কেহ সাড়া দিল না। বিরক্ত হইয়া বৃদ্ধা বাড়ি ঢুকিল বলি কানের মাথা খেয়েছিস নাকি তোরা! অ দেবু?
বিলু বাহির হইয়া আসিল—কে, রাঙাদিদি!
—আমার মতন কানের মাথা খেয়েছিল; চোখের মাথা খেয়েছি? শুনতে পায় না? দেখতে পাস না?
বিলু ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসিল, এ কথার কোনো উত্তর দিল না। বুঝিল রাঙাদিদি বেজায় চটিয়াছে।
—সেই ছোঁড়া কই? দেবা?
–বাড়িতে নেই, রাঙাদিদি।
–কি বলি চেঁচিয়ে বল। গাড়ি কোথা গেল আবার?
–গাড়িতে নয়। বাড়িতে নেই। চণ্ডীমণ্ডপে গেল।
–চণ্ডীমণ্ডপে?
–হ্যাঁ।
–আচ্ছা। সেখানে যাচ্ছি আমি। বিচার হয় কি না দেখি। ভালই হল, দেবুও আছে–ছিও আছে। কান ধরে নিয়ে আসুক হারামজাদাকে। এত বড় বড় হয়েছে! ধৰ্ম্ম নাই, বিচার।
নাই?
বুড়ি বকিতে বকিতে চলিল চণ্ডীমণ্ডপের দিকে।
চণ্ডীমণ্ডপে তখন জমজমাট মজলিস।
ভুপাল বান্দী লাঠি হাতে দাঁড়াইয়া আছে। ষষ্ঠীতলায় মাথায় হাত দিয়া বসিয়া আছে পাতু, রাখহরি, পরী, বাকা, ছিদাম, ফড়িং আরও জনকয়েক। পাশে পড়িয়া আছে কয়েক অ্যাঁটি তালপাতার বোঝা। ময়ূরাক্ষীর বন্যারোধী বধ জমিদারের সম্পত্তি; সেখানকার তালগাছও জমিদারের। সেই গাছ হইতে পাতা কাটার অপরাধে ভূপাল সকলকে ধরিয়া আনিয়াছে। শ্ৰীহরি গম্ভীর মুখে গড়গড়া টানিতেছে। দেবু একধারে চুপ করিয়া বসিয়া আছে, তাহাকে ডাকিয়া আনিয়াছে পাতুদের দল। হরেন ঘোষাল নিজেই আসিয়াছে; সে প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি। চিৎকার করিতেছে সে-ই।
–ওরা চিরকাল পাতা কেটে আসছে, বাপ-পিতামহের আমল থেকে। ওদের স্বত্ব জন্মিয়ে গেছে।
ঘোষালের কথায় শ্রীহরি জবাবই দিল না। পাতুসে বহুদিন হইতেই শ্রীহরির সঙ্গে মনে মনে একটি বিরোধ পোষণ করিয়া আসিতেছে—সে একটু উষ্ণভাবেই বলিল-পাতা তো চিরকাল কেটে আসা যায়, মাশায়। এ তো আজ নতুন নয়!
চিরকাল অন্যায় করে আসছিলি বলে আজও অন্যায় করবি গায়ের জোরে? কাটিস, সেটা চুরি করে কাটিস।
দেবু এতক্ষণে বলিল—চুরি একে বলা চলে না শ্ৰীহরি! আগে জমিদার আপত্তি করত না, ওরা কাটত। এখন তুমি গোমস্তা হিসাবে আপত্তি করবেশ, আর কাটবে না। এরপর যদি না বলে কাটে, তখন চুরি বলতে পারবে।
ঘোষাল বলিলনো, নেভার। ও তুমি ভুল বলছ, দেবু। গাছের পাতা কাটবার স্বত্ব ওদের আছে। তিন পুরুষ ধরে কেটে আসছে। তিন বছর ঘাট সরলে, পারে কেউ সে ঘাট বন্ধ করতে না পথ বন্ধ করতে?
হাসিয়া শ্ৰীহরি বলিল গাছ ওটা, পুকুর নয় ঘোষাল, পথও নয়।
—ইয়েস, গাছ ইজ গাছ এন্ড পথ ইজ পথ; বাট ম্যান্ ইজ ম্যান্ আফটার অল্।
—কাল যদি জমিদার গাছগুলি বেচে দেয়, ঘোষাল, কি কেটে নেয়, তখন পাতার অধিকার থাকবে কোথা? বাজে বোকো না। শুধু খাস-খামারের গাছ নয়, মাল জমির ওপরের গাছ পর্যন্ত জমিদারের প্রজা ফল ভোগ করতে পারে, কিন্তু কাটতে পারে না।
দেবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল, তাহার বুকের মধ্যে মুহুর্তে জাগিয়া উঠিল একটা বিস্তৃত ক্ষোভ। তাহাদের খিড়কির ঘাটে একটা কাঠাল গাছ ছিল, কাঁঠাল অবশ্য পাকিত না, কিন্তু ইচড় হইত প্রচুর। তাহার আবছা মনে পড়ে, আসবাব তৈরি করিবার জন্য জমিদার ওই গাছটি কাটিয়াছিল। কিছু দাম নাকি দিয়াছিল, কিন্তু প্রথমে তাহার বাপ আপত্তি করায় ওই আইনবলে জোর করিয়া কাটিয়াছিল। কতদিন তাহার বাবা আক্ষেপ করিত—আঃ, ইচড় হল গাছপাঠা। আর স্বাদ কি ইঁচড়ের!
দেবু বলিলতা হলে তাই কর, শ্ৰীহরি, গাছগুলো সব কেটে নাও। প্রজারা ফল খাবে না।
শ্ৰীহরি হাসিল—তুমি মিছে রাগ করছ, দেবু খুড়ো। ওটা আমি, আইনের কথা, কথায় বললাম। জমিদার তা করবেন কেন? তবে প্রজা যদি রাজার সঙ্গে বিরোধ করে, তখন আইনমত চলতে রাজারই বা দোষ কি? বেআইনি বা অন্যায় তো হবে না।
–কিন্তু এ গরিব প্রজারা কি বিরোধ করলে শুনি? হঠাৎ এদের এরকম ধরে আনার মানে?
–ওদের জিজ্ঞেস কর। ওই প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি বাবুকে জিজ্ঞেস কর।
তারপর হরিজনদের দিকে চাহিয়া শ্ৰীহরি বলিল—কি রে? চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়াতে পয়সা নিবি না তোরা?
কথাটা এতক্ষণে স্পষ্ট হইল। সকলে স্তব্ধ হইয়া গেল। কি; সকলেই অন্তরে অন্তরে একটা জ্বালা অনুভব করিল। সর্বাপেক্ষা সেটা বেশি অনুভব করিল দেবু। তালপাতার মূল্য এবং চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়ানোর মজুরির অসঙ্গতি তাহার হেতু নয়; তাহার হেতু সমগ্র ব্যাপারটার মধ্যে শ্ৰীহরির ভঙ্গি।
রাঙাদিদি খানিকক্ষণ আগে এখানে আসিয়া ব্যাপার দেখিয়া-শুনিয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। কানে ভাল শুনিতে পায় না, কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া ব্যাপারটা সে বুঝিল। তারপর বলিল–হ্যাঁ ড্যাক্রা, তোরা চণ্ডীমণ্ডপ ছাওয়াবি না? আস্পদ্দা দেখ, মাগো কোথা যাব!
হরেন ঘোষাল সুযোগ পাইয়া রাঙাদিদিকে ধমক দিল—যা বুঝ না, তা নিয়ে কথা বোলো না রাঙাদিদি। চণ্ডীমণ্ডপ এখন কার? চণ্ডীমণ্ডপ থাকল না থাকল তা ওদের কি? ওদের তো ওদের গাঁয়ের লোকেরই বা কি অধিকার আছে? চণ্ডীমণ্ডপ জমিদারের। চণ্ডীমণ্ডপ নয়, এটা এখন জমিদারের কাছারি!
—তা রাজারও যা পেজারও তাই। রাজার হলেই পেজার। দেবু হাসিয়া বেশ জোর গলাতেই বলিল—সে তো ওই তালপাতাতেই দেখছ, রাঙাদিদি।
কে? দেবু? হ্যাঁ।
তা বটে ভাই। তা জঁ ডিহরি, তালপাতা বৈ তো লয়! তা যদি ওরা রাজার না লেবে তো পাবে কোথা?
শ্ৰীহরি অত্যন্ত রূঢ়ভাবে ধমক দিল—যাও, যাও, তুমি বাড়ি যাও। এসব কথায় তোমায় কথা বলতে কেউ ডাকে নাই। বাড়ি যাও।
