চাকরান-জমিও পাতুর গিয়াছে, সে-জমি এখন জমিদারের খাসখতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত। জমিটা পাতু নিজেই ছাড়িয়া দিয়াছে। না দিয়াই বা উপায় কি ছিল? তিন বিঘা জমি লইয়া বার মাস পালপার্বণে ঢাক বাজাইয়া কি হইবে? যে দিন বাজাইতে হইবে সেই দিনটাই মাটি। তার চেয়ে সে বরং নগদ মজুরিতে এখানে ওখানে বাজনা বাজাইয়া আসে সে ভাল। বায়না থাকিলে পরিষ্কার কাপড়ের উপর চাদর বাঁধিয়া ঢাক কাঁধে লইয়া পাতু বাহির হয়, ফিরিয়া আসে দুইএকটি টাকা লই; উপরন্তু দুই-একটা পুরনো জামাকাপড়ও লাভ হয়। প্রায় বারটা মাসই সে এখন বেকার। জনমজুর খাঁটিতেও পরে না! বাদ্যকর-বায়েন বলিয়া তাহার একটি সম্ভ্রম আছে, সে জনমজুর খাঁটিবে কেমন করিয়া? বসিয়া বসিয়া সে ভাগাড় বন্দোবস্ত লওয়ার কথাটাই ভাবে। তাহার চেয়েও ভাল হয় যদি চামড়ার ব্যবসা করিতে পারে। তাহাদেরই স্বজাতি নীলু বায়েন এখন অবশ্য নীলু দাস-চামড়ার ব্যবসা করিয়া লক্ষপতি ধনী হইয়াছে। এখন সে কলিকাতায় থাকে, মস্ত বড় চামড়ার ব্যবসা। মস্ত বাড়ি করিয়াছে, বাড়িতে ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। সেসব দেখিবার জন্য এম-এ, বিল-এল পাস করা একজন সরকারি হাকিম সরকারি চাকরি ছাড়িয়া তাহার ম্যানেজারি করিতেছে। প্রকাণ্ড বসতবাড়ি, হাওয়া-গাড়ি, ঠাকুর-বাড়ি আছে। দেশে আপনার গ্রামে কঙ্কণার বাবুদের মত ইস্কুল ও হাসপাতাল করিয়া দিয়াছে। তাহার ছেলে নাকি লাটসাহেবের মেম্বার। পাতু চামড়া ব্যবসায় ও ভাগাড় বন্দোবস্ত লইবার কল্পনা করে, সঙ্গে সঙ্গে এমনি ঐশ্বর্যের স্বপ্ন দেখে!
বার মাস জীবন ধারণের ব্যবস্থা করে তাহার স্ত্রী এবং দুর্গা। যে পাতু একদা দুর্গাকে কঠিন ক্ৰোধে লাঞ্ছিত করিয়াছিল—ছিরু পালের প্রতি প্রীতির জন্য, সেই পাতু হরেন ঘোষালের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও ছেলেটাকে ভালবাসে দিনরাত আদর করে। মধ্যে মধ্যে ঘোষালের কাছে যায়, আবদার করিয়া বলে-আজ চার আনা পয়সা কিন্তু দিতে হবে, ঘোষালমশায়!
দুর্গা নৈশ অভিসারে যায় কঙ্কণায়, জংশনে। প্রতীক্ষমাণ ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করে—সঙ্গে কে ও? অন্ধকারের অস্পষ্ট মূর্তিটি সরিয়া যায়, দুর্গা বলেও আমার সঙ্গে এসেছে।
—কে?
–আমার দাদা।
অস্পষ্ট মূৰ্তি হেঁট হইয়া নীরবে নমস্কার করে।
দুর্গা বলে—একটা সিগারেট দেন, ও ততক্ষণে বসে বসে খাক।
বাবুদের বাগান-বাড়ির কোনো গাছতলায় অথবা বারান্দায় সিগারেটের আগুনের আভায় পাতুকে তখন চেনা যায়। আসিবার সময় সে একটা মজুরি পায়চার আনা হইতে আট আনা; দুর্গা আদায় করিয়া দেয়।
সেদিন পাতু মনস্থির করিয়া বারবার দুর্গাকে বলিল—সঁচিশ টাকা বৈ তো লয়! দে না দুৰ্গ, ভাগাড়টা জমা নিয়ে লি।
দুর্গা বলিল—সে হবে। আজ এখুনই দুটো গাছের তালপাতা কেটে আগা দিকি, ঘরটা তো ঢাকতে হবে।
এই তাহাদের চিরকালের ব্যবস্থা। উড়িলে কি পুড়িলে ঘরের জন্য ইহারা ভাবে না। পুড়িলে কাঠ-বাঁশের জন্য তবু ভাবনা আছে; উড়িলে সেটা ইহারা গ্রাহ্য করে না। মাঠে খাস-খামারের পুকুরের পাড়ের অথবা নদীর বাঁধের উপরের তালগাছ কাটিয়া আনিয়া ঘর ছাইয়া ফেলে। শুধু পুরুষদের ফিরিবার অপেক্ষা কাজ হইতে ফিরিয়া তাহারা গাছে উঠিয়া পাতা কাটিবে, মেয়েরা মাথায় তুলিয়া ঘরে আনিবে। দু-চারি জন মেয়েও গাছে চড়িয়া পাতা কাটে। দুর্গাও এককালে তালগাছে চড়িতে পারি, কিন্তু এখন আর গাছে চড়ে না। প্রয়োজনও নাই, তাহার কোঠাঘরের চালে বেশ পুরু খড়ের ছাউনি—মজবুত বাঁধানে বাধা। তাহার চালের খড় কিছু বিপর্যস্ত হইয়াছে, বিশৃঙ্খল হইয়াছে এই মাত্র, উড়িয়া যায় নাই। ওগুলাকে আবার সমান করিয়া বসাইতে অবশ্য গোটা দুয়েক মজুর লাগিবে। এ কাজ পাতুকে দিয়াই হইবে, তাহাকেই বরং দুই দিনের মজুরি দিবে।
দুর্গার কথার উত্তরে পাতু বলিল–হুঁ।
–হুঁ তো ওঠ!
—বউটো আসুক আগে।
–বউ এলে পাঠিয়ে দোব, বউকে মাকে; তুই এখন যা দিক। পাতা কেটে ফেল গা যা।
দুর্গার মা উঠান পরিষ্কার করিতে করিতে বলিলমা লারবে বাছা। তুমি খেতে দিচ্ছ—তোমার তিলশুনো খাটছি, উপায় নাই, আবার বেটার খাটুনি খাটতে আরব আমি। ক্যানে, কিসের লেগে? কখনও মা বলে দু গণ্ডা পয়সা দেয়, না একটুকরা ট্যানা দেয় যে ওর লেগে আমি খাটব?
পাতু হুঙ্কার দিয়া উঠিল—আমরা দিই না তোর কোন্ বাবা দেয় শুনি?
—শুনলি দুৰ্গ, বচন শুনলি খাল্ভরার?
দুর্গা বাধা দিয়া বলিল—থা বাপু তোরা। তোর গিয়েও কাজ নাই, চেঁচিয়েও কাজ নাই। বউ আসুক আমরা দুজনায় যাব। দাদা তু এগিয়ে চল।
কোমরে কাটারি গুঁজিয়া পাতু আসিয়া উঠিল নদীর ধারে। ময়ূরাক্ষীর বন্যারোধী বাঁধটা নদীর সঙ্গে সমান্তরাল হইয়া পূর্ব-পশ্চিমে চলিয়া গিয়াছে। বাঁধের গায়ে সারবন্দি অসংখ্য তালগাছ এবং শরগাছ। পাতু বাছিয়া বাছিয়া ঢলকো পাতা দেখিয়া একটা গাছে চড়িয়া বসিল। ওই খানিক দূরে গাছের উপর আখনা অর্থাৎ রাখহরি বাউরি পাতা কাটিতেছে। তার ওধারের গাছটায়ও কে? পুরুষ নয়, মেয়ে! আখনার বউ পরী? এপাশে ওই গাছটায়ও ওটা কে? পাতু ঠাহর করিতে না পারিয়া ডাকিল—কে রে উখানে?
আমি গণা। অর্থাৎ গণপতি।
–আর কে বটে?
–আমার পাশে বাঁকা, হুই রয়েছে ছিদাম। হুই মতিলাল।
গাছে চড়িয়াই সবার আলাপ-আলোচনা চলিতেছিল। সহসা এদিকে আখনা চিৎকার করিয়া উঠিল হুই? হুস হুই ধা! উঃ! হুস ধা, উঃ! বাবা রে, মেরে ফেলাবে লাগটে! হিশ, ঠোঁটের ঢাড় কি রে বাবা!
