাহ্মণ জিজ্ঞাসা করলেন-আপনি কে?
দিব্যকান্তি পুরুষ বললেন আমি ধর্ম।
–ধর্ম? আপনি আমাকে পরিত্যাগ করছেন কোন অপরাধে?
–অলক্ষ্মীকে আশ্রয় দিয়েছ তুমি।
–সে কি আমি অধর্ম করেছি?
ধর্ম চিন্তা করে বললেন–না।
তবে?
–ভাগ্যলক্ষ্মী তোমায় ত্যাগ করেছেন।
—আশ্রয়প্রার্থী বিপদগ্রস্তকে আশ্রয় দেওয়া যখন অধর্ম নয়, তখন আমার অধর্মের জন্য তিনি আমায় পরিত্যাগ করেন নি। পরিত্যাগ করেছেন অলক্ষ্মীর সংস্পর্শ সইতে না পেরে।
–হ্যাঁ।
—ভাগ্যলক্ষ্মীকে অনুসরণ করেছেন যশোলক্ষ্মী, তার পেছনে গেছেন কুললক্ষ্মী, আমি প্রতিবাদ করি নি। কারণ ওই তাদের পন্থা। একের পিছনে এক আসেন, আবার যাবার সময় একের পিছনে অন্যে যান। কিন্তু আপনি আমাকে পরিত্যাগ করবেন কোন অপরাধে?
ধর্ম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ব্রাহ্মণ বললেন-আপনাকে আমি যেতে দিতে পারি না; কারণ আপনাকে অবলম্বন করেই আমি বেঁচে রয়েছি। আপনাকে আমি যেতে না বললে আপনার যাবার অধিকার নাই। আমিই আপনার অস্তিত্ব।
ধর্ম স্তম্ভিত হয়ে গেলেন, নিজের ভ্রম বুঝলেন। তারপর ব্রাহ্মণকে বললেন—তথাস্তু। তোমার জয় হোক। বলে তিনি আবার ব্রাহ্মণের দেহে প্রবিষ্ট হলেন।
ন্যায়রত্নের গল্প বলার ভঙ্গি অতি চমৎকার। প্রথম জীবনে তিনি নিয়মিত ভাগবত কথকতা করিতেন। তাঁহার বর্ণনায়, স্ব-মাধুর্যে, ভঙ্গিতে একটি মোহজালের সৃষ্টি করিয়াছিল। তিনি স্তব্ধ হইলেন।
কিছুক্ষণ পর যতীন বলিল–তারপর?
–তারপর? ন্যায়রত্ন হাসিলেন, বলিলেন—
তারপর সংক্ষিপ্ত কথা। ধর্মের প্রভাবে সেইদিন রাত্রে উঠিল আবার এক ক্রন্দনধ্বনি। ব্ৰাহ্মণ দেখলেন সেই অলক্ষ্মী মেয়েটি এসে বলছে—আমি যাচ্ছি। আমি চললাম।
ব্রাহ্মণ বললেন—তুমি স্বেচ্ছায় বিদায় চাও?
–স্বেচ্ছায়। স্বেচ্ছায় যাচ্ছি। সে মিলিয়ে গেল।
সেই দিন রাত্রেই ফিরলেন ভাগ্যলক্ষ্মী, ফিরলেন তারপর যশোলক্ষ্মী, তারপর কুললক্ষ্মী।
যতীন বলিল—চমৎকার কথা। লক্ষ্মীই দেয় যশসে-ই পবিত্র করে কুল। তাই তাকে নিয়ে এত কাড়াকাড়ি। লক্ষ্মীই সব।
—না, ন্যায়রত্ন বলিলেন না, ধর্ম। মণ্ডল, সেই ধর্মকে তুমি অবলম্বন করেছ বলেই আজ। আশা হচ্ছে। সেই আনন্দেই আমি ছুটে এসেছি। আচ্ছা, আমি চলি আজ, মণ্ডল।
ঠিক এই সময়ে সংবাদ আসিল দুর্গাকে সাপে কামড়াইয়াছে। রাখালছোঁড়াটা বলিল–ভাল আছে। উঠে বসেছে।
দেবু ন্যায়রত্নকে আগাইয়া দিতে বাহির হইল। পথে যতীন বিদায় লইয়া আপন দাওয়ায় উঠিয়া তক্তপোশের উপর স্তব্ধ হইয়া বসিল।
২৪. যতীনের মনের অবস্থা বিচিত্র
যতীনের মনের অবস্থা বিচিত্র। পল্লীগ্রামের কোন্ নিভৃত কোণে বাস করে ওই বৃদ্ধতার চারিপাশে এই ধ্বংসোনুখ পারিপার্শ্বিক অজ্ঞান-অশিক্ষা-দারিদ্র্য, হীনতায় জীৰ্ণ। কঠিন জীবন-সংগ্রাম এখানে নিপুণ সরীসৃপের সুকঠিন বেষ্টনীর মত শ্বাসরোধ করিয়া ক্রমশ চাপিয়া ধরিতেছে। ইহারই মধ্যে কেমন করিয়া প্রশান্ত অবিচলিতচিত্ত সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ স্বচ্ছ ঊর্ধ্বগ দৃষ্টি মেলিয়া পরমানন্দে বসিয়া আছেন! অসীম জ্ঞানভাণ্ডার লইয়া বসিয়া আছেন লবণাক্ত সমুদ্রতলে মুক্তাগর্ভ শুক্তির মত।
এই মুহূর্তে ইহা এক পরমাশ্চর্যের মত মনে হইল।
দণ্ডে দণ্ডে প্রহরের পর প্রহর অতিক্ৰম করিয়া রাত্রি ঘন গাঢ় হইয়া আসিতেছিল। দ্বিতীয় প্রহরের শেয়াল, পেঁচা ডাকিয়া গিয়াছে। কোনো একটা গাছে বসিয়া একটা পেঁচা এখনও মধ্যে মধ্যে ডাকিতেছে। এ ডাক অন্য রকমের ডাক প্রহর ঘোষণার ডাকের সহিত কোনো মিল নাই। প্রহরের ডাকের মধ্যে স্পষ্ট একটি ঘোষণার সুর আছে। গাছের কোটরের মধ্যে থাকিয়া অপরিণত কণ্ঠে চাপা শিসের শব্দের মত করিয়া অবিরাম একঘেয়ে ডাকিয়া চলিয়াছে উহাদের শাবকের দল। বনেজঙ্গলে, পথেঘাটে, ঘরে, চারিদিকে, আশপাশে অবিরাম ধ্বনি উঠিতেছে–অসংখ্য কোটি পতঙ্গের সাড়ার। অন্ধকার শূন্যপথে কালো ডানা সশব্দে আস্ফালন করিয়া উড়িয়া চলিয়াছে বাদুড়ের দল—একটার পর একটা, তারপর একসঙ্গে তিনটা, আবার একটা।
