আশ্চর্য! ইহার মধ্যেই মানুষ বাঁচিয়া আছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন—এ বাঁচা প্রেতের বাঁচা। অথবা ক্ষয়রোগাক্রান্ত রোগীর দিন গণনা করিয়া বাঁচা। তিল তিল করিয়া ইহারা চলিয়াছে মৃত্যুর দিকে একান্ত নিশ্চেষ্টভাবে মৃত্যুর কাছে আত্মসমৰ্পণ করিয়াছে।
এখানে প্রজা-সমিতি কি বাঁচিবে? সঞ্চয়-সম্বলহীন চাৰী গৃহস্থের সম্মুখে চাষের সময় কঠিন গ্রীষ্ম, দুর্যোগ-ভরা বর্ষা। চোখের উপর শ্ৰীহরির খামারে রাশ রাশি ধান্যসম্পদ। সেখানে প্রজাসমিতি কি বাঁচিবেনা কাহাকেও বাঁচাইতে পারিবে? সমিতির প্রত্যক্ষ এবং প্রথম সংঘর্ষ হইবে যে শ্ৰীহরির সঙ্গে! হইবে কেন, আরম্ভ তো হইয়াই গিয়াছে।
সম্মুখের দাওয়ার উপর পড়িয়া ঘুমাইতেছে উচ্চিংড়ে।
ওই পল্লীর ভাবী পুরুষ। নিঃস্ব, রিক্ত, গৃহহীন, স্বজনহীন, আত্মসর্বস্ব। যে নীড়ের মমতায় মানুষ শ্রী অর্থাৎ লক্ষ্মীর তপস্যা করিয়া তাহাকে আয়ত্ত করিতে চায়—সে নীড় হার ভাঙিয়া। গিয়াছে।
অকস্মাৎ পদ্মের উচ্চকণ্ঠ তাহার কানে আসিয়া প্রবেশ করিল। পদ্ম তাহাকে শাসন করিতেছে। সেই শাসনবাক্যের ঝঙ্কারে তাহার চিন্তার একাগ্ৰতা ভাঙিয়া গেল। ষষ্ঠী-পুজোর থালা হাতে পদ্ম ঝঙ্কার দিতে দিতে আসিয়া সম্মুখে দাঁড়াইল; তাহার স্নান হইয়া গিয়াছে; পরনে পুরনো একখানি শুদ্ধ কাপড়। সে বলিল—কি ছেলে বাবা তুমি! পঞ্চাশবার শেকল নেড়ে ডাকছি, তা শুনতে পাও না? যাক, ভাগ্যি আমার, সাঙ্গপাঙ্গের দল সব গিয়াছে। নাও ফোঁটা নাও। উঠে দাঁড়াও।
যতীন হাসিয়া উঠিয়া পাঁড়াইল। শুচিস্মিতা পদ্ম কপালে তাহার দই-হলুদের ফোঁটা দিয়া বলিল—তোমার মা আজ দরজার বাজুতে তোমাকে ফোঁটা দেবে।
যতীনকে ফোঁটা দিয়া এবার সে ডাকিল—উচ্চিঙ্গে! অ উচ্চিঙ্গে! ওরে দেখ তো, ছেলের ঘুম দেখ তো অসময়ে! এই উচ্চিঙ্গে—!
ইতিমধ্যেই উচ্চিংড়ের বেশ এক দফা ঘুম হইয়াছিল, ক্ষুধার বেলাও হইয়াছিল, সুতরাং তিনবার ডাকিতেই সে উঠিয়া বসিল।
–ওঠ, উঠে দাঁড়া, ফোঁটা দি! ওঠ বাবা ওঠ।
উচ্চিংড়ে দাঁড়াইয়া প্রথমেই হাত পাতিল—পেসাদ! পেসাদ দাও!
পদ্ম হাসিয়া ফেলিল, পাঁড়া আগে ফোঁটা দি!
উচ্চিংড়ে খুব ভাল ছেলেটির মত কপাল পাতিয়া দাঁড়াইল, পদ্ম ফোঁটা পরাইয়া দিল।
যতীন বলিল, প্রণাম কর, উচ্চিংড়ে। প্রণাম করতে হয়। দাঁড়াও মা-মণি, আমিও একটা–।
–বাবা রে বাবা রে! আমাকে তুমি নরকে না পাঠিয়ে ছাড়বে না!
পদ্ম মুহূর্তে উচ্চিংড়েকে কোলে তুলিয়া লইয়া একপ্রকার ছুটিয়াই ভিতরে চলিয়া গেল।
***
চৈত্রের দ্বিপ্রহর। অলস বিশ্রামে যতীন দাওয়ার তক্তপোশখানির উপর শুইয়া ছিল। চারিদিক বেশ রৌদ্রদীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। উত্তপ্ত বাতাস এলোমেলো গতিতে বেশ জোরেই বহিতেছে। বড় বড় বট, অশ্বথ, শিরীষ গাছগুলি কচি পাতায় ভরা; উত্তাপে কচি পাতাগুলি ম্লান হইয়া পড়িয়াছে। সেদিনের বৃষ্টির পর মাঠে এখনও হাল চলিতেছে, চাষীরা এতক্ষণে হাল-গরু লইয়া বাড়ি ফিরিতেছে। সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজিয়া গিয়াছে, ঘর্মসিক্ত কালো চামড়া রৌদ্রের আভায় চকচক করিতেছে তৈলাক্ত লোহার পাতের মত; বাউরিবায়েনদের মেয়েরা গোবর, কাঠকুটা সংগ্রহ। করিয়া ফিরিতেছে। সম্মুখেই রাস্তার ওপাশেই একটা শিরীষ গাছের সর্বাঙ্গ ভরিয়া কি একটা লতা—লতাটির সর্বাঙ্গ ভরিয়া ফুল। চারিধারে মৌমাছি ও ভ্রমরের গুনগুনানিতে যেন এক মৃদুতম ঐকতান-সঙ্গীতের একটা সূক্ষ্ম জাল বিছাইয়া দিয়াছে। গোটাকয়েক বুলবুলি পাখি নাচিয়া নাচিয়া এ-ডাল ও-ডাল করিয়া ফিরিতেছে। দূরে কোথায় পাল্লা দিয়া ডাকিতেছে দুইটা কোকিল। চোখ গেল পাখিটার আজ সাড়া নাই। কোথায় গিয়া পড়িয়াছে—কে জানে! আকাশে উড়িতেছে কয়েকটা ছোট অ্যাঁকে—একদল বন-টিয়া; মাঠের তিল-ফসলে তাহাদের প্রত্যাশা। অসংখ্য বিচিত্র রঙিন প্রজাপতি ফড়িং ভাসিয়া ভাসিয়া ফিরিতেছে দেবলোকের বায়ুতাড়িত পুষ্পের মত।
গন্ধে, গানে, বর্ণচ্ছটায় পল্লীর এই এক অনিন্দ্য রূপ। কবির কাব্যের মতই এই গন্ধে গানে বর্ণচ্ছটায় যেন একটা মাদকতা আছে, কেমন একটা হাতছানির ইশারা আছে।
হঠাৎ উঠিয়া বসিয়া সেই ইশারার ডাকেই যেন মোহগ্ৰস্তের মত যতীন বাহির হইয়া পড়িল। কাছেই কোন গাছের মধ্যে ডাকিতেছে একটা পাখি। অতি সুন্দর ডাক। শুধু স্বরই সুন্দর নয়, ডাকের মধ্যে সঙ্গীতের একটা সমগ্ৰতা আছে। পাখিটি যেন কোন গানের গোটা একটা কলি গাহিতেছে। ওই পাখিটার খোঁজেই যতীন সন্তৰ্পণে জঙ্গলের ভিতর ঢুকিয়া পড়িল। খানিকটা ভিতরে গিয়া পাইল সে গাঢ় মদির গন্ধ। ধ্বনি এবং গন্ধের উৎসমূল আবিষ্কার করিবার জন্য সে অগ্রসর হইয়া চলিল। আশ্চর্য! পাখিটা এবং ফুলগুলি তাহার সঙ্গে কি লুকোচুরি খেলিতেছে! শব্দ। এবং গন্ধ অনুসরণ করিয়া যত সে আগাইয়া আসিতেছে তাহারাও যেন তত সরিয়া চলিতেছে। মনে হয় ঠিক ওই গাছটা। কিন্তু সেখানে আসিলেই পাখি চুপ করেফুল লুকাইয়া পড়ে। আবার আরও দূরে পাখি ডাকিয়া ওঠে। গন্ধ মনে হয় ক্ষীণ, উৎসস্থান মনে হয় আরও দূরে। মোহগ্ৰস্তের মত যতীন আবার চলিল।
–বাবু!
কে ডাকিল? নারীকণ্ঠ যেন!
যতীন পাশে দৃষ্টি ফিরাইয়া দেখিল—একটা গাছের শিকড়ের উপর বসিয়া রহিয়াছে দুর্গা। সে কি করিতেছে।
–দুর্গা?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
আঁটসাঁট করিয়া গাছকোমর বাঁধিয়া কাপড় পরিয়া দুর্গা বসিয়া কি যেন কুড়াইতেছে।
—ওগুলো কি? কি কুড়োচ্ছ?
এক অঞ্জলি ভরিয়া দুর্গা বাড়াইয়া তাহার সামনে ধরিল। টোপা-টোপা স্ফটিকের মত সাদা এগুলি কি? এই তো সে মদির গন্ধ! ইহারই একছড়া মালা গাঁথিয়া দুর্গা গলায় পরিয়াছে। বিলাসিনী মেয়েটির দিকে যতীন অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। গঠনভঙ্গিতে, চোখ-মুখের লাবণ্যে, রুক্ষ চুলে মেয়েটার সর্বাঙ্গভরা একটা অদ্ভুত রূপ নূতন করিয়া আজ তাহার চোখে পড়িল।
