দুর্গা মৃদু হাসিয়া বলিল—মউ-ফুল।
—মউ-ফুল?
–মহুয়া ফুল, বাবু; আমরা বলি মউ-ফুল!
যতীন ফুলগুলি তুলিয়া নাকের কাছে ধরিল। সে এক উগ্র মদির গন্ধমাথার ভিতরটা যেন কেমন হইয়া যায়; সর্বাঙ্গ শিহরিয়া ওঠে।
–কুড়িয়ে রাখছি বাবু, গরুতে খাবে, দুধ বাড়বে। আবার দুর্গা হাসিল।
–আর কি করবে?
–আর সে—আপনাকে শুনতে হবে না!
–কেন, আপত্তি কি?
–আর আমরা মদ তৈরি করি।
–মদ?
–হ্যাঁ। পিছন ফিরিয়া দুর্গা হাসিতে লাগিল; তারপর বলিল–কাঁচাও খাই, ভারি মিষ্টি। যতীনও টপ করিয়া একটা মুখে ফেলিয়া দিল। সত্যই, চমৎকার মিষ্টি; কিন্তু সে মিষ্টতার মধ্যেও ওই মাদকতা। আবার একটা সে খাইল। আবার একটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহার কানের ভিতরটা যেন গরম হইয়া উঠিল; নাকের ভিতর নিশ্বাস উগ্ৰ উত্তপ্ত! কিন্তু অপূর্ব এই মধু-রস।
দুর্গা সহসা চকিত হইয়া বলিলপাড়ার ভেতরে গোল উঠছে লাগছে।
–হ্যাঁ, তাই তো!
সে তাড়াতাড়ি ঝুড়িটা কাঁধে তুলিয়া লইয়া বলিল-আমি চললাম, বাবু। পাড়াতে কি হল দেখি গিয়ে।
যাইতে যাইতে সে ফিরিয়া দাঁড়াইল, হাসিয়া বলিল—মউ আর খাবেন না বাবু, মাদ্কে যাবেন।
—কি হবে?
–মাদ্কে! নেশা–নেশা! দুর্গা চলিয়া গেল।
নেশা! তাই তো, তাহার মাথার ভিতরটা যেন ঝিমঝিম করিতেছে। সর্বশরীরে একটা দাহ, দেহের উত্তাপও যেন বাড়িয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে।
–বাবু! বাবু!
আবার কে ডাকিতেছে?—কে?
জঙ্গলের ভিতর আসিয়া ঢুকিল উচ্চিংড়ে।
–গাঁয়ে খুব গোল লেগে যেয়েছে বাবু! কালু শ্যাখ বাউরি-মুচিদের গরু সব ধরে নিয়ে গ্যালা।
—গরু ধরে নিয়ে গেল। কালু শেখ কে? নিল কেন?
–কালু শ্যাখ–ছিরু ঘোষের প্যায়দা! দেখ না এসে–-তোমাকে সব ডাকছে!
যতীন দ্রুতপদে ফিরিল। উচ্চিংড়ে চড়িয়া বসিল মহুয়া গাছে। একেবারে মগডালে উঠিয়া পাকা ফুল পাড়িয়া খাইতে আরম্ভ করিল।
***
শ্ৰীহরি অপমানের কথা ভুলিয়া যায় নাই, অপমান ভুলিবার তাহার কথাও নয়। এ গ্রামের শাসন-শৃঙ্খলার জন্য লোকত ধর্মত সে-ই দায়ী। প্রতিটি মুহূর্তে সে দায়িত্ব শ্রীহরি অনুভব করে, উপলব্ধি করে—বিপদে-বিপর্যয়ে সে তাহাদের রক্ষা করিবে, আর শৃঙ্খলা ভাঙিলে সে তাহাদের। শাস্তি দিবে বিদ্রোহকে কঠিন হস্তে দমন করিবে। এ তাহার অধিকার। এ তাহার দায়িত্ব। যখন সে অত্যাচারী ছিল, তখন তাহার অধিকার ছিল না—এ কথা সে স্বীকার করে। কিন্তু আজ সে কোনো অন্যায় করে না—আজ সমস্ত গ্রামখানাতেই তাহার কর্তব্যপরায়ণতার, ধর্মপরায়ণতার পরিচয় শ্ৰীহরির মহিমায় উজ্জ্বল হইয়াছে। চণ্ডীমণ্ডপ, ষষ্ঠীতলা, কুয়া, স্কুলঘর-সর্বত্র তাহার নাম ঝলমল করিতেছে। রাস্তার ওই নালাটা আবহমানকাল হইতে একটা দুৰ্লজ্জ বিঘ্ন; সে নিজে হইতেই সে বিঘ্ন দূর করিবার আয়োজন করিতেছে। শিবকালীপুরের সকল ব্যবস্থাকে সেই পরম যত্নে সুষ্ঠু করিয়া তুলিয়াছে। সে সুব্যবস্থাকে অব্যবস্থায় পরিণত করিতে যে বিদ্রোহ, সে বিদ্ৰোহ দমন করা কেবল তাহার অধিকার নয়, কর্তব্য। তবে প্রথমেই সে কঠিন শাস্তি দিতে চায় না। চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়ানোর জন্য যাহারা মজুরি চায়, বলে—জমিদারের চণ্ডীমণ্ডপ—তাহারা বিনা মজুরিতে খাঁটিবে কেন, তাহাদের সে বুঝাইয়া দিতে চায়—বিনা বিনিময়ে জমিদারের কতখানি তাহারা ভোগ করে। মাত্র ওই কয়খানা তালপাতাই লয় না। জমিদারের খাস-পতিত ভূমি তাহাদের গরু-বাছুরের একমাত্র চারণভূমি। জমিদারের খাস-পতিত পুকুরের ঘাটে তাহারা নামে, স্নান করে, জল খায়; জমিদারের খাস-পতিত জমির উপর দিয়াই তাহাদের যাতায়াতের পথ। চণ্ডীমণ্ডপ সেই জমিদারের অধিকার বলিয়া বিনা পয়সায় ছাওয়াইবে না।
তাই সে নবনিযুক্ত কালু শেখ চাপরাসীকে হুকুম দিয়াছে—জমিদার-সরকারের বাধে কিংবা পতিত-জমিতে বাউরিবায়েনদের গরু অনধিকার প্রবেশ করিলেই গরুগুলিকে আগল করিয়া কঙ্কণার ইউনিয়ন বোর্ডের খোঁয়াড়ে দিয়া আসিবে। নবনিযুক্ত কালু মনিবকে কাজ দেখাইতে উদ্গ্রীব, তাহার ওপর এ কাজটা লাভের কাজ। খোয়াড়ওয়ালা এক্ষেত্রে গরুপিছু কিছু কিছু প্রকাশ্য চলিত ঘুষ দিয়া থাকে। সে আভূমি-নত এক সেলাম ঠুকিয়া তৎক্ষণাৎ মনিবের হুকুম প্রতিপালন করিতে চলিল। ভূপাল তাহাকে দেখাইয়া দিল—কোনগুলি শ্ৰীহরির অনুগত লোকের গরু। সেগুলি বাদ দিয়া, বাকি গরুগুলি সে ধরিয়া লইয়া গেল খোঁয়াড়ে।
শ্ৰীহরির গ্রাম-শাসনের এই দ্বিতীয় পর্যায়। ইহাতেও যদি লোকে না বোঝে, তবে আরও আছে। একেবারেই সে কঠিনতম দণ্ড দিবে না। অধর্ম সে করিবে না। লক্ষ্মী তাহাকে কৃপা করিয়াছেন, সে তাহার পূর্বজন্মের সুকৃতির ফল, সে উহার অপব্যবহার করিবে না। দানের তুল্য পুণ্য নাই—দয়ার তুল্য ধর্ম নাই—শাস্তিবিধানের সময়েও সেকথা সে বিস্মৃত হইবে না। তাহার ইচ্ছা ছিল, গরুগুলোকে আটক করিয়া তাহার বাড়িতেই রাখিবে, বাউরিবায়েনদের দল আসিয়া কান্নাকাটি করিলে তাহাদের অন্যায়টা বেশ করিয়া বুঝাইয়া দিবে। তাহা হইলে গরিবদের আর খোঁয়াড়ের মাসুলটা লাগিত না। মাসুল বড় কম নয়, গরুপিছু চারি আনা হিসাবে চল্লিশ-পঞ্চাশটা গরুতে দশ-বার টাকা লাগিবে। আবার সামান্য বিলম্ব হইলেই খোয়াড় ভেণ্ডার এক আনা হিসাবে। খোরাকি দাবি করিবে। অথচ খোরাকি এক কুটা খড়ও দেয় না—গরুগুলোকে অনাহারেই রাখে। খোরাকি হিসাবেও টাকা আড়াই-তিন লাগিবে। কিন্তু সে কি করিবে? আইন তাই। বেআইনি করিতে গেলেই দেবুজগন হয়ত তাহাকে বিপদাপন্ন করিবার জন্য মামলা বা দরখাস্ত করিয়া বসিবে।
