অনিরুদ্ধকে সুস্থ দেখিয়া পদ্মও অবাক হইয়া গেল। অনিরুদ্ধ এবারে ছেলেটাকে বলিল–এখানে কোথা থেকে এসে জুটলি?
হাসিয়া পদ্ম বলিল নজরবন্দি নিয়ে এসেছে আজ জংশন থেকে, বাবুর চাকর হবে।
–হুঁ, যত মড়া গাঙের-ঘাটের জড়ো! দে, এখন খেতে দে দেখি। ঘরে কি আছে?
শুনিবামাত্র পদ্ম সঙ্গে সঙ্গেই উঠিল। যাইতে যাইতে বলিল-জংশন ইস্টিশানে কার কি চুরি করেছিল, লোকে ধরে মারছিল নজরবন্দি ছেলে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
অনিরুদ্ধ বিরক্ত হইয়া উঠিল। কোদিন আবার তাহার বাড়ির কিছু কিংবা ওই নজরবন্দির কিছু চুরি করিয়া না পালায় ছেলেটা। সে রূঢ়স্বরে বলিল—এই ছেড়া, কোথায় চুরি করেছিলি? কি চুরি করেছিলি?
ছোঁড়া ভীত অথচ ক্রুদ্ধ জানোয়ারের মত মাথা হেঁট করিয়া আড়চোখে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, কোনো উত্তর দিল না।
পদ্ম বলিল—কি ধারার মানুষ গো তুমি? নিয়ে এসেছে অন্য একজনা, তোমার বাড়িতে তো আসে নাই ও। তুমি বকছ কেনে বল তো? তা ছাড়া ছেলেমানুষ, অনাথ,ওর দোষ কি? যা রে বাবা, তুই উঠে তোর মুনিবের ওই দিকে যা।
ছোঁড়াটা কিন্তু তেমনি ভঙ্গিতে সেইখানে বসিয়াই রহিল, নড়িল না।
২১. চাষ আর বাস
চাষ আর বাস পল্লীর জীবনে দুইটা ভাগ। মাঠ আর ঘর—এই দুইটি ক্ষেত্রেই এখানে জীবনের সকল আয়োজন সকল সাধনা। আষাঢ় হইতে ভাদ্ৰ—এই তিন মাস পল্লীবাসীর দিন কাটে মাঠে-কৃষির লালন-পালনে। আশ্বিন হইতে পৌষ সেই ফসল কাটিয়া ঘরে তোলে—সঙ্গে সঙ্গে করে রবি ফসলের চাষ। এ সময়টাও পল্লীজীবনের বার আনা অতিবাহিত হয় মাঠে। মাঘ হইতে চৈত্র পর্যন্ত তাহার ঘরের জীবন। ফসল ঝাড়িয়া, দেনা-পাওনা মিটাইয়া সঞ্চয় করে, আগামী চাষের আয়োজন করে; ঘরের ভিতর-বাহির গুছাইয়া লয়। প্ৰয়োজন থাকিলে নূতন ঘর তৈয়ারি করে, পুরনো ঘর ছাওয়ায়, মেরামত করে; সার কাটিয়া জল দেয়, শণ পাকাইয়া দড়ি করে। গল্প-গান-মজলিস করে, চোখ বুজিয়া হরদম তামাক পোড়ায়, বর্ষার জন্য তামাক কাটিয়া গুড় মাখাইয়া হাঁড়ির মধ্যে পুরিয়া জলের ভিতর পুঁতিয়া পচাইতে দেয়। চাষীর পরিবারের যত বিবাহ সব এই সময়ে মাঘ ও ফারুনে। জের বড়জোর বৈশাখ পর্যন্ত যায়। হরিজনদের চৈত্র মাসেও বাধা নাই, পৌষ হইতে চৈত্রের মধ্যেই বিবাহ তাহারা শেষ করিয়া ফেলে।
অকালে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি এই অকাল-কালবৈশাখীর ঝড়জলে সেই বাঁধাধরা। জীবনে একটা ধাক্কা দিয়া গেল। ভোরবেলায় শণের দড়ি পাকানো ছাড়িয়া সবাই মাঠে গিয়া। পড়িল। প্রবীণদের সকলের হাতেই হুঁকা। অল্পবয়সীদের কোঁচড়ে অথবা পকেটে বিড়ি-দেশলাই, কানে আধপোড়া বিড়ি। সকলে আপন আপন জমির চারিপাশের আইলে ঘুরিয়া। বেড়াইতেছে। উচু ডাঙা জমিতে দুই-চারি জন আজই লাঙলের চাষ দিতে আরম্ভ করিয়াছে। নিম্নভূমি—জোলা জমিগুলিতে এখনও জল জমিয়া আছে, দুই-চারি দিন গিয়া খানিকটা না শুকাইলে এসব জমিতে চাষ চলিবে না। ময়ূরাক্ষীর চরভূমিতে তরিতরকারির চারাগুলি মাতৃস্তন্যবঞ্চিত শীর্ণকায় শিশুর মত এতদিন কোনোমতে বাঁচিয়া ছিল। এইবার মহীরাবণের পুত্র অহিরাবণের মত দশ দিনে দশমূর্তি হইয়া উঠিবে। তিলের ফুল সবে ধরিতেছে, জলটায় তিলের খানিকটা উপকার হইবে। তবে অপকারও কিছু হইয়া গেল, যে ফুলগুলি সদ্য ফুটিয়াছিল, এই বর্ষণে তাহার মধু ধুইয়া যাওয়ায় তাহাতে আর ফল ধরিবে না। এইবার আখ লাগানো চলিবে। জলটায় উপকার হইয়াছে অনেক। তবে গ্রামে ঘরবাড়ির ক্ষতি হইয়াছে প্রচুর। তাহার আর কি করা যাবে?
গ্রামের মেয়েরা ঝড়ে বিপর্যস্ত বাড়িঘর পরিষ্কার করিতে ব্যস্ত। কোমরে কাপড় বাঁধিয়া খড়কুটা জড়ো করিতেছে,সমস্ত সারে ফেলিতে হইবে। ছেলের দল আমবাগানে ছুটিয়া সেই ভোরবেলায় কেঁচড় ভরিয়া আমের গুটি কুড়াইতেছে। হরিজনদের মেয়েরা ঝুড়ি কাখে পথেঘাটে-বাগানে—পাতা-খড়-কাঠি শুকনা ডাল-পাতা সংগ্রহ করিয়া প্ৰকাণ্ড বোঝা বধিয়া ঘরে আনিয়া ফেলিতেছে; জ্বালানি হইবে। তাহাদের নিজেদের ঘর-দুয়ার এখনও সাফ হয় নাই। পুরুষেরা যে যার কাজে গিয়াছে। কেহ চাষী-গৃহস্থবাড়ির বাধা কাজে, কেহ জংশনে কলের কাজে, কেহ ভিন-গাঁয়ে দিনমজুরিতে।
দুর্গা আপনার ঘরে বসিয়া ছিল। তাহার কাজ বাঁধাধরা। তাহার বাহিরে সে যায় না। সে এইসব পাতা-কুটা কুড়াইয়া কখনও জ্বালানি করে না। জ্বালানি সে কেনে। ভোরবেলায় একদফা দুধ দোহাইয়া সে নজরবন্দিবাবুকে দিয়া আসিয়াছে; পথে বিলু-দিদিকেও খানিকটা দিয়া, সেইখানেই চা খাইয়া, বাড়ি আসিয়া বসিয়াছে। আগে আগে কিছুদিন সে চা খাইত কামারবউয়ের বাড়িতে; কামার-বউ নজরবন্দিবাবুর চা করিত, নজরবন্দিকে চা দিয়া বাকিটা পদ্ম এবং দুর্গা খাইত। কিন্তু সেদিন পদ্মের সেই রূঢ় কথার পর আর সে কামার-বউয়ের বাড়ির ভিতর যায় না। বাহিরে বাহিরেই নজরবন্দিবাবুর দুধের যোগান দিয়া, দুই-চারটা কাজকর্ম করিয়া দিয়া চলিয়া আসে। নজরবন্দিও আজ কয়েক দিন তাহাকে কোনো কথা বলে নাই। সে বসিয়া বসিয়া ভাবিতেছিল, কাল হইতে সে আর নিজে দুধ দিতে যাইবে না; মাকে দিয়া পাঠাইয়া দিবে। যে মানুষ কথা কয় না, তাহাকে যাচিয়া কথা বলা তাহার অভ্যাস নাই।
দুর্গার মা উঠান সাফ করিতেছিল; বউটা ডাল-পালা-খড়কুটা কুড়াইতে গিয়াছে। পাতু আপনার ছেলেটাকে লইয়া বসিয়া আছে দাওয়ার উপর। লোকে বলে ছেলেটা নাকি দেখিতে অনেকটা হরেন ঘোষালের মত হইয়াছে, কিন্তু তবু পাতু ছেলেটাকে বড় ভালবাসে। বছরখানেকের মধ্যে পাতুর অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটিয়াছে। অবস্থা এবং প্রকৃতি দুয়েরই। পূর্বে পাতু বায়েন বেশ মাতব্বর লোক ছিল। আচারে-ব্যবহারে বেশ একটু ভারিক্কি চাল দেখাইয়া চলিত। তখন পাতুর চালচতি দেখিয়া লোকে হিংসা করিত। ভাগাড়ের চামড়া হইতে তাহাদের ছিল মোটা আয়। চামড়া বেচিত, কতক চামড়া নিজে পরিষ্কার করিয়া ঢোল, তবলা, বায়া, খোল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ছাইয়া দিত। পাতুর ছাওয়া খোল তবলার শব্দের মধ্যে কাসার আওয়াজের মিঠা রেশ বাজিত। এই ভাগাড় হইতেই আসিত তাহার আয়ের বার আনা। বাকি সিকি আয় ছিল চাকরান-জমির চাষ এবং এখানে-ওখানে ঢাকের বাজনা হইতে। ভাগাড়টা এখন হাতছাড়া। হইয়া গিয়াছে। জমিদার টাকা লইয়া বন্দোবস্ত করিয়াছে। বন্দোবস্ত লইয়াছে আলেপুরের রহমৎ শেখ এবং কঙ্কণার রমেন্দ্র চাটুজ্জে।
