জগন বলিতেছে প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধনে সে স্বত্ব হবে প্ৰজার। জমিদারের বিষদাঁত এইবার ভঙিল। সেদিন কাগজে সব বেরিয়েছিল—কি রকম সংশোধন হবে! আমি কেটে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ও আইন পাস হবেই। ওঃ, স্বরাজ্য পার্টির কি সব বক্তৃতা! একেবারে আগুন ছুটিয়ে দিয়েছে।
গদাই জিজ্ঞাসা করিল—কি রকম কি সব হবে, ডাক্তার?
হরেন খবরের কাগজের কেবল হেডলাইনগুলি পড়ে আর পড়ে আইন-আদালতের কথা। বিস্তৃত বিবরণ পড়িবার মত ধৈর্য তাহার নাই। তবুও সে বলিল—অনেক। সে অনেক ব্যাপার। এই এত বড় একখানা বই হবে। বলিয়া দুই হাত দিয়া বইয়ের আকারটা দেখাইল। তারপর বলিল, বোকার মত মুখে মুখেই জিজ্ঞাসা করছি কি রকম হবে ডাক্তার।
জগনেরও সব মনে নাই—সব সে বুঝিতেও পারে নাই, তবুও সে কিছু কিছু বলিল।
প্রথমেই বলিল–গাছের উপর প্রজার স্বত্ব কায়েম হইবে।
হস্তান্তর আইনে জমিদারের উচ্ছেদ-ক্ষমতা উঠিয়া যাইবে।
খারিজ-ফিস্ নির্দিষ্ট হইবে, এবং সে ফিস্ প্রজা রেজিস্ট্রি আপিসে দাখিল করিবে।
মাল জমির উপরেও পাকা ঘর করিতে পারবে।
মোটকথা, জমি প্রজার।
গদাই বলিল–কোর্ফার নাকি স্বত্ব হবে? ঠিকে ভাগেরও নাকি–
জগন বলিল–হ্যাঁ হ্যাঁ। কোর্ফার স্বত্ব সাব্যস্ত হলে মানুষের আর থাকবে কি? নাকে তেল দিয়ে ঘুমো গিয়ে। ভাগে ঠিকের জমি সব তোর হয়ে যাবে।
দেবু আপন প্রকৃতি অনুযায়ী চুপ করিয়া বসিয়া ছিল। কয়েক দিন হইতেই তাহার মনে অশান্তির শেষ নাই। সে ভাবিতেছে, সেদিনের সেই পাতু প্রমুখ বাউরিবায়েনগুলির কথা। তাহার কথা শুনিয়া তাহারা শ্রীহরিকে অমান্য করিয়া উঠিয়া আসিয়াছে। অচিরে শ্ৰীহরির শাসনদণ্ড কোনো-না-কোনো একটা দিক হইতে আকস্মিকভাবে আঘাতে তাহাদের মাথার উপর আসিয়া পড়িবেই। তাহাদিগকে বচাইতে হইবে; এবং তাহাকেই বাঁচাইতে হইবে। পঁচাইতে সে ন্যায়ধর্ম অনুসারে বাধ্য। কিন্তু সে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। বিলু, খোকা, সংসার, জমিজমা সম্বন্ধে তাহার চিন্তা করিবার অবসর নাই। মধ্যে মধ্যে এমনিভাবে ক্ষণিক দুশ্চিন্তার মত সাময়িকভাবে তাহাদিগকে মনে পড়িয়া যায়।
জগন বক্তৃতা দিয়াই চলিয়াছিল—দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন যদি আজ বেঁচে থাকতেন তা হলে আর দেখতে হত না।
ওই নামটিতে আসরের সমস্ত লোকগুলির শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। দেশবন্ধুর নাম, তাহার পরিচয় সকলেই জানে, তাহার ছবিও তাহারা দেখিয়াছে।
দেবুর চোখের উপর ভাসিয়া উঠিল তাহার মূর্তি। দেশবন্ধুর শেষশয্যার একখানা ছবি বাঁধাইয়া ঘরে টাঙাইয়া রাখিয়াছে। মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ছবির তলায় লিখিয়া দিয়াছেন—
এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্ৰাণ।
মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।।
যতীন বাড়ির ভিতর হইতে ডাকিল—উচ্চিংড়ে!
সে চায়ের খোঁজে বাড়ির ভিতরে গিয়াছিল।
মজলিসের মধ্যে বসিয়া উচ্চিংড়ের খেয়ালখুশিমত চাঞ্চল্য প্রকাশের সুবিধা হইতেছিল না। কিছুক্ষণ ধরিয়া পথের ওপাশে জঙ্গলের মধ্যে একটা গিরগিটির শিকার দেখিতেছিল; দেখিতে দেখিতে যেই একটু সুস্থির-শান্ত হইয়াছে, অমনি সেইখানেই শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। বেচারা!
হরেন তাহাকে ধমক দিয়া ডাকিল—এই ছেড়া, এই! দেবু বলিল-ডেকো না। ছেলেমানুষ, ঘুমিয়ে পড়েছে। বলিয়াই সে নিজেই ভিতরে উঠিয়া গিয়া যতীনকে বলিল—কি করতে হবে বলুন। যতীন বলিলচায়ের বাটিগুলো নিয়ে সকলকে দিয়ে দিন।
দেবুই সকলকে চ পরিবেশন করিয়া দিল। চা খাইতে খাইতে জগন আরম্ভ করিল—মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত মতিলাল নেহরু, জহরলাল নেহরু, যতীন্দ্রমোহন, সুভাষচন্দ্রের কথা।
চা খাইয়া সকলে চলিয়া গেল। সকলের শেষে গেল দেবু। যাইবার জন্য উঠিয়াছিল সর্বাগ্রে সে-ই। কিন্তু যতীন বলিল গোটাকয়েক কথা ছিল যে দেবুবাবু!
দেবু বসিল। সকলে চলিয়া গেলে যতীন বলিল—আর দেরি করবেন না, দেবুবাবু। সমিতির কাজটা নিয়ে ফেলুন।
সমিতি প্রজা-সমিতি। যতীন বলিতেছে, দেবুকে সমিতির ভার লইতে হইবে।
দেবু চুপ করিয়া রহিল।
আপনি না হলে হবে না, চলবে না। সকলেই আপনাকে চায়। হয়ত ডাক্তার মনে মনে একটু ক্ষুণ্ণ হবে। তা যোক সে ক্ষুণ্ণ, কিন্তু একটা জিনিস গড়ে উঠেছে—সেটাকে ভাঙতে দেওয়া উচিত হবে না।
দেবু বলিল-আচ্ছা, কাল বলব আপনাকে।
যতীন হাসিল, বলিলবলবার কিছু নাই। ভার আপনাকে নিতেই হবে।
দেবু চলিয়া গেল, যতীন স্তব্ধ হইয়া বসিয়া রহিল।
বাংলার পল্লীর দুর্দশার কথা সে ছাত্রজীবনে অনেক পড়িয়াছে, অনেক শুনিয়াছে। অনেক সরকারি স্ট্যাটিস্টিক্স এবং নানা পত্রপত্রিকায় এর বর্ণনাও পড়িয়াছে, কিন্তু এমন বাস্তবরূপে সে কল্পনা করিতে পারে নাই। সবে এই তো চৈত্র মাস, কৃষিজাত শস্যসম্পদ এখনও সম্পূর্ণ শেষ হইয়া মাঠ হইতে ঘরে আসে নাই, ইহারই মধ্যে মানুষের ভাণ্ডার রিক্ত হইয়া গিয়াছে। ধান শ্ৰীহরির ঘরে গিয়াছে, জংশনের কলে গিয়াছে। গম, যব, কলাই, আলু–তাহাও লোকে বেচিয়াছে। তিল এখনও মাঠে, কিন্তু তাহার উপরেও পাইকার দান দিয়া গিয়াছে। ইহারই মধ্যে একদিন শ্রীহরির খামারে একটি জনতা জমিয়াছিল, শ্ৰীহরি ধান-ঋণ দিতে আরম্ভ করিয়াছে। এই গ্রামের মাঠে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের প্রায় সব জমিই নাকি মহাজনদের কাছে আবদ্ধ। মহাজনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মহাজন শ্ৰীহরি।
পল্লীর প্রতিটি ঘর জীর্ণ, শ্ৰীহীন, মানুষগুলি দুর্বল। চারিপাশে কেবল জঙ্গল, খানায়-খন্দে পল্লীপথ দুৰ্গম। সেদিনের বৃষ্টিতে সমস্ত পথটাই কাদায় ভরিয়া উঠিয়াছে। স্নানের ও পানের জলের পুকুর দেখিয়া শিহরিয়া উঠিতে হয়। প্ৰকাণ্ড বড় দিঘি, কিন্তু জল আছে সামান্য খানিকটা স্থানে, গভীরতা মাত্র হাতখানেক কি হাতদেড়েক। সেদিন একটা লোককে সে পলুই চাপিয়া ও-দিঘিতে মাছ ধরিতে দেখিয়াছিল। পাকে-জলে ভাল করিয়া লোকটার কোমরও ডোবে নাই।
