অনিরুদ্ধ দ্রুত বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিল। পদ্ম? এমন করিয়া সে কোথা হইতে ছুটিয়া আসিল? কোথায় গিয়াছিল সে?
–কর্মকার!
–কে?
–দুর্গা। দুর্গার কণ্ঠস্বর। ক্রোধে বিরক্তিতে অধীর হইয়া অনিরুদ্ধ দুর্গার সম্মুখীন হইল—কি?
দুর্গা সংক্ষেপে শ্ৰীহরির বাড়িতে জমাদারের আগমন সংবাদটা দিয়া যেমন আসিয়াছিল তেমনি দ্রুতপদে আভরণের মৃদু সাড়া তুলিয়া বিলীয়মান রহস্যের মত চকিতে মিলাইয়া গেল। ছুটিয়া সে আবার সেই পুকুরপাড়ের জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করিল।
ঘাটে হাত-পা ধুইয়া যখন শ্রীহরির ঘরে সে প্রবেশ করিল—তখন বোধহয় ঘরে-আগুন-দেওয়ার মামলা মিটিয়া গিয়াছে। জমাদারের চোখে প্ৰসন্ন দৃষ্টি। জমাদার দুর্গার দিকে চাহিয়া বলিল–হাঁপাচ্ছিস কেন?
আতঙ্কে চোখ বিস্ফারিত করিয়া দুর্গা বলিল—সাপ!
–সাপ! কোথায়?
–খিড়কির ঘাটে। এই প্রকাণ্ড বড়! চন্দ্রবোড়া। এই দেখুন জমাদারবাবু! বলিয়া সে ডান পা-খানি আলোর সম্মুখে ধরিল। একটা ক্ষতস্থান হইতে কাঁচা রক্তের ধারা গড়াইয়া পড়িতেছিল।
জমাদার এবং শ্রীহরি উভয়েই আতঙ্কিত হইয়া উঠিল। কি সৰ্বনাশ! জমাদার বলিলবাধ, বাঁধ! দড়ি, দড়ি! পাল, দড়ি নিয়ে এস!
শ্ৰীহরি দড়ির জন্য ভিতরে যাইতে যাইতে বিরক্তিভরে বলিল—কি বিপদ! কোথা থেকে বাধা এসে জুটল দেখ দেখি! দড়ি আনিয়া ভূপালের হাতে দিয়া শ্ৰীহরি বলিলবাধ। জমাদারবাবু, আসুন চট করে ওদিকের কাজটা সেরে আসি।
দুর্গা বিবৰ্ণমুখে করুণ দৃষ্টিতে জমাদারের দিকে চাহিয়া বলিল—কি হবে জমাদারবাবু?–চোখ তাহার জলে ছলছল করিয়া উঠিল।
জমাদার আশ্বাস দিয়া বলিল—কোনো ভয় নাই। ভূপালের হাত হইতে দড়ি লইয়া সে নিজেই বাঁধিতে বসিল; ভূপালকে বলিল—এক দৌড়ে থানায় গিয়ে লেক্সিন নিয়ে আয়। আর ওঝা কে আছে ডাক—এক্ষুনি।
দুর্গা বলিল—আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও, জমাদারবাবু। ওগো আমি মায়ের কোলে মরব গো।
শ্ৰীহরি বলিল—সেই ভাল। ভূপাল ওকে বাড়িতে দিয়ে আসুক। দী ওঝা আর মিতে গড়াঞীকে ডাক। ছুটে যাবি আর আসবি। চলুন জমাদারবাবু।
অনিরুদ্ধের দাওয়ায় তক্তপোশের উপর যতীন একা বসিয়া ছিল।
জমাদারকে সংবর্ধনা করিয়া বলিল—ছোট দারোগাবাবু! এত রাত্রে?
জমাদার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল গিয়েছিলাম অন্য গ্রামে। পথে ভাবলাম আপনার মজলিসটা দেখে যাই। কিন্তু কেউ কোথাও নেই যে!
যতীন হাসিয়া বলিল-আপনি এসেছেন—ঘোষমশায় এসেছেন, আবার বসুক মজলিস। ওরে উচ্চিংড়ে, চায়ের জল চড়িয়ে দে তো!
***
ভূপাল দুর্গাকে বাড়ি পৌঁছাইয়া দিয়া ঔষধ ও ওঝার জন্য চলিয়া গেল। দুর্গার মা হাউমাউ আরম্ভ করিয়া দিল। তাহার চিৎকারে পাড়ার লোক আসিয়া জুটিয়া গেল। পাতুর বৌ সকরুণ মমতায় বারবার প্রশ্ন করিলকি সাপ ঠাকুরঝি? সাপ দেখেছ?
দুর্গা অত্যন্ত কাতর স্বরে বলিল–ওগো তোমরা ভিড় ছাড় গো! সে ছটফট করিতে আরম্ভ করিল। এ-পাড়ার মাতব্বর সতীশ, সে সত্যই মাতব্বর লোক। সে অনেক ঔষধপাতির খবর রাখে। সাপের ঔষধও সে দুই-চারিটা জানে। সতীশ একরূপ ছুটিয়াই বাহির হইয়া গেল–ঔষধের সন্ধানে। কিছুকাল পর ফিরিয়া আসিয়া একটা শিকড় দিয়া বলিল—চিবিয়ে দেখ দেখি–তেতো লাগছে না মিষ্টি লাগছে?
দুৰ্গা সেটাকে মুখে দিয়া পরক্ষণেই ফেলিয়া দিল—থু-থু-থু।
সতীশ আশ্বস্ত হইয়া বলিল—তেতো যখন লেগেছে তখন ভয় নাই।
দুৰ্গা ধুলায় গড়াগড়ি দিয়া বলিল—মিষ্টিতে গা বমি-বমি করছে গো। বাবা গোওই কে আসছে—ওঝা নাকি গো!
ওঝা নয়। জগন ডাক্তার, হরেন ঘোষাল, অনিরুদ্ধ এবং আর কয়েকজন।
হরেন ঘোষাল চিৎকার করিয়া উঠিল—হঠ যাও, হঠ যাও। সব হঠ যাও।
জগন তাড়াতাড়ি বসিয়া দুর্গার পাখানা টানিয়া লইল–হুঁ! স্পষ্ট দাঁতের দাগ।
পাতুর চোখ দিয়া জল পড়িতেছিল; সে বলিল—কি হবে ডাক্তারবাবু?
পকেট হইতে ছুরি বাহির করিয়া ডাক্তার বলিল-ওষুধ দিচ্ছি, দাঁড়া। অনিরুদ্ধ, এই পারমাঙ্গানেটের দানাগুলো ধর দেখি। আমি চিরে দি–তুই দিয়ে দে।
দুর্গা পাখানা টানিয়া লইল–না, না গো।
—না কি?
–না না না। মড়ার উপর আর খাড়ার ঘা দিয়ো না বাপু।
–ঘোষাল! ধর তো পাখানা।
ঘোষাল চমকিয়া উঠিল। সে এই অবসরে পাতুর বউয়ের সঙ্গে কটাক্ষ বিনিময় করিয়া মৃদু মৃদু হাসিতেছিল।
দুর্গা আবার দৃঢ়স্বরে বলিল–না না না।
জগন বিরক্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল—তবে মর।
দুর্গা উল্টাইয়া উপুড় হইয়া শুইয়া বোধ করি নীরব কান্নায় সারা হইয়া গেল। তাহার সমস্ত দেহটাই কান্নার আবেগে থরথর করিয়া কাঁপিতেছিল।
অনিরুদ্ধের চোখেও জল আসিতেছিল—কোনোমতে আত্মসংবরণ করিয়া সে বলিল—দুগ্গা! দুগ্গা! ডাক্তার যা বলছে শোন!
দুর্গার কম্পমান দেহখানি অস্বীকারের ভঙ্গিতে নড়িয়া উঠিল।
জগন এবার রাগ করিয়া চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধ চলিয়া গেল ওঝার সন্ধানে। কুসুমপুরে একজন ভাল মুসলমান ওঝা আছে। হরেন একটি বিড়ি ধরাইল।
অনতিদূরে একটি আলো আসিয়া দাঁড়াইল। আলোর পিছনে জমাদার ও শ্ৰীহরি। ঘোষালও এইবার সরিয়া পড়িল।
দারোগা সতীশকে প্রশ্ন করিল—কেমন আছে?
–আজ্ঞে ভাল লয়। একেবারে ছটফট করছে।
–গড়াঞী আসে নাই?
–আজ্ঞে না।
—ঘোষ, আপনি আর একটা লোক পাঠিয়ে দিন। আমি থানা থেকে লেক্সিন পাঠিয়ে দিচ্ছি। আসুন।
দারোগা ও শ্ৰীহরি চলিয়া গেল।
দুর্গা আরও কিছুক্ষণ ছটফট করিয়া খানিকটা সুস্থ হইল; বলিল—সতীশ দাদা, তোমার ওষুধ ভাল। ভাল লাগছে আমার। আরও কিছুক্ষণ পর সে উঠিয়া বসিল।
