কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শ্ৰীহরি সহজ স্বরেই বলিল হরিশ-দাদা, ষষ্ঠীকাকাকে বলুন এইবার কাজ আরম্ভ করে দিক। ইট তো তোমার পড়ে রয়েছে। ইস্কুলের মেঝে না হয় দশ দিন পরে হবে, জল পড়াক ভাল করে; নইলে ফেটে যাবে মেঝে। কিন্তু সাঁকোটা এখন না করালে কখন করবে? তার ওপর ওটা আমার কাজ নয়, আমি অবিশ্যি দশ টাকা দিয়েছি। কিন্তু সে ইউনিয়ন বোর্ডকে দিয়েছি সাঁকো করবার জন্য। ইউনিয়ন বোর্ডকে আমি বলব কি?
হরিশের ছেলে ষষ্ঠী শ্ৰীহরির পৃষ্ঠপোষকতায় আজকাল ঠিকাদারির কাজ করিতেছে। ইউনিয়ন বোর্ড হইতে শিবকালীপুরের রাস্তায় একটা সাঁকো হইবে, শ্ৰীহরি নিজে স্কুলের মেঝে বাঁধাইয়া দিবে। এসবেরই ঠিকাদার ষষ্ঠীচরণ।
হরিশ বলিল—তোমার কাজেই সে এখন ব্যস্ত, ভাই। খাতাপত্র নিয়ে সকালে বসে, ওঠে। সেই রাত্রে। তামাদির হিসেব, হিসেব তো কম নয়!
ষষ্ঠীচরণ শ্ৰীহরির গোমস্তাগিরির কাগজপত্র সারিয়া দেয়। চৈত্র মাসে বাকি-বকেয়ার হিসাব হইতেছে; যাহাদের চার বৎসরের বাকি, তাহাদের নামে নালিশ হইবে। শ্ৰীহরির নিজের ধানের টাকার হিসাব আছে, তাহার তামাদি তিন বৎসরে। সেসবের হিসাবও হইতেছে।
ভূপাল চলিয়া গিয়াছিল; বরাত খাঁটিবার উপযুক্ত অন্য কেহও ছিল না। নিরুপায়ে ভবেশ নিজেই তামাক সাজিতে বসিয়াছিল। ষষ্ঠীতলার ধারে কাঠের ধুনি জ্বলে,—সেখানে বসিয়া কল্কেতে আগুন তুলিতে তুলিতে ভবেশ কাহাকে ডাকিল—কে রে? ও ছেলে!
একটি ছেলে একগুচ্ছ লালফুল হাতে করিয়া যাইতেছিল, ডাকিতে সে দাঁড়াইল।
—কে রে? কি ফুল হাতে? অশোক নাকি?
ছেলেটি বৈরাগীদের নলিন, সে গিয়াছিল মহাগ্রামে পটুয়াদের বাড়ি। ঠাকুরদের বাগানে অশোক ফুল ফুটিয়াছিল, সেখান হইতে অশোক ফুলের একটি তোড়া বাঁধিয়া আনিয়াছে নজরবন্দিকে দিবে। আরও কতকগুলি কলি সে আনিয়াছে, পণ্ডিতের বাড়িতে প্রতিবেশীদের বাড়িতে বিলাইবে। দুই দিন পরেই অশোক-ষষ্ঠী। অশোকের কলি চাই। নলিন অভ্যাসমত কথা না বলিয়া ঘাড় নাড়িয়া জানাইল-হ্যাঁ, অশোকের কলি।
দিয়ে যা তো, বাবা। একটা ডাল দিয়ে যা তো।
নলিন অশোকের কয়েকটি ফুল নামাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।
শ্ৰীহরি বলিল—আমার পুকুরপাড়ের বাগানেও অশোকের চারা লাগিয়েছি।
সে একটা পুকুর কাটাইয়াছে। তাহার পাড়ে শখ করিয়া নানাজাতীয় গাছ লাগাইয়াছে। সবই প্রায় ভাল ভাল কলমের চারা।
২২. অশোক-ষষ্ঠীর দিন
অশোক-ষষ্ঠীর দিন। এই ষষ্ঠী যাহারা করে, তাহাদের সংসারে নাকি কখনও শোক প্রবেশ করে। না। হারালে পায়, মলে জীয়োয়। অর্থাৎ কোনো কিছু হারাইয়াও হারায় না, হারাইলে ফিরিয়া পায়—মরিলেও মরে না, পুনরায় জীবিত হয়, অশোক-ষষ্ঠীর কল্যাণে। মেয়েরা সকাল হইতে উপবাস করিয়া আছে। ষষ্ঠীদেবীর পূজা করিয়া ব্ৰত-কথা শুনিবে, অশোক ফুলের আটটি কলি খাইবে। প্রসাদী দই-হলুদ মিশাইয়া–তাহারই ফোঁটা দিবে ছেলেদের কপালে। তারপর খাওয়া-নাওয়া; সে সামান্যই। অন্নগ্ৰহণ নিষেধ।
বার মাসে তের ষষ্ঠী। মাসে মাসে স্বৰ্গ হইতে আসে ষষ্ঠীদেবীর নৌকা, বার মাসে তের রূপে তিনি মর্ত্যলোকে আসেন পৃথিবীর সন্তানদের কল্যাণের জন্য। সিঁথিতে ডগমগ করে সিঁদুর, হাতে শাখা, সর্বাঙ্গে হলুদের প্রসাধন, ডাগর চোখে কাজল। পরের সাত পুতকে কোলে রাখেন, নিজের সাত পুত থাকে পিঠে। বৈশাখ মাসে চন্দন-ষষ্ঠী, জ্যৈষ্ঠে অরণ্য-ষষ্ঠী, আষাঢ়ে বাঁশ-ষষ্ঠী, শ্রাবণে লুণ্ঠন বা লোটন-ষষ্ঠী, ভাদ্রে চর্পটা বা চাপড়-ষষ্ঠী, আশ্বিনে দুর্গাষষ্ঠী, কার্তিকে কালী-ষষ্ঠী, অগ্রহায়ণে অখণ্ড-ষষ্ঠী-সংসারকে অখণ্ড পরিপূর্ণ করিয়া দিয়া যান, পৌষে মুলা-ষষ্ঠী, মাঘে শীতলা-ষষ্ঠী, ফাল্গুনে গোবিন্দ-ষষ্ঠী, চৈত্রে অশোক তরু যখন ফুলভারে ভরিয়া ওঠে, তখন শোক-দুঃখ মুছিতে আসেন মা অশোক-ষষ্ঠী। তারই কল্যাণ-স্পর্শে আনন্দে সুখে ওই ফুলভরা অশোক গাছের মতই সংসার হাসিয়া ওঠে। অশোকের পর আছে নীলষষ্ঠী। গাজন-সংক্রান্তির পূর্বদিন। তিথিতে ষষ্ঠী না হইলেও–ওই দিন হয় নীলষষ্ঠী।
পদ্ম সকালবেলা হইতে গৃহকর্ম সারিয়া ফেলিবার জন্য ব্যস্ত। কাজ সারিয়া স্নান করিবে, ষষ্ঠীর পূজা আছে, ব্ৰত-কথা শুনিতে যাইবে বিলুর বাড়ি। তারপর অশোকের কলি খাইতে হইবে। তাহার আবার মন্ত্র আছে। এহেন দিনে আবার অনিরুদ্ধ কাজের ঝাঁট বাড়াইয়া দিয়াছে। কামারশালা মেরামতে লাগিয়াছে। হাপর, নেয়াই, হাতুড়ি, সঁড়াশি ইত্যাদি লইয়া টানাটানি শুরু করিয়াছে। কামারশালার বহুকালের পুরনো ঝুল-কালি-কয়লা সাফ করা একদণ্ডের কাজ নয়। ইহার উপর কয়লার সঙ্গে মিশিয়া আছে লোহার টুকরা ছুতারের ব্রেদায় চাচিয়া তোলা কাঠের অ্যাঁশের মত পাতলা কোঁকড়ানো লোহাগুলি সাংঘাতিক জিনিস, বিধিলে বড়শির মত বিধিয়া যাইবে। ঝাঁটা দিয়া পরিষ্কার করিয়া আবার গোবর-মাটি প্ৰলেপে নিকাইতে হইবে।
পদ্মের সঙ্গে তারিণীর সেই ছেলেটাও কাজ করিতেছিল। ছেলেটিকে যতীন খাইতে দেয়। দুই-একটা কাজকর্ম অবশ্য ছেলেটা করে, কিন্তু অহরহই পদ্মের কাছে থাকে। অনিরুদ্ধ দুইএকটা ধমক দিলেও ছেলেটা আর বিশেষ কিছু বলে না। বিপদ হয় ঘোড়াটা বাহিরে গেলেই। বাহিরে গেলে আর সহজে ফেরে না। যতীন উহাকে দিয়া দেবুকে কোনো খবর পাঠাইলে দেবু আসে, কথাবার্তা কহিয়া চলিয়া যায়–কিন্তু ছেলেটার পাত্তা আর পাওয়া যায় না। অবশেষে একবেলা পার করিয়া খাইবার সময় ফেরে। কোনো কোনোদিন হরিজন-পাড়া, কি কোনো বনজঙ্গল খোঁজ করিয়া ধরিয়া আনিতে হয়। সে পদ্মই আনে।
