অনিরুদ্ধ নূতন করিয়া কাজকর্ম আরম্ভ করিতে চায়।
কাবুলী চৌধুরীর কাছে টাকা সে পাইয়াছে। আড়াই শো টাকার জন্য চৌধুরী গোটা জোতটাই বন্ধক না লইয়া ছাড়ে নাই। অনিরুদ্ধ তাহাই দিয়াছে। তাহার মন খানিকটা খুঁতখুঁত করিয়াছিল; কিন্তু টাকা পাইয়া সে সব আফসোস ছাড়িয়া, মহা উৎসাহের সঙ্গে কাজ আরম্ভ করিয়া দিয়াছে। বাকি খাজনার টাকাটা আদালতে দাখিল করিতে হইবে, আপোসে দিয়া বিশ্বাস নাই। আর আপোসেই বা সে দিবে কেন? পাচুন্দীর গরু-মহিষের হাট হইতে একজোড়া গরু কিনিবে। ইহার মধ্যে সে কৃষাণ বহাল করিয়া ফেলিয়াছে। দুর্গার ভাই পাতুকেই তাহার পছন্দ। তাহাকে সে কামারশালে চাকরও রাখিয়াছে। পাতুকে সে ভালবাসে। দুর্গার কাছে পাতু অনেক ওকালতি করিয়াছিল অনিরুদ্ধের জন্য।
সেদিন অনিরুদ্ধের সঙ্গে কামারশালায়ও পাতু কাজ করিতেছিল। মোটা মোটা লোহার জিনিসগুলি তাহারা দুজনে বহিয়া বাহির করিয়া আনিয়া রাখিতেছিল। কাজের ফাঁকে চাষের সম্বন্ধে কথাবার্তা চলিতেছিল। হইতেছিল গরুর কথা। কেমন গরু কেনা হইবে—তাই লইয়া আলোচনা।
পাতুর মতে দুর্গার নিকট হইতে বলদ-বাছুরটা কেনা হউক এবং হাট হইতে দেখিয়াশুনিয়া তাহার একটা জোড়া কিনিয়া আনিলে—বড় চমৎকার হাল হইবে!
অনিরুদ্ধ হাসিয়া বলিল-দুর্গার বাছুরটার দাম যে বেজায়!
পাইকেররা এক শো টাকা পর্যন্ত বলেছে। দুর্গা ধরে রয়েছে, আরও পঁচিশ টাকা। তা তোমাকে সস্তা করে দেবে। আমিসুদ্ধ যখন আছি।
হাসিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—মোটে এক শো টাকা আমার পুঁজি। ও হবে না পাতু। ছোটখাটো গিঠগিঠ বাছুর কিব। জমিও বেশি নয়—বেশ চলে যাবে।
–কিন্তু দধি-মুখো গরু কিনো বাপু। দধি-মুখখা গরু ভারি ভালো লক্ষণ-মান।
–চল না, হাঁটে তো দুজনেই যাব।
পদ্ম বলিল তারিণীর ছেলেটাকো রে, আবার লোহার টুকরো কুড়োতে লাগলি? এই বুঝি তোর কাজ করা হচ্ছে?
ছোঁড়াটা উত্তর দিল না।
পাতু বলিল—এ্যাঁই এ্যাঁই, ই তো আচ্ছা ছেলে রে বাপু! এই ছেলে!
ছেলেটা দাঁত বাহির করিয়া পাতুকে একটা ভেঙচি কাটিয়া দিল।
—ও বাবা, ই যে ভেঙচি কাটে লাগছে! বলিহারির ছেলে রে বাবা।
অনিরুদ্ধ বলিল—ধরে আন। কান ধরে নিয়ে আয় তো পাতু!
পদ্ম হাঁ-হাঁ করিয়া উঠিল, ধোরো না, কামড়ে দেবে, কামড়ে দেবে।
ছোঁড়াটার ওই এক বদ অভ্যাস। কেহ ধরিলেই সঙ্গে সঙ্গে কামড় বসাইয়া দেয়। আর দাঁতগুলিতে যেন ক্ষুরের ধার। অতর্কিত কামড়ে আক্রমণকারীকে বিব্রত করিয়া মুহূর্তে সে আপনাকে মুক্ত করিয়া লইয়া পলাইয়া যায়। ওই তাহার রণকৌশল। আজ কিন্তু পাতু ধরিবার আগেই ছোঁড়াটা উঠিয়া ভো দৌড় দিল।
পদ্ম ব্যস্ত হইয়া উঠিল—উচ্চিঙ্গে, উচ্চিঙ্গে, ওরে অ উচ্চিঙ্গে! যাস না কোথাও যেন, শুছিস?
ছেলেটার ডাকনাম উচ্চিংড়ে; ভাল নাম মা-বাপে শখ করিয়া একটা রখিয়াছিল। কিন্তু সে তার বাপ-মা-ই জানত, ছেলেটা নিজেও জানে না। উচ্চিংড়ে কিন্তু পদ্মের ডাক কানেই তুলিল। না। তবে বাড়ির দিকেই গেল—এই ভরসা। পদ্মও বাড়ির দিকে চলিল।
অনিরুদ্ধ বলিলচলি কোথায়?
দেখি, কোথায় গেল!
–যাক গে, মরুক গে। তোর কি? আপনার কাজ কর তুই!
—ষাট! আজ ষষ্ঠীর দিন। তোমার মুখের আগল নাই? বড় বড় চোখে প্রদীপ্ত দৃষ্টিতে চাহিয়া পদ্ম অনিরুদ্ধকে নীরবে তিরস্কার করিয়া চলিয়া গেল।
দাঁতে দাঁত টিপিয়া অনিরুদ্ধও ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে পদ্মের দিকে চাহিয়া রহিল। পদ্ম কিন্তু ফিরিয়াও চাহিল না; বাড়ির মধ্যে চলিয়া গেল। অনিরুদ্ধ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কাজ করিতে আরম্ভ করিল। কথায় আছে—না বিয়াইয়া কানুর মা, এ দেখিতেছি তাই! অনিরুদ্ধেরই মরণ।
যাক, উচ্চিংড়ে অন্য কোথাও পালায় নাই। যতীনের মজলিসে গিয়া বসিয়াছে। যতীনের কথার সাড়া হইতেই দূর হইতে পদ্ম উচ্চিংড়ের অস্তিত্ব অনুমান করিল।
যতীন জিজ্ঞাসা করিতেছিলমা-মণি কোথায় রে?
–হুই কামারশালায়।
এই যে তাহারই খোঁজ হইতেছে। পদ্ম হাসিল।-কেন! মা-মণির খোঁজ কেন? ওই এক চাদ-চাওয়া ছেলে! এখন কি হুকুম হইবে কে জানে! সে ভিতরের দরজার শেকল নাড়িয়া সংকেত জানাইল-মা-মণি মরে নাই, বাঁচিয়া আছে। ওপাশে যতীনের ঘরের বাহিরের বারান্দায় ভরপুর মজলিস চলিতেছে। দেবু, জগন, হরেন, গিরিশ, গদাই অনেকে আসিয়া জমিয়াছে। শিকল নাড়ার শব্দ পাইয়া, হাসিয়া, যতীন বারান্দা হইতে ঘরে আসিয়া বাড়ির ভিতরের দিকের দরজায় দাঁড়াইল। কালি-ঝুলি-মাখা আপনার সর্বাঙ্গ এবং কালো ঘেঁড়া কাপড়খানার দিকে চাহিয়া পদ্ম ব্যস্ত হইয়া উঠিল, বলিলনা না, ভেতরে এসো না।
—আসব না?
–না, আমি ভূত সেজে দাঁড়িয়ে আছি।
–হাসিয়া যতীন বলিল–ভূত সেজে?
–হ্যাঁ, এই দেখ। দরজার ফাঁক দিয়া সে আপনার কালি-মাখা হাত দুখানা বাড়াইয়া দেখাইল। এসো না, জুজুবুড়ি! ভয় খাবে। সে একটি নূতন পুলকে অধীর হইয়া খিলখিল করিয়া হাসিতে আরম্ভ করিল।
যতীনও হাসিয়া বলিল—কিন্তু জুজুমা, এখুনি যে চায়ের জল চাই! হাতটা কিন্তু ধুয়ে ফেলো!
পদ্ম এবার গজগজ করিতে আরম্ভ করিল।–চা দিনের মধ্যে লোকে কতবার খায়। তাহার যেমন কপাল! অনিরুদ্ধ মাতাল যতীন চাতাল, ওই উচ্চিংড়েটা জুটিল তো সেটা হইল দাঁতাল।
যতীন ফিরিয়া গিয়া মজলিসে বসিল। চা তাহার মজলিসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। হরেন। ইহারই মধ্যে বারদুয়েক তাগাদা দিয়াছে।
–চা কই মশাই? এ যে জমছে না!
মজলিসে আজ জগন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বক্তৃতা দিতেছে। উপস্থিত আলোচনা চলিতেছে প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন সম্ভাবনা সম্বন্ধে। বাংলা প্রদেশের আইনসভায় প্রজাস্বত্ব আইন লইয়া জোর আলোচনা চলিতেছে। কথাটা উঠিয়াছে শ্ৰীহরি পালের সেদিনের সেই শাসন-বাক্যের আলোচনা-প্রসঙ্গে। মাল জমি অর্থাৎ প্রজাস্বত্ববিশিষ্ট জমির উপর মূল্যবান বৃক্ষে প্রজার শুধু ফল ভোগের অধিকার ছাড়া আর কোনো স্বত্ব নাই। গাছ জমিদারের।
