পাটা ছাড়াইয়া লইয়া চৌধুরী তারপর সান্ত্বনা দিয়া বুলিল—এক বছরেই যখন শোধ করবি, তখন ছবিঘে কেন দশ বিঘে বন্ধক দিতেই বা আপত্তি কিসের তোর? কাগজে লেখা থাকবে বৈ তো নয়?
অনিরুদ্ধ চুপ করিয়া রহিল; সে ভাবিতেছিল দেহের গতিকের কথা, দেবতার গতিকের অর্থাৎ বৃষ্টি-অনাবৃষ্টির কথা।
–কিছু ভয় করিস না।
চৌধুরী তার মনের ভাব ধরিয়া ফেলিয়া বলিল—এক বছরেই শোধ করিস আর পাঁচ বছরে করিসতোকে মরতে আমি দেব না। সুদ আমি বাকি রাখি না, রাখবও না। বাকি থাকলে আসলই থাকবে; তাতে বেইমানি করি, তা হলে ব্রাহ্মণের গণ্ডুষ। চৌধুরী হাসিতে লাগিল।
অনিরুদ্ধ বলিল—সুদ আপনি মাসে মাসে পাবেন।
–ঠিক তো?
–তিন সত্য করছি আপনার চরণ ছুঁয়ে।
–তবে দিনতিনেক পরে আসি। আমি সব খোঁজখবর করে দেখি।
–খোঁজ করবেন? কি খোঁজ করবেন?
–আর কোথাও বন্ধক-টক দিয়েছিস কি না।
–আপনার চরণ ছুঁয়ে বলছি
চৌধুরী বলিল—এইবার চরণ দুটিকে আমাকে সিকেয় তুলতে হবে বাবা। তাতে তোরই। খারাপ হবে। রেজেষ্ট্রি অফিসে যাওয়া হবে না, তুইও টাকা পাবি না। খোঁজ না করে আমি টাকা কাউকে দিই না, দোবও না।
অনিরুদ্ধ তবু উঠিল না। শ্ৰান্ত ক্লান্ত দেশান্তরী উদাসীনের অকস্মাৎ প্রিয়জনকে মনে পড়িয়া যেমন বাড়ি ফিরিবার জন্য ব্যাকুল আগ্ৰহ জাগে, অনিরুদ্ধের আজ তেমনি ব্যাকুল আগ্রহ জাগিয়া উঠিয়াছে আবার সেই পূর্বের সংযত সচ্ছল জীবনে ফিরিবার জন্য। সেই ফিরিবার পথের পাথেয় চাই তাহার। চার বছরের বাকি খাজনা সালিয়ানা পঁচিশ টাকা দশ আনা হিসাবে একশত আড়াই টাকা; সিকি সুদ পঁচিশ টাকা দশ আনা—একুনে একশো আটাশ টাকা দু আনা, খরচা লইয়া একশো চল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশ, দেড়শো টাকাই ধরিয়া রাখা ভাল। আরও একশো চাই। সে বলদ এক জোড়া কিনিবে। জমি ভাগে না দিয়া, একটি কৃষাণ রাখিয়া সে বাপঠাকুরদার মতই ঘরে চাষ করিবে। তাহার নিজের জমি তের বিঘা। তাহার সঙ্গে অন্য কাহারও বিঘাপাঁচেক জমি সে ভাগে লইতেও পারিবে। সঙ্গে সঙ্গে জংশন শহরের ধানকলে বা তেলকলে একটা চাকরিও লইবে। রাজি থাকিতে সে উঠিবে, গরু দুটাকে আপন হাতে খাইতে দিবে। কৃষাণ হাল লইয়া যাইবে, সেইসঙ্গে সে-ও বাহির হইবে একেবারে সারাদিনের মত সাজিয়া গুছাইয়া। জমিগুলি দেখিয়া-শুনিয়া ওই পথেই চলিয়া যাইবে সে জংশনে কলের কাজে। ফিরিবার পথে আবার একবার মাঠ ঘুরিয়া বাড়ি আসিবে। মদ খাইতে হয়—একটু না খাইলে সে বাঁচিবে না—বোতল কিনিয়া আনিয়া বাড়িতে রাখিবে, পদ্ম মাপিয়া ঢালিয়া দিবে–ব্যস! কলের মাইনে দৈনিক আট আনা হিসাবে চারিটা রবিবার বাদ দিয়া তের টাকা—বৎসরে একশো ছাপ্পান্ন টাকা নগদ আয়। ধান, কলাই, গুড়, গম, যব, তিসি, সরিষা হইবে চাষে। নজরবন্দির বাড়িভাড়া আছে মাসিক দশ টাকা। ওটা অবশ্য স্থায়ী আয় নয়। এ ছাড়াও সে বাড়িতে আবার কামারশালা খুলিবে। রাত্রে যাহা পারে, যতটুকু পারে করিবে; দৈনিক দু গণ্ডা পয়সা রোজগার হইলেও তাহাতেই তাহার দৈনিক নুন-তেলের খরচা তো চলিয়া যাইবে। ঋণ শোধ দিতে তাহার কয় দিন! ঋণ শোধ দিয়া সে আরম্ভ করিবে সঞ্চয়; সঞ্চয় হইতে সুদি কারবার। খৎ-তমসুকে নয়, জিনিস-বন্ধকী কারবার। ঘাটতি নাই পড়তি নাই, বৎসরে একটি টাকা দুটাকায় পরিণত হইবে। ইহার ওপর তাহার বাকুড়ির আরো আধ হাত মাটি তুলিয়া সে যদি গর্ত করিতে পারে—তবে বাকুড়িতে হাজাশুকা থাকিবে না। মাটি তুলিয়া গাড়ি-গাড়ি সার এবং মরা পুকুরের পাক ঢালিয়া দিবে। উনো ফসল দুনো হইবে।
চৌধুরী বলিল–বসে থাকলে তো টাকা মিলবে না, অনিরুদ্ধ। আমি খোঁজখবর করি, তারপর এদিকে বেলাও যে দশটা হল। আমার আবার ইস্কুল আছে।
অনিরুদ্ধ বলিল, আজই চলুন কঙ্কণা, রেজেস্টারি আপিসে খোঁজ করুন।
হাসিয়া চৌধুরী বলিল-আজই? তোর অশ্বতর যে পক্ষীরাজের চেয়েও জিন্দে দেখছি, থামতে চায় না। বেশ বস্তুই। আমি চান করে দুটো খেয়ে নি। চল্ আমার সঙ্গে। টিফিনের সময় খোঁজ করব।
টিফিনেও খোঁজ শেষ হইল না। চৌধুরী বলিল—আবার সেই শেষ ঘণ্টা, তিনটে দশের পর আবার অবসর। তুই তা হলে বস।
শেষ ঘণ্টায় হেডপণ্ডিত চৌধুরীর ধর্ম-সম্বন্ধীয় বক্তৃতার ক্লাস। এ ক্লাসটার সময় চৌধুরী প্রায়ই ছেলেদের স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চার অবকাশ দিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের কাজগুলি সারিয়া থাকে। দলিলদস্তাবেজ বাহির করে, কে কোথায় কি নিল, কি বেচিল, কে কি বন্ধক দিল ইত্যাদি সংবাদগুলি সংগ্রহ করিয়া রাখে।
অনিরুদ্ধ সেই অপেক্ষা করিয়া রহিল। সমস্ত দিন খাওয়া হয় নাই। সে খানকয়েক বাতাসা কি দুই টুকরা পাটালির প্রত্যাশায় পরাণ ময়রার দোকানে বসিয়া পরাণের তোষামোদ করিতে আরম্ভ করিল। পাটালি-বাতাসা মিলিল না, কিন্তু ক্ষুধাতৃষ্ণা সে ভুলিয়া গেল; পরাণের বিধবা ভাগ্নী দোকান করে, তাহার সঙ্গে বেশ আলাপ জমাইয়া ফেলিল। একটা হইতে তিনটা দুই ঘণ্টা সময় যেন মেয়েটার হাসির ছুঁয়ে উড়িয়া গেল!
চৌধুরী আসিয়া বলিল—দেখা আমার হয়ে গেল অনিরুদ্ধ, বুঝলি?
হয়ে গেল আজ্ঞে।
হ্যাঁ। তোকে আর ডাকি নাই। দেখলাম গল্পেতে খুব জমে গিয়েছিস, রসভঙ্গ করা পাপ, শাস্ত্রনিষিদ্ধ। বলিয়া চৌধুরী হাসিল।
অনিরুদ্ধ একটু লজ্জিত হইল।
–টাকা আমি দোব।
–দেবেন! উৎসাহে অনিরুদ্ধ উঠিয়া দাঁড়াইল।
–হ্যাঁ। কিন্তু তোর তো আজ সারাদিন খাওয়া হল না রে!
–তা এই বাড়ি গিয়ে এই তো কোশখানেক পথ আজ্ঞে।
