রাঙাদিদি আর সাহস করিল না। গ্রামের কাহাকেও সে ভয় করে না, কিন্তু শ্ৰীহরিকে সে সম্প্রতি ভয় করিতে আরম্ভ করিয়াছে। বৃদ্ধা ঠুকটুক করিয়া চলিয়া গেল। যাইতে যাইতে ডাকিল-দেবু, বাড়ি আয়। ছেলেটা কাঁদছে তোর।
মিথ্যা বলিয়া সে দেবুকে ডাকিল। যে মানুষ দেবু! আবার কোথায় শ্রীহরির সঙ্গে কি হাঙ্গামা করিয়া বসিবে! আর ছেলেটা যত হাঙ্গামা করিতেছে তত সে যেন তাহাকে দিন দিন বেশি করিয়া ভালবাসিতেছে।
দেবু কিন্তু রাঙাদিদির ডাক শুনিল না। সে শ্ৰীহরিকে বলিল—ভাল শ্রীহরি, তুমি এখন কি করতে চাও শুনি?
–মানে?
—মানে, এদের যদি চুরি করেছে বলে চালান দিতে চাও, দাও। আর যদি তালপাতার দাম নিতে চাও, নাও। দশখানা তালপাতায় ডোমেরা একখানা তালপাতার চ্যাটাই দেয়। দাম তার
দু-পয়সা। সেই এক আনা কুড়ি হিসাবে দাম দেবে ওরা!
—তা হলে ঝগড়াই করতে চাস তোরা? কি রে? শ্ৰীহরি প্রশ্ন করিল হরিজনদের।
–আজ্ঞে?
দেবু বলিল–গুনে ফেল, কার কত তালপাতা আছে, গুনে ফেল।
সকলে তালপাতা গুনিতে আরম্ভ করিল।
মুহূর্তে শ্ৰীহরি ভীষণ হইয়া উঠিল। হিংস্র ক্রুদ্ধ গৰ্জনে সে এক হক মারিয়া উঠিল—বো! রাষ্য তালপাতা!
তাহার আকস্মিক দুর্দান্ত ক্ৰোধের এই সশব্দ প্রকাশের প্রচণ্ডতায় সকলে চমকিয়া উঠিল। হরিজনেরা তালপাতা ছাড়িয়া সরিয়া দাঁড়াইল, কেবল পাত তালপাতা ছাড়িয়াও সেইখানেই দাঁড়াইয়া রহিল। ভবেশ, হরিশ শ্রীহরির পাশেই বসিয়াছিল, তাহারা চমকিয়া উঠিল। হরেন। ঘোষাল প্ৰায় অ্যাঁতকাইয়া উঠিয়াছিল। সে কয়েক পা সরিয়া গিয়া বিস্তারিত চোখে শ্ৰীহরির দিকে চাহিয়া রহিল। দেবু চমকিয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু পরমুহূর্তেই আত্মসংবরণ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। বাউরি ও বায়েনদের কাছে আগাইয়া আসিয়া সে দৃঢ়কণ্ঠে বলিল—থাক্ তালপাতা পড়ে, উঠে আয় তোরা ওখান থেকে। আমি বলছি, ওঠ!
সকলে একবার তাহার মুখের দিকে চাহিল—তাহার শীর্ণ মুখখানির সে এক অদ্ভুত তেজোদীপ্ত রূপ। সে দীপ্তির মধ্যে বোধ করি তাহারা অভয় খুঁজিয়া পাইল। তাহারা সঙ্গে সঙ্গে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বাহির হইবার জন্য পা বাড়াইল।
শ্ৰীহরি ডাকিল-ভূপাল! আটক কর বেটাদের।
দেবু তাহার দিকে চাহিয়া একটু মৃদু হাসিল, তারপর পাতুদের বলিল–যে যার এখান থেকে চলে যা। আমার গায়ে হাত না দিয়ে কেউ তোদের ছুঁতে পারবে না।
হরেন ঘোষাল দ্রুতপদে সকলের অগ্রগামী হইয়া পথ ধরিয়া বলিল–চলে আয়।
সকলের শেষে চণ্ডীমণ্ডপ হইতে নামিয়া আসিল দেবু।
শ্ৰীহরির পিঙ্গল চোখ দুইটি ক্রুর শনিগ্রহের মত হিংস হইয়া উঠিল।
ঠিক ওই মুহূর্তেই রাস্তার উপর হইতে কে উচ্চকণ্ঠে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে বলিয়া উঠিল—হরি হরি বল ভাই, হরি হরি বল! বলিয়াই হো-হো করিয়া এক প্রচণ্ড উচ্চহাস্যে সব যেন ভাসাইয়া দিল।
সে অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধ হাততালি দিয়া উচ্চহাসি হাসিয়া যেন নাচিতে লাগিল। শ্ৰীহরির এই অপমানে তাহার আনন্দের সীমা ছিল না।
শ্ৰীহরি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একটা ক্রুদ্ধ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। ভবেশ, হরিশ প্রভৃতি প্রবীণ মাতব্বর যাহারা তাহার অনুগত তাহারাও এ ব্যাপারে স্তম্ভিত হইয়া লে। কিছুক্ষণ পর ভবেশই প্রথম কথা বলিল—ঘোর কলি, বুঝলে হরিশখুড়ো!
শ্ৰীহরি এবার বলিল—আমাকে কিন্তু আর আপনারা দোষ দেবেন না।
হরিশ বলিল—দোষ আর কি করে দিই ভাই; স্বচক্ষে তো সব দেখলাম।
–ভূপাল! শ্ৰীহরি ভূপালকে ডাকিল।
–আজ্ঞে?
–তোমার দ্বারা কাজ চলবে না, বাবা।
–আজ্ঞে? ভূপাল মাথা চুলকাইতে আরম্ভ করিল।
ভবেশ বলিল—এতগুলো লোকের কাছে ভূপাল কি করত, বাবা ছিহরি! ও বেচারার দোষ
কি?
–আজ্ঞে তার ওপর আমি চৌকিদার, ফৌজদারি আমি কি করে করি? আপনি ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর। আপনিই বলুন হুজুর।
শ্ৰীহরি বলিল—তুই একবার কঙ্কণায় যা। বাড়ুয্যেবাবুদের বুড়ো চাপরাসী নাদের শেখের কাছে যাবি। তাকে বলবি—তোমার ছেলে কালু শেখকে ঘোষ মশায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও; ঘোষ মহাশয় রাখবেন।
—কালু শেখ? সভয়ে সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল ভবেশ।
–হ্যাঁ, কালু শেখ।
নাদের শেখ এককালের বিখ্যাত লাঠিয়াল; কালু তাহার উপযুক্ত পুত্র। তরুণ জোয়ান, শক্তিশালী, দুর্দান্ত সাহসী। দাঙ্গা করিয়া সে একবার কিছুকাল জেল খাঁটিয়াছে; তারপর ডাকাতি অপরাধের সন্দেহে চালান গিয়াছিল, কিন্তু প্রমাণ অভাবে খালাস পাইয়াছে। কালু শেখ ভয়ঙ্কর জীব।
শ্ৰীহরি বলিল—অন্যায় আমি করব না, হরিশ-দাদা। কারু অনিষ্টও আমি করতে চাই না। কিন্তু আমার মাথায় যে পা দেবে, তাকে আমি শেষ করব—সে অন্যায়ই হোক আর অধৰ্মই
হোক।
আবার কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল এই ছোটলোকের দলবর্ষায় আমি ধান দিই তবে খায়—আজ আমাকে অমান্য করে উঠে গেল! ওই দেবু ঘোষ, সেটেলমেন্টের সময় আমি ওর জমিজমা সমস্ত নির্ভুল করে লিখিয়েছি, দুবেলা খোঁজ করেছি ওর ছেলের, পরিবারের। জান, হরিশ-দাদাফের যাতে ওর ইস্কুলের কাজটি হয়—তার জন্যেও চেষ্টা করেছিলাম। প্রেসিডেন্টকেও বলেছি।
ভবেশ বলিল-কলিতে কারু ভাল করতে নাই, বাবা!
—কাল হয়েছে ওই নজরবন্দি ঘোড়া। ও-ই এইসব করছে। কামার-বউটাকে নিয়ে ঢলালি করছে। আর ওই শালা কর্মকার কথা বলিতে বলিতে শ্ৰীহরি নিষ্ঠুর হইয়া উঠিল। নেমকহারামের গ্রাম। এক এক সময় মনে হয়—এ গায়ের সর্বনাশ করে দিই!
হরিশ বলিল–তা বললে চলবে ক্যানে ভাই! ভগবান তোমাকে বড় করেছেন, ভাণ্ডার দিয়েছেন, তোমাকে করতে হবে বৈকি! এ কথা তোমাকে সাজে না।
