আনন্দের আবেগে অনিরুদ্ধ কোনো কথাই শেষ করিতে পারিল না।
–আচ্ছা, পরশু আসি। তা হলে শিগগির বাড়ি যা। মেঘ উঠেছে। ঝড়-জল হবে মনে। হচ্ছে। চৌধুরী চলিয়া গেল।
মেয়েটি বলিল—তুমি খাও নাই এখনও?
—তা হোক। এই কতক্ষণ! বো বে করে চলে যাব।
–এই বাতাসা কখানা ভিজিয়ে জল খাও। খাও নাই—বলতে হয়!
বাতাসা ভিজাইয়া জল খাইয়া অনিরুদ্ধ যেন বাঁচিল। টাঙিটা হাতে করিয়া সে পথে নামিয়া হনহন করিয়া বাড়ি চলিল। কিন্তু কঙ্কণার প্রান্তে আসিয়া পৌঁছিতে-না-পৌঁছিতে ঝড় উঠিয়া পড়িল। পৌষের পর হইতে বৃষ্টি হয় নাই। চারিদিক রুক্ষ হইয়া উঠিয়াছিল। চৈত্র মাসের মাঝামাঝিতেই যেন বৈশাখের চেহারা দেখা দিয়াছে। অকালেই উঠিয়া পড়িয়াছে কালবৈশাখীর ঝড়। দেখিতে দেখিতে চারিদিক অন্ধকার হইয়া গেল; দুর্দান্ত ঝড়ের তাড়নায় পৃথিবী হইতে আকাশ পর্যন্ত পিঙ্গল ধুলায় ধূসর হইয়া উঠিল, তাহার ওপর ঘনাইয়া আসিল—দ্রুত আবর্তনে আবর্তিত পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের ঘন ছায়া দুয়ে মিলিয়া সে এক বিচিত্র পিঙ্গলাভ অন্ধকার। গো গোঁ শব্দ করিয়া ঝড়ের সে কি দুৰ্দান্তপনা!
অনিরুদ্ধ আশ্ৰয় লইল একটা গাছতলায়। শিলাবৃষ্টি বজ্ৰপাতও হইতে পারে। কিন্তু উপায় কি? আবার কে এখন এই দুর্যোগে গ্রামের মধ্যে ছুটিয়া যায়। আর মরণ তো একবার!
শোঁ শোঁ শব্দে প্রবল ঝড়। ঝড়ে চালের খড় উড়িতেছে, গাছের ডাল ভাঙিতেছে। বিকট শব্দে ওই কার টিনের ঘরের চাল উড়িয়া গেল। কিছুক্ষণ পরেই নামিল ঝনঝম করিয়া বৃষ্টি, দেখিতে দেখিতে চারিদিক আচ্ছন্ন করিয়া মুষলধারে বর্ষণ। আঃ, পৃথিবী যেন বাঁচিল! ঠাণ্ডা ঝড়ো হাওয়ায় ভিজা মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধ উঠিতে লাগিল।
বৈশাখের আগে এ অকালবৈশাখী ভাল নয়। চৈতে মথর মথর, বৈশাখে ঝড় পাথর, জ্যৈষ্ঠে মাটি ফাটে, তবে জেনো বর্ষা বটে! ভাগ্য ভাল, শিল পড়িল না। তবে একটা উপকার হইল, জমিতে চাষ চলিবে। এ সময়ে একটা চাষ পাঁচ গাড়ি সারের সমান। কাটা ধানের গোড়াগুলি উল্টাইয়া দিবে, সেগুলি মাটির ভিতর পচিতে পাইবে। রোদে বাতাসে মাটি ফোঁপরা নরম হইবে। হাতে তুলিয়া ধরিলেই এলাইয়া পড়িবে আদরিণী মেয়ের মত।
***
ঝড়-জল থামিতে সন্ধ্যা ঘুরিয়া গেল। অন্ধকার রাত্রি, ক্রোশখানেক দীর্ঘ মেঠো পথ, মাঠে কাদা হইয়া উঠিয়াছে, গর্তে জল জমিয়াছ। জায়গায় জায়গায় জলের স্রোতে ভাসিয়া আসিয়া স্থূপীকৃত হইয়া উঠিয়া জমিয়াছে খড়কুটা-পাতা—নানা আবর্জনা। চারিদিকে ব্যাঙগুলা জলের সাড়ায় ও স্বাদে মুখর হইয়া উঠিয়াছে। মধ্যে মধ্যে বিষধর সরীপূপের সাড়া পাওয়া যাইতেছে–সুদীর্ঘ দেহ লইয়া সরসর শব্দে চলিয়া যাইতেছে। কিন্তু অনিরুদ্ধের কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। টাঙ্গিটা হাতে করিয়া সে নিৰ্ভয়ে চলিতে চলিতে গান ধরিল। সাপ! সাপের প্রাণের ভয় নাই? উচ্চকণ্ঠে গান শুধু তাহার আনন্দের অভিব্যক্তি নয়, সরীসৃপদের প্রতি সরিয়া যাইবার নোটিশ। সে নোটিশ সত্ত্বেও যদি কাহারও দুর্নতি হয়—মাথা তুলিয়া গর্জন করে, তবে তাহার হাতে আছে এই টাঙ্গি। সাপ—সে হাসিল। যেবার সে দুইখানা জমি কাটিয়া একখানা বাকুড়িতে পরিণত করে, সেবারে একটা পুরনো পগার কাটিবার সময় কালকেউটে মারিয়াছিল বারটা। তাহার মধ্যে পাঁচটা ছিল চার হাত করিয়া লম্বা। সাপ কি অপর জানোয়ারকে সে ভয় করে না। ভয় তাহার মানুষকে। ছিকুকে আগে গ্রাহ্য করিত না, কিন্তু শ্রীহরি এখন আসল কালকেউটে! চৌধুরীও ভীষণ জীব!
ঝড়ে গ্রামটা তছনছ করিয়া দিয়াছে।
গাছের ডাল ভাঙিয়াছে, পাতায় খড়ে পথেঘাটে আর চলা যায় না। চণ্ডীমণ্ডপের ষষ্ঠীতলায়। বকুলগাছটার বড় ডালটাই ভাঙিয়া পড়িয়াছে। চালের খড় সকলেরই কিছু না কিছু উড়িয়াছে। হরেন্দ্র ঘোষাল একখানা ঘর করিয়াছিল গম্বুজের মত, উঁচুতে প্রায় মাঝারি তালগাছের সমান। সেইখানার চালটাকে একেবারে উপড়াইয়া হরিশ মোড়লের পুকুরের জলে ফেলিয়া দিয়াছে। বায়েনপাড়া, বাউরিপাড়ার দুর্দশার একশেষ হইয়াছে। তালপাতা এবং খড়ে ছাওয়ানো ঘরগুলির আচ্ছাদন বলিতে কিছু রাখে নাই। তাহার ওপর বর্ষণে দেওয়াল গলিয়া মেঝে ভিজিয়া কাদা সপ-সপ করিতেছে।
যাক, দেবু-ভায়ের কিছু যায় নাই। আহা, বড় ভাল লোক দেবু-ভাই। জগনের ডাক্তারখানার কেবল বারান্দার চালটা আধখানা উল্টাইয়া গিয়াছে। আশ্চর্য, শ্রীহরি বেটার কোনো ক্ষতি হয় নাই। টিনের ঘরে বেটা লোহার দড়ির টানা দিয়াছে। এই রাত্রেই রাঙাদিদি ঘরের খড়কুটা পরিষ্কার করিতে করিতে দেবতাকে গাল পাড়িতেছে।
আপনার বাড়ির সম্মুখে আসিয়া অনিরুদ্ধ দাঁড়াইল।
দাওয়ায় বসিয়া ছিল যতীন। সে বই পড়তেছিল, প্ৰশ্ন করিল–কে?
–আজ্ঞে, আমি। অনিরুদ্ধ।
–কোথায় ছিলেন সমস্ত দিন?
–কাজে গিয়েছিলাম বাবু।
কথাটা বলিয়া অনিরুদ্ধ অন্ধকারের মধ্যেও তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চালের দিকে চাহিয়া দেখিল।
যতীন একটু আশ্চর্য হইয়া গেল—অনিরুদ্ধ আজ সুস্থ কথাবার্তা বলিতেছে। এ অবস্থাটা যেন অনিরুদ্ধের পক্ষে অস্বাভাবিক। সে আবার প্রশ্ন করিল—শরীর ভাল আছে তো? কি দেখছেন?
দেখছি চালের অবস্থা। নাঃ, ওড়ে নাই কিছু। কেবল কোঠাঘরের পশ্চিমদিকের চালের খড়গুলা আতঙ্কিত সজারুর কাঁটার মত উপরের দিকে ঠেলিয়া উঠিয়াছে।
—আসছি বাবু। অনেক কথা আছে।
সে বাড়ির ভিতরে চলিয়া গেল। কিছু খাইতে হইবে। পেট হু-হু করিয়া জ্বলিতেছে।
পদ্ম বাড়ির উঠান হইতে পথঘাট পর্যন্ত সব ইহারই মধ্যে পরিষ্কার করিয়া ফেলিয়াছে। ওই যে ওপাশের দাওয়ায় বসিয়া রহিয়াছে, ওটা কে? একটা ছেলে! কে? ও-বাউণ্ডুলে তারিণীর সেই ছেলেটা! জংশনে ভিক্ষা করিতে করিতে এখানে আসিয়া জুটিল কি করিয়া? পদ্মের কাছে আসিয়া বলিল-ওটা কোথা থেকে এল?
