আখনার জিহ্বার একটু জড়তা আছে, স্পষ্ট কথা বাহির হয় না।
আখনাকে দুইটা কাক আক্ৰমণ করিয়াছে। মাথার উপর কা-কা করিয়া উড়িতেছে আর ঠোঁট দিয়া ঠোকর মারিতেছে। গাছটায় কাকের বাসা আছে। ওপাশে পরী, স্বামীকে গাল পাড়িতেছে ড্যাকরা বাঁশবুকোকে দশবার যে মানা করলাম, কাগের বাসা আছে, উঠি না! কেমন হইছে–বলিতে বলিতে আখনার বিব্রত অবস্থা দেখিয়া সে খিলখিল করিয়া হাসিয়া সারা হইল।
দূরে দুম করিয়া একটা শব্দ উঠিল। সর্বনাশ! কে পড়িয়া গেল? ওঃ, ভাদ্র মাসের পাকা তালের মত পড়িয়াছে। ফাটিয়া গেল না তো? না, মরে নাই, নড়িতেছে। যাক উঠিয়া বসিয়াছে। বাপ রে! আচ্ছা শক্ত জা! নদীর ধারের ভিজা মাটি—তাই রক্ষা! কিন্তু লোকটা কে?
—কে বটিস রে?
লোকটা উঠিয়া পঁড়াইয়া জবাব দিল—সাপ!
–সাপ?
—খরিশ। যেমন ইদিকের পাতায় উঠতে যাব-অমনি শালা—ফেঁস করে ফণা নিয়ে উঠেছে উদিকের পাতায়। কি করব, লাফিয়ে পড়লাম।
ফড়িং বাউরি। ছোঁড়া খুব শক্ত। খুব বাঁচিয়াছে আজ। সাপটা পাখির ডিমের সন্ধানে খেঙো বাহিয়া গাছে উঠিয়াছে।
—ওরে বাবা! পাতুরও জ্বালা কম নয়, একটা পাতা কাটিতেই অসংখ্য পিঁপড়ে বাহির হইয়া তাহার সর্বাঙ্গে ঘঁকিয়া ধরিয়াছে। পাতু গামছাটা খুলিয়া গামছার আছাড়ে সেগুলিকে ঝাড়িয়া ফেলিতে আরম্ভ করিল। দূর শালা, দূর! ধ্যেৎ! ধ্যেৎ! ধ্যেৎ!
***
দুৰ্গা আয়না দেখিয়া নরুন দিয়া দাঁত চাঁচিতেছিল। পরিষ্কার-পরিষ্কার দুর্গার একটা বাতিক। তাহার দাঁতগুলি শাঁখের মত ঝকঝক করা চাই। মধ্যে মধ্যে দাঁতে একটু আধটু পানের ছোপ পড়ে, খুব ভাল করিয়া দাঁত মাজিলেও যায় না। তখন সে তরুন দিয়া সেই ছোপের দাগ চাচিয়া তুলিয়া ফেলে। বউ ফিরিলেই সে বউকে লইয়া পাতা বহিয়া আনিতে যাইবে। হাঙ্গামা অনেক মাথায় চুলে ময়লা লাগিবে, সর্বাঙ্গ ধুলায় ভরিয়া যাইবে, কাপড়খানা আর পরা চলিবে না। কিন্তু তবু উপায় কি? মায়ের পেটের ভাই।
মা বলিলবউ রোজগার করছে, কখুনো একটা পয়সা দেয় আমাকে শাশুড়ি বলে ছেদ্দা করে?
দুর্গা হাসিয়া বলিল-থাক মা, আর বলিস না; ওই পয়সা ছুঁতে হয়?
মা এবার ঝঙ্কার দিয়া উঠিল—ওললা সীতের বেটি সাবিত্তিরি আমার। তারপর সে আরম্ভ করিল তিন কালের কথা, তাহার নিজের মা-শাশুড়ির আমলের শ্রুতিকথা, নিজেদের কালের স্মৃতিকথা, বর্তমান যুগের প্রত্যক্ষ বধূ-কন্যার বিবরণ-কাহিনী। অবশেষে বলিলবউ হারামজাদী সাবিত্তির, তখন ফণা কত? কত বলেছিলাম, তা নাক ঘুরিয়ে তখন বলত ছি! এখন
তো সেই ছি তপ্তভাতে ঘি হইছে। সেই রোজগারে প্যাট চলছে, পরন চলছে।
পাড়ার ভিতর হইতে কে গালি দিতে দিতে আসিতেছিল। দুর্গা বলিলথাম মা, থাম, আর কেলেঙ্কারি করিস না। নোক আসছে।
চিৎকার করিয়া গালি দিতেছিল রাঙাদিদি।
হবে না, দুগ্রগতি হবে না, আরও হবে। এরপর বিনি ঝড়ে উড়ে যাবে, বিনি আগুনে পুড়ে যাবে। ধানের ভেতর চাল থাকবে না, শুধু আগরা হবে।
দুৰ্গা হাসিয়া প্রশ্ন করিলকি হল রাঙাদিদি?
রাঙাদিদি সেই সুরের ঝঙ্কার দিয়া উঠিল—ধৰ্ম্মকে সব পুড়িয়ে খেলে মা। পিরথিমিতে ধৰ্ম্ম বলে আর রইল না কিছু।
চিৎকার করিয়া দুর্গা বলিল—কি হল কি? কে কি করলে?
—ওই গাঁদা মিনসে গোবিন্দে। এতকাল দিয়ে এসে আজ বলছে–না।
–কি?
—কি? ক্যানে, তুই আবার বেলাত থেকে এলি নাকি? পাড়ার নোক জানে, গায়ের নোক জানে, তুই জানিস না? বলি তুই কেলা ঘুড়ি? একে তো চোখে দেখতে পাই না, তার ওপর মুখপোড়া সুয্যির রোদের ছটা দেখ ক্যানে? চিনতে পারছি, তুই কে?
—আমি–দুগ্গা গো!
—দুগ্গা? মরণ! আপন ঠেকারেই আছিস। পরের কথা মনে থাকে না-ক্যানে? গোবিন্দের বাবা আমার কাছে দু টাকা ধার নিয়েছিল—জানিস না? বুড়ো ফি মাসে দু আনা সুদ আমাকে দিয়ে আসত। তা ছাড়া যখন ডেকেছি, তখনই এসেছে। ঘরে গোঁজা দিয়েছে, বর্ষায় নালা ছাড়িয়ে দিয়েছে। সে মল, তারপর গোবিন্দ দশ-বার বছর মাসে মাসে সুদ দিয়েছে, ডাকলে। এসেছে। আজ ডাকতে এলাম, তা বলে কিনা—মোল্লান, অনেক দিয়েছি, আর সুদও দোব না, আসলও দোব না, বেগারও দোব না। আমি চললাম দেবুর কাছে! চার পো কলি, মা! এখন যদি সবাই এই বলে তো আমার কি দুগ্গতি হবে।
এমন খাতক বৃদ্ধার অনেকগুলি আছে, অন্তত দশ-বার জন, দুই কুড়ির উপর টাকা পড়িয়া আছে। পুরুষানুক্রমে তাহারা সুদ গনিয়া যাইতেছে, বৃদ্ধা মরিলে আর আসল লাগিবে না। তবে এমন মহাজন গ্রামে আরও কয়েকজন আছে। সকলেই প্ৰায় স্ত্রীলোক এবং তাহাদের ওয়ারিশ আছে। আসলে ইহাদের ঋণআইনের ধারাই এমনি।
বৃদ্ধা যাইতে যাইতে আবার পাঁড়াইল—বলি দুগ্গা শোন!
—কি বল?
–একজোড়া মাকুড়ি আছে, লিবি? সোনার মুকুড়ি!
–মাকুড়ি? কার মাকুড়ি? কার জিনিস বটে?
–আয় আমার সঙ্গে। খুব ভাল জিনিস। জিনিস একজনার বটে, কিন্তু সে লেবে না। তা। মাকুড়ি কি করব আমি? তু লিস তো দেখ।
–না দিদি, আজ হবে না। আজ এখন তালপাতা আনতে যাব।
–মরণ, তুই আবার তালপাতা নিয়ে কি করব?
–আমার নয়, দাদার লেগে।
–ওরে দাদা-সোহাগী আমার! দাদার লেগে ভেবে ভেবে তো মরে গেলি! বুড়ি আপন মনেই বকবক করিতে করিতে পথ ধরিল। কিছুদূর গিয়া একটা গর্তের কাদায় পড়িয়া বৃদ্ধা মেঘকে গাল দিল, ইউনিয়ন বোর্ডের ট্যাক্স আদায়কারীকে গাল দিল, কয়েকটা ছেলে কাদা লইয়া। খেলিতেছিল—তাহাদের চতুর্দশ পিতৃপুরুষকে গাল দিল। তারপর জগন ডাক্তারের ডাক্তারখানার সম্মুখে ওষুধের গন্ধে নাকে কাপড় দিয়া ওষুধকে গাল দিল, ডাক্তারকে গাল দিল, রোগকে গাল দিল, রোগীকে গাল দিল। টাকা মারা যাইবার আশঙ্কায় বৃদ্ধা আজ ক্ষিপ্ত হইয়া উঠিয়াছে। দেবুর বাড়ির কাছে আসিয়া ডাকিল–দেবু পণ্ডিত!
