চণ্ডীমণ্ডপে অর্ধশায়িত অবস্থায় গুড়গুড়ি টানিতে টানিতে সে অলস দৃষ্টিতে গ্রাম-হিতৈষীদের ব্যৰ্থ বিক্রম লক্ষ্য করিতেছিল। কিন্তু এত শীঘ্ৰ খবরটা আনিল কে?
খবরটা আনিয়াছিল তারাচরণ নাপিত। কালু শেখ গরুগুলাকে আটক করিলে রাখাল ছেলেরা মিনতি করিয়া কাঁদিয়া কালু শেখের পায়ে গড়াইয়া পড়িল।ওগো শ্যাখজী গো! তোমার পায়ে পড়ি মশাই, ছেড়ে দ্যান আজকের মতন ছেড়ে দান।
শেখের ক্রোধ হয় নাই, ক্রোধ হইবার হেতুও ছিল না, তবু ঘোড়াগুলোর ওই হাতে-পায়ে ধরা হইতে অব্যাহতি পাইবার জন্য কৃত্ৰিম ক্ৰোধে একটা ভয়ঙ্কর রকমের হক মারিয়া উঠিল–ভাগো হিঁয়াসে।
ঠিক সেই সময়ই ময়ূরাক্ষীর বন্যারোধী বাঁধের উপর দিয়া আসিতেছিল তারাচরণ ভাণ্ডারী। সে থমকাইয়া দাঁড়াইল। ছেলেগুলা শেখজীর হাঁকে ভয় পাইয়া খানিকটা পিছাইয়া গেলেও গরুগুলির সঙ্গ ছাড়িতে পারিতেছিল না। জনদুয়েক রাখাল উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে আরম্ভ করিয়া দিল,—ভাষাহীন হাউহাউ করিয়া কান্না।
কালু বলিল–ওরে উল্লুক, বেকুব, ছুঁচোরা সব, বাড়িতে বুল গা যা। হাউমাউ করে চিল্লাস না।
ছেলেগুলা সেকথা বুঝিল না, তাহারা ওই গরুগুলির মমতার আকর্ষণেই গরুর পালের পিছনে পিছনে চলিল। কান্নার বিরাম নাই।ওগো, কি করব গো? কি হবে গো?
শেখ আবার পিছনে তাড়া করিল—ভাগ্ বুলছি!
ছেলেগুলা খানিকটা পিছাইয়া আসিল; কিন্তু শেখ ফিরিবার সঙ্গে সঙ্গেই তাহারাও আবার ফিরিল।
তারাচরণ ব্যাপারটা বুঝিয়া লইল। কাল সে শ্ৰীহরির পায়ের নখের কোণ তুলিতে তুলিতে। ইহার খানিকটা আভাসও পাইয়াছিল। তারাচরণ দ্রুতপদে গ্রামে ফিরিয়া দেবুর খিড়কির দরজায় দাঁড়াইয়া তাহাকে সন্তৰ্পণে ডাকিয়া সংবাদটা দিয়া চলিয়া গেল। বলিল—শিগগির ব্যবস্থা কর ভাই, নইলে এক আনা করে ফাজিল লেগে যাবে। সে-ও আড়াই টাকা, তিন টাকা। ছটা বাজলে আজ আর গরু দেবেই না। কাল দু আনা করে বেশি লাগবে গরুতে।
খিড়কির দরজা দিয়াই সে বাহির হইয়া চলিয়া গেল। শ্ৰীহরি ঘোষ যে চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়া আছে, সে বিষয়ে সে নিঃসন্দেহ। পণ্ডিতের বাড়ি হইতে বাহির হইতে দেখিলেই ঘোষ ঠিক তাহাকে সন্দেহ করিয়া বসিবে। জঙ্গলের আড়াল হইতে তারাচরণ এক ফাঁক দিয়া চণ্ডীমণ্ডপের দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহার অনুমান অভ্রান্ত। এক ঝিলিক সকৌতুক হাসি তারাচরণের মুখে খেলিয়া গেল।
* * *
দেবু কিছুক্ষণ মাটির দিকে চাহিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। আজ কয়েক দিন হইতেই যে আঘাত সে আশঙ্কা করিয়া আসিতেছিল সে আঘাতটা আজ আসিয়াছে। ইহার দায়িত্ব। সমস্তটাই তো প্রায় তাহার। এ কথা সে কোনো দিন মুহুর্তের জন্য আপনার কাছে অস্বীকার করে নাই। আঘাতটা আসিবার সঙ্গে সঙ্গে আপন মাথা পাতিয়া দিয়া নির্দোষ গরিবদের রক্ষা করিবার জন্য অহরহ সচেতন হইয়াই সে প্রতীক্ষা করিতেছে।
গরিবেরা পয়সাই বা পাইবে কোথা? তারাচরণ বলিয়া গেল, এক আনা হিসাবে বেশি লাগিবে-আড়াই টাকা, তিন টাকা বেশি লাগিবে। তাহা হইলে গরু অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশটি। মনে মনে সে হিসাব করিয়া দেখিল—দশ টাকা হইতে পনের টাকা দণ্ড লাগিবে। এ দণ্ড উহারা কোথা হইতে দিবে? জমি নাই, জেরাত নাই,সম্বলের মধ্যে ভাঙা বাড়ি আর ওই গরু-ছাগল। গাইগরুর দুধ বিক্রি করে, গোবর হইতে ঘুঁটে বিক্রি করে, গরু-বাছুর-ছাগল বিক্রি করে, ওই পশুগুলিই তাহাদের একমাত্র সম্পদ। ইছু শেখ এ সময়ে টাকা দিতে পারে, কিন্তু তাহার এক টাকার মূল্য হিসাবে অন্তত সে দুই টাকা আদায় করিয়া লইবে। তা ছাড়া উহাদের এই বিপদের জন্য দায়ী একমাত্র সে-ই। সে বেশ জানে, সেদিন ওই তালপাতা উপলক্ষ করিয়াই একটা মিটমাট হইয়া যাইত, উহারা শ্রীহরির বশ্যতা স্বীকার করিয়া লইয়া বাঁচিত। কিন্তু সেই তাহাদিগকে উঠিয়া আসিতে বলিয়াছিল। অন্যায়কে অস্বীকার করিতে সে-ই প্রেরণা দিয়াছিল। আজ নিজের বেলায় ন্যায়কে ধর্মকে মাথায় তুলিয়া না লইলে চলিবে কেন?
আরও কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করিয়া মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইল। ডাকিল—বিলু!
তারাচরণ ডাকিতেই বিলুও আসিয়া আড়ালে দাঁড়াইয়াছিল। সংবাদটা দিয়া তারাচরণ চলিয়া গেলেও বিলু দেবুর সম্মুখে না আসিয়া নীরবে সেই আড়ালেই দাঁড়াইয়া ছিল। সেও ওই গরিবদের কথাই ভাবিতেছিল; আহা, গরিব! উহাদের ওপর নাকি এই অত্যাচার করে! এই স্তব্ধ। দুপুরে বাউরিবায়েনপাড়ায় মেয়েদের সকরুণ কান্না শোনা যাইতেছে। শুনিয়া বিলুরও কান্না। পাইল, সে কাঁদিতেছিল। দেবুর ডাক শুনিয়া তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া আসিয়া কাছে দাঁড়াইল।
দেবু বিলুর সর্বাঙ্গে অনুসন্ধান করিয়া দেখিল। কোথাও একটুকরা সোনা নাই। চাষীর ঘরে সোনার অলঙ্কারের বড় প্ৰচলন নাই। খুবজোর নাকে নাকছাবি, কানে ফুল, গলায় বিছাহার, হাতে শখাবাধা; বিলুর সেসব গিয়াছে।
বিলু বলিল–কি বলছ?
–কিছু নাই আর?
–কি?
–বাঁধা দিয়ে গোটাপনের টাকা পাওয়া যায়—এমন কিছু?
বিলু কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করিয়া বোধ করি তাহার সকল ভাণ্ডার মনে মনে অনুসন্ধান করিয়া দেখিল। তারপর সে ঘরের ভিতর গিয়া দুই গাছি ছোট বালা হাতে করিয়া ফিরিয়া আসিল।
দেবু দুই পা পিছাইয়া গেল—খোকার বালা?
–হ্যাঁ। এই বালা দুই গাছি দিয়াছিল বিলুর বাপ। দেবুর অনুপস্থিতিতে শত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও বিলু এ-দুটিকে হস্তান্তর করতে পারে নাই।
বিলু বলিল–নাও।
—খোকার বালা নেব?
