—হ্যাঁ নেবে। আবার যখন হবে তোমার, তুমি গড়িয়ে দেবে।
–যদি খালাস না হয়, আর গড়াতে না পারি!
–পরবে না খোকা।
দেবু আর দ্বিধা করিল না। বালা দুই গাছা লইয়া জামাটা গায়ে দিয়া দ্রুতদে বাহির হইয়া গেল।
গরুগুলিকে খালাস করিয়া ফিরিল সে সন্ধ্যার সময়। অর্ধেকদিন রৌদ্রে ঘুরিয়া জামাকাপড় ঘামে ভিজিয়া গিয়াছে। তাহার ওপর একপাল গরুর পায়ের ধুলায় সর্বাঙ্গ কাদায় আচ্ছন্ন। যতীনের দুয়ারে তখন বেশ একটা মজলিস বসিয়া গিয়াছে।
তাহাকে দেখিয়া সকলে প্ৰায় একসঙ্গে প্রশ্ন করিয়া উঠিল—কি হল দেবু?
—ছাড়ানো হয়েছে গরু।
দেবু তৃপ্তির হাসি হাসিল।
–কত লাগল?
সে কথার উত্তর না দিয়া দেবু বলিল—যতীনবাবু!
—বলুন?
–একটা কথা বলব আপনাকে।
–দাঁড়ান। আপনাকে বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। আগে একটু চা করি আপনার জন্য।
–না। এখনই বাড়ি যাব আমি। কথাটা বলে যাই।
যতীন দেবুকে লইয়া ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল।
দেবু মৃদু অথচ দৃঢ় স্বরে বলিল–প্রজা-সমিতির ভার আমিই নেব।
—দাঁড়ান, চা খেয়ে তবে যেতে পাবেন।
সে বাড়ির ভিতরে গিয়া ডাকিল–মা-মণি! মা-মণি!
কেহ সাড়া দিল না।
পদ্ম বাড়িতে নাই, সে গিয়াছে উচ্চিংড়ের সন্ধানে। উচ্চিংড়ে এখনও ফেরে নাই, তাহাকে খুঁজিতে বাহির হইয়াছে।
যতীন নিজেই চায়ের জল চড়াইয়া দিল।
২৩. হরেন ঘোষালের উত্তেজনা
হরেন ঘোষালের উত্তেজনা—সে এক ভীষণ ব্যাপার! সে গোটা গ্রামটার পথে পথে ঘোষণা করিয়া দিল–প্রজা-সমিতির মিটিং! প্রজা-সমিতির মিটিং! স্থানটার উল্লেখ করিতে সে ভুলিয়াই গেল। ঠিক ছিল মিটিং হইবে ওই বাউরিপাড়ার ধর্মরাজতলায়। কিন্তু ঘোষাল সে-কথা উল্লেখ করিতে ভুলিয়া যাওয়ায় লোকজন আসিয়া জমিল নজরবন্দিবাবুর বাসার সম্মুখে। কারণ প্রজা-সমিতির সকল উৎসই যে ওখানেই।
হরেন বলিল—তবে এইখানেই হোক। আবার এখান থেকে ওখানে। তা ছাড়া এখানে চা করা যাবে দরকার হলে। চেয়ার-টেবিল রয়েছে এখানে। এখানেই হোক।
সঙ্গে সঙ্গে সে যতীনের টেবিল-চেয়ার টানিয়া বাহিরে আনিয়া রীতিমত সভার আসর সাজাইয়া ফেলিল। ইতিমধ্যে দুই গাছা মালাও সে গাঁথিয়া ফেলিয়াছে। ওটাতে তাহার ভুল হয় না।
লোকজন অনেক জমিয়াছে। বাউরিবায়েনরা প্রায় সকলেই আসিয়াছে। গ্রামের চাষীরাও আসিয়াছে। বিশেষ করিয়া আজিকার গরু খোঁয়াড়ে দেওয়ার জন্য সকলেই বেশ একটু উত্তেজিতও হইয়াছে। ময়ূরাক্ষীর বন্যারোধী বধ জমিদারের খাসখতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত হইলেও ওই বাঁধ তৈয়ারি করিয়াছে তো প্রজারাই। সেখানে চিরকাল লোক গরু চরাইয়া থাকে। গ্রামের পতিত জমিও আবহমানকাল গোচারণভূমি হিসাবে লোকে ব্যবহার করিয়া আসিতেছে। সেখানে গোচারণ করিবার অধিকার নাই—এই কথায় সকলকেই উত্তেজিত করিয়াছে। আজ ওই অন্যায় আইন বাউরিবায়েনদের পক্ষে প্রযুক্ত হইল-কাল যে সকলের পক্ষেই তা প্রযোজ্য হইবে না তাহাকে বলিল? বাউরিরা অবশ্য এত বোঝে নাই। তাহারা শুনিয়াছে—পণ্ডিতমশায় কমিটির কর্তা হইবেন। তাই শুনিয়াই তাহারা সকৃতজ্ঞচিত্তে আসিয়াছে। নিৰ্ভয়ে আসিয়াছে।
তাহাদের পাড়ায় আজ ঘরে ঘরে পণ্ডিতের কথা। দুর্গার মা পর্যন্ত মুক্তকণ্ঠে আশীর্বাদ করিতেছে। মাথার চুলের মত পেরমাই হবে, সোনার দোতকলম হবে, বেটার কোলে বেটা হবে, লক্ষ্মী উথলে উঠবে। সোনার মানুষ, পণ্ডিত-জামাই আমার সোনার মানুষ!
সন্ধ্যার সময় আপনার ঘরে বালিশে বুক রাখিয়া জানালার বাহিরের দিকে চাহিয়া দুর্গাও ওই কথা ভাবিতেছিল—সোনার মানুষ, পণ্ডিত সোনার মানুষ, বিলু-দিদি তাহার ভাগ্যবতী! আজ ওই সুকুমার নজরবন্দিবাবুটিও পণ্ডিতের তুলনায় হীনপ্ৰভ হইয়া গিয়াছে। তাহার ইচ্ছা—একবার মজলিসে যায়, দশের মধ্যে পণ্ডিত উঁচু করিয়া বসিয়া আছে, সেই দৃশ্যটি আড়ালে দাঁড়াইয়া থাকিয়া একবার দেখিয়া আসে। আবার ভাবিলনা, মজলিস ভাঙক, সে বিলু-দিদির বাড়ি যাইবে, গিয়া পণ্ডিত-জামাইয়ের সঙ্গে দুইটা রসিকতা করিয়া উত্তরে কয়েকটা ধমক খাইয়া আসিবে। সে ভাবিতেছিল—কি বলিয়া কথা আরম্ভ করিবে।
আবার ওদিকে নজরবন্দিকে বলিবার মত অনেক কথা তাহার মনে ঘুরিতেছে।
—মউ-ফুলের মধু কেমন লাগল বাবু?
আপন মনে দুর্গা হাসিল। বাবুর চোখের কোণে লালচে আমেজ সে স্পষ্ট দেখিয়াছে।–কিন্তু পণ্ডিতকে সে কি বলিবে?
দুর্গার কোঠার সম্মুখে অমরকুণ্ডার মাঠ, তারপর নদীর বাঁধ। বাঁধের উপর দিয়া একটা আলো আসিতেছে। আলোটা মাঠে নামিল।
পণ্ডিত বড় গম্ভীর লোক। সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। তারপর সহসা সে আনন্দে চঞ্চল হইয়া উঠিল। কথা সে খুঁজিয়া পাইয়াছে।
—জামাই-পণ্ডিত, তুমি ভাই আবার পাঠশালা খোল!
–কে পড়বে?
–কেউ না পড়ে আমি পড়ব। নেকাপড়া শিখব আমি–
ওঃ, আলোটা তাহাদের গ্রামেই আসিতেছে। হাতে ঝুলানো লণ্ঠনের আলোয় চলন্ত মানুষের গতিশীল পা দুখানা বেশ দেখা যাইতেছে। কে? কাহারা? এক জন লণ্ঠন হাতে আসিতেছে, পিছনে এক জন—এক জন নয়, দুই জন; বায়েনপাড়ার প্রান্ত দিয়াই ঢুকিবার সোজা পথ? সেই পথে আগন্তুকেরা কাছে আসিয়া পড়িল।
দুর্গা চমকিয়া উঠিল। এ কি! এ যে আলো হাতে ভূপাল থানাদার, তাহার পিছনে ও যে জমাদারবাবু! জমাদারের পিছনে সেই হিন্দুস্থানি সিপাহিটা! ছিরু পালের বাড়িতে চলিয়াছে নিশ্চয়।
ছিরু পালের নিমন্ত্রণে রাত্রে জমাদারের আগমন এমন কিছু নূতন কথা নয়। পূর্বে এমন আসরে দুর্গারও নিয়মিত নিমন্ত্রণ হইত। কিন্তু পালের নিমন্ত্রণে জমাদারের সঙ্গে তো সিপাহি থাকার কথা নয়! জমাদারবাবুর আজ এমন পোশাকই বা কেন? সে যে একেবারে খাঁটি জমাদারের পোশাক অ্যাঁটিয়া আসরে আসিতেছে! সিপাহির মাথায় পাগড়ি, তা ছাড়া শ্রীহরির নিমন্ত্রণের আসর তো প্রথম রাত্রে বসে না! সে আসর বসে মধ্যরাত্রে বারটা নাগাদ।
