দুর্গা হঠাৎ একটু চকিত হইয়া উঠিল। তাহার মনে পড়িয়া গেল নজরবন্দিকে, জামাইপণ্ডিতকে। কেন সে তাহা জানে না। কিন্তু তাহাদের দুজনকেই মনে হইল। সে তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিয়া পথে বাহির হইয়া পড়িল। শুক্ল-ষষ্ঠীর চাঁদ তখন অস্ত গিয়াছে। অন্ধকারে আত্মগোপন করিয়া পথের পাশের জঙ্গলের মধ্য দিয়া সে তাহাদের অনুসরণ করিল।
চণ্ডীমণ্ডপ আজ অন্ধকার। ছিরু পাল আজ চণ্ডীমণ্ডপে বসে নাই। পালের পাল নয়, আজকাল ঘোষমশায়! ঘোষমশায়ের খামারবাড়ির বৈঠকখানাঘরে আলো জ্বলিতেছে। ভূপালের আলো গিয়া ওইখানেই প্রবেশ করিল। নিমন্ত্রণই বটে। চণ্ডীমণ্ডপ দেবস্থল, সেখানে এ আসর চলে না। কিন্তু শ্রীহরি আজকাল নাকি কথাটা মনে পড়িতেই দুৰ্গা না হাসিয়া পারিল না।
এক-একটা গুরু রাত্রে দড়ি ছিঁড়িয়া মাঠে যাইয়া ফসল খাইয়া ফেরে। যে গরু এ আস্বাদ একবার পাইয়াছে সে আর ভুলিতে পারে না। শিকল দিয়া বাধিলেও সে খুঁটা উপড়াইয়া রাত্রে মাঠে যায়। ছিরু পাল নাকি সাধু হইয়াছে। তাই সে হাসিল। কিন্তু নূতন নারীটি কে? একজন কেহ আছেই। কিন্তু সে কে? দুর্গা কৌতুক সংবরণ করিতে পারিল না। শ্ৰীহরির বাড়ির গোপনতম পথের সন্ধান পর্যন্ত তাহার সুবিদিত, কত রাত্রে সে আসিয়াছে। চুড়িগুলি হাতের উপরে তুলিয়া নিঃশব্দে আসিয়া সে শ্ৰীহরির ঘরের পিছনে দাঁড়াইল। ঘরের কথাবার্তা স্পষ্ট শোনা যাইতেছিল।
সে কান পাতিল।
জমাদার বলিতেছিল নিৰ্ঘাত দু বছর ঠুকে দোব।
শ্ৰীহরি বলিল—চলুন তা হলে—জোর কমিটি বসেছে। জগন ডাক্তার, শালা হরেন ঘোষাল, গিরশে ছুতোর–অনে কামার তো আছেই। দেবু আর নজরবন্দিকে সব ঘিরে বসেছে। উঠুন তা
হলে।
জমাদার বলিলচাটা নিয়ে এস জলদি! চা খাওয়া হয় নি আমার।
শ্ৰীহরি খবর পাঠাইয়াছিল। নজরবন্দির বাড়িতে প্রজা-সমিতির কমিটি বসিয়াছে। জমাদার সাহেবের কাছে সেলাম পাঠানো হইয়াছিল, সেলামির ইঙ্গিতও ছিল। জমাদারের নিজেরও একটা প্রত্যাশা আছে। ডেটিনিউটিকে হাতেনাতে ধরিয়া ষড়যন্ত্র বা আইনভঙ্গ—যে কোনো মামলায় ফেলিতে পারিলে চাকরিতে পদোন্নতি বা পুরস্কার নিদেনপক্ষে বিভাগীয় একটা সদয়-মন্তব্য লাভ অনিবার্য। সেলামিটা ফাউ। সেলামিটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়।
দুর্গা শিহরিয়া উঠিল। নিঃশব্দে দ্রুতপদে সে ঘরের পিছন হইতে চলিয়া আসিয়া পথের উপর দাঁড়াইয়া কয়েক মুহূর্ত ভাবিয়া লইল। তাহার পর বেশ করিয়া চুড়ি বাজাইয়া ঝঙ্কার তুলিয়া চলিতে আরম্ভ করিল। ঠিক পরমুহূর্তে প্রশ্ন ভাসিয়া আসিল—কে? কে যায়?
–আমি।
–কে আমি?
–আমি বায়েনদের দুৰ্গা দাসী।
–দুৰ্গা! আরে আরে–শোন্ শোন্!
–না।
ভূপাল আসিয়া এবার বলিল–জমাদারবাবু ডাকছে!
একমুখ হাসি লইয়া দুর্গা ভিতরে আসিয়া বলিল-আমরণ আমার! তাই বলি চেনা চেনা গলা মনে হচ্ছে—তবু চিনতে পারছি। জমাদারবাবু! কি ভাগ্যি আমার! কার মুখ দেখে উঠেছিলাম আমি।
জমাদার হাসিয়া বলিলব্যাপার কি বল দেখি? আজকাল নাকি পিরীতে পড়েছিল? প্রথম অনে কামার, তারপর শুনছি নজরবন্দিবাবু!
দুর্গা হাসিয়া বলিলবলছে তো আপনার মিতে পালমশাই!
পরক্ষণেই সে বলিল-আজকাল আবার গোমস্তামশাই বলতে হবে বুঝি? ও গোমস্তামশাই মিছে বলেছে, মনের রাগে বলেছে।
বাধা দিয়া জমাদার বলিল—মনের রাগে? তা রাগ তো হতেই পারে। পুরনো বন্ধুলোককে ছাড়লি কেন তুই?
দুর্গা বলিল মুচিপাড়াকে-পাড়া আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিলে আপনার মিতে। ঘরে টিন দেবার জন্য টাকা চাইলাম, তা আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিলে আপনার বন্ধুনোক। সত্যিমিথ্যে শুধোন আপনি! বলুক ও ঘরে আগুন দিয়েছে কি না?
শ্ৰীহরির মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল। জমাদার তার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল-দুর্গা কি বলছে, পালমশাই! জমাদারের কণ্ঠস্বর মুহূর্তে পাল্টাইয়া গিয়াছে।
দুর্গা লক্ষ্য করিয়া বুঝিল একটা বুঝাপড়ার সময় আসিয়াছে। সে বলিলঘাট থেকে আসি জমাদারবাবু! জমাদার দুর্গার কথার কোনো জবাব দিল না। সে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া ছিল শ্রীহরির দিকে। সে দৃষ্টির অর্থ দুর্গা খুব ভাল করিয়া জানে। জরিমানা আদায়ের পূর্বরাগ। এ পর্বটা শেষ হইতে বেশ কিছুক্ষণ লাগিবে। ঘাটে যাইবার জন্য বাহির হইয়া, তখনই ফিরিয়া দুর্গা লীলায়িত ভঙ্গিতে দেহে হিল্লোল তুলিয়া বলিল-আজ কিন্তু মাল খাওয়াতে হবে দারোগাবাবু! পাকী মাল! বলিয়াই সে বাহির হইয়া গেল ঘাটের দিকে।
শ্ৰীহরির খিড়কির পুকুরের পাড় ঘন জঙ্গলে ভরা। বাঁশের ঝাড়, তেঁতুল, শিরীষ প্রভৃতি গাছ। এমনভাবে জন্মিয়াছে যে দিনেও কখনও রৌদ্র প্রবেশ করে না। নিচেটায় জন্মিয়াছে ঘন কাঁটাবন। চারিদিকে উইঢ়িবি। ওই উইগুলির ভিতর নাকি বড় বড় সাপ বাসা বাঁধিয়াছে। শ্ৰীহরির। খিড়কির পুকুর সাপের জন্য বিখ্যাত। বিশেষ চন্দ্রবোড়া সাপের জন্য। সন্ধ্যার পর হইতেই চন্দ্রবোড়ার শিস শোনা যায়। পুকুরঘাটে আসিয়া দুর্গা জলে নামিল না, সে প্রবেশ করিল ওই জঙ্গলে। নিশাচরীর মত নিঃশব্দে নিৰ্ভয় পদক্ষেপে দ্রুতগতিতে সে জঙ্গলটা অতিক্ৰম করিয়া আসিয়া নামিল এপাশের পথে। এখান হইতে অনিরুদ্ধের বাড়ি কাছেই। ওই মজলিসের আলো দেখা যাইতেছে। ছুটিয়া আসিয়া দুর্গা চকিতে ছায়াছবির মত অনিরুদ্ধের খিড়কির দরজা দিয়া বাড়ির ভিতর ঢুকিয়া গেল।
প্রজা-সমিতির সভাপতি পরিবর্তনের কাজ তখন শেষ হইয়াছে। অনিরুদ্ধ চা পরিবেশন করিতেছিল, জগন ডাক্তার ভাবিতেছিল—বিদায়ী সভাপতি হিসাবে সে একটি জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিবে। দেবু ভাবিতেছিল নূতন কর্মভারের কথা। সহসা একটি মূর্তি অন্ধকারের মধ্যে চকিতে অনিরুদ্ধের খিড়কির দরজার দিকে চলিয়া যাইতে সকলে চমকিয়া উঠিল। আপাদমস্তক সাদা কাপড়ে ঢাকা, দ্রুত পদধ্বনির সঙ্গে আভরণের ঠুনঠান শব্দ!—কে? কে? কে গেল?
