দুর্গার মধ্যে আগুন ও জলদুই-ই আছে, একাধারে জ্বলিবার ও জুড়াইবার উপাদান। তাহার যৌবনে আছে আবেগময়ী মানবীয় ঈষদুষ্ণ স্বাদ;—তাহা অনিরুদ্ধকে উন্মত্ত করিয়া তুলিয়াছে। তাহার ভালবাসায় আছে সর্বস্ব ঢালিয়া দিবার আকুতি। কামারশালা অচল হইলে, কর্মহীন অনিরুদ্ধ বিশ্বগ্ৰাসী অবসাদ হইতে বাঁচিবার জন্য সস্তা মদ ধরিবার সময়টিতেই দুর্গা আক্রোশবশে ছিকে ছাড়িয়া তাহাকে সাগ্রহে জড়াইয়া ধরিয়াছিল। সেই চরম আত্মসমর্পণের মধ্যে দুর্গার নিকট সেও আপনাকে বিলাইয়া দিয়াছিল। কিন্তু দুর্গা সহসা একদিন তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া সরিয়া দাঁড়াইয়াছেনূতনের মোহে। দুর্গা তুষানল ও মরীচিকা দুই-ই। সে। পাষাণী, বিশ্বাসঘাতিনী, মায়াবিনী!
হঠাৎ সে চমকিয়া উঠিল। এ কি! এ যে অন্যমনস্কভাবে চলিতে চলিতে একেবারে বায়েনপাড়াতেই দুর্গার ঘরের সামনে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। দুর্গা উঠানে দুধ মাপিতেছে, রোজের দুধ দিতে যাইবে।
সে ফিরিল তাড়াতাড়ি। পাড়াটা পার হইয়া সে মাঠের ধারে আসিয়া দাঁড়াইল। দুর্গা তাহাকে পরিত্যাগ করিয়াছে, সেই-বা দুর্গার পিছনে ঘুরিবে কেন? সে-ও পরিত্যাগ করিবে। দেবু তাহাকে ঠিক কথাই বলিয়াছে। এখন সে বুঝিতে পারিতেছে—তাহার কত পরিবর্তন হইয়াছে! ছি ছি! কেশব কর্মকারের ছেলে—হিতু কর্মকারের নাতি—সে মুচির মেয়ের ঘরে পড়িয়া থাকে তাহার উচ্ছিষ্ট দেহখানার লোভে তাহার দুই-চারটি টাকা-পয়সার প্রত্যাশায়, ছি! সে না সক্ষম বেটাছেলে—একজন নামকরা লোহার কারিগর!
পরক্ষণেই সে হাসিল। লোহার কারিগরের আর মান নাই—নাম নাই। চার আনার বিলাতি চাকু-ছুরিতেই নামের গলা দু ফাঁক হইয়া গিয়াছে। সে এক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল। যাকনাম যাকমানও যাক, জানটাই থাকুক, চালকলে তেলকলে নাটবন্টু কষিয়া, হাতুড়ি চুকিয়া মিস্ত্রি হইয়াই বাঁচিয়া থাকিবে সে। জোটাকেও বাঁচাইতে হইবে। ঠাকুরদাদার মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া নিজের হাতে কাটা জমি, বাবার কাটা জমি, তাহার নিজের হাতে কাটা ওই বাকুড়ি তাহার সোনার বাকুড়ি-লক্ষ্মী-জোল, তাহার মা অন্নপূর্ণা!
আপন হইতেই তাহার দৃষ্টি সম্মুখের শস্যশূন্য মাঠের উপর দিয়া প্রসারিত হইয়া নিবন্ধ হইল চার বিঘার বাকুড়ির উপর। সে চলিতে আরম্ভ করিল; আসিয়া বাকুড়ির আইলের উপর বসিল। আইলের মাথায় একটা কয়েতবেলের গাছ। গাছটা লাগাইয়াছিল তাহার পিতামহ। বাল্যকালে তাহার বাপ চাষ করিত—সে আসিত বাপের ও কৃষাণের খাবার লইয়া, আসিয়া ওই। গাছতলায় বসিত। জ্বর-জ্বালার পর কতদিন এখানে আসিয়া নুন দিয়া কয়েতবেল খাইয়াছে। লক্ষ্মীপুজোতে পর্বে-পার্বণে এই ধানের চালে হইয়াছে অন্ন, ওই কয়েতবেল গুড়-নুন দিয়া মাখিয়া হইয়াছে চাটনি।
অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিয়া অনিরুদ্ধ সংকল্প লইয়া উঠিল—এ জোত তাহাকে রাখিতেই হইবে!
সে চলিল আকুলিয়া গ্রামের কাবুলী চৌধুরীর কাছে। ফ্যালারাম চৌধুরী, কঙ্কণা ইস্কুলের মাস্টার, তাহার সুদি কারবার আছে। খুব চড়া সুদ ও ভয়ঙ্কর তাগাদার জন্যে অনেক লোকে বলে কাবুলী। অনেকে বলে অজগর—তাহার গ্রাসে পড়িলে নাকি আর বাহির হওয়া যায় না। অনেকে বলে খুনে। একবার একটা চোর ধরিয়া চৌধুরী চোরটাকে খুন করিয়া ফেলিয়াছিল।
চৌধুরীর জমির ক্ষুধা বড় প্রবল। ভাল সম্পত্তি হইলে চৌধুরী টাকা দিবেই। সে আকুলিয়া গ্রামের পথই ধরিল।
চৌধুরী লেখাপড়া জানা লোক, বি-এ পাস, এদিকে আবার সংস্কৃতেও কি একটা পরীক্ষা দিয়াছে, ইস্কুলে সে হেডপণ্ডিত। কিন্তু আসলে সে একজন প্রথম শ্রেণীর আঙ্কিক। সুদ কষিতে তাহার কাগজ-কলম দরকার হয় না। চক্রবৃদ্ধিহারে দশ-বিশ বৎসরের সুদ মুখে মুখে হিসাব করিয়া দেয়। তবে সুদকে আসলে পরিণত করিয়া সেটা উসুলের হিসাব আলোচনার সময় দুইচারিটা সংস্কৃত শ্লোক আওড়াইয়া অঙ্কগুলাকে রসারিত অথবা পারমার্থিক তত্ত্বমণ্ডিত করিয়া দেয়।
অনিরুদ্ধ বলিল-আমি ঠিক সময়ের মধ্যে টাকা শোধ করব, চৌধুরীমশাই আমি ফাঁকিবাজ নই। আর পালিয়ে বেড়িয়ে দেখা করব না, সে স্বভাবও আমার নয়।
চৌধুরী হাসিলফাঁকি দেবার উপায় নাই, বাবা। আর পালিয়েই বা যাবি কোথায়? বলিয়া সে একটা শ্লোক আওড়াইয়া দিল—গিরেী কলাপী গমনে চ মেঘো, লক্ষান্তরেহর্ক সলিলে চ পদ্মম্। বুঝলি অনিরুদ্ধ, মেঘ থাকে আকাশে আর ময়ূর থাকে পাহাড়ে, দূর অনেক। কিন্তু মেঘ। উঠলেই ময়ূরকে বেরিয়ে এসে পেখম মেলতেই হবে। আর সূর্যি থাকে আকাশে, জলে পদ্মের কুঁড়ি। কিন্তু সূর্যি উঠিলেই পদ্মকে বাপ বাপ বলে পাপড়ি খুলতেই হবে। খাতক-মহাজন সম্বন্ধ হলে যেখানে থাকিস না কেন, হাজির তোকে হতেই হবে পালাবি কোথা!
অনিরুদ্ধ কথাগুলো ভাল করিয়া বুঝিল না, পাত মেলিয়া শুধু নিঃশব্দে হাসিল। কথাগুলোয় রসের গন্ধ আছে।
চৌধুরী মুখে মুখেই হিসাব করিল—বিঘেতে চল্লিশ টাকা দিলে, তিন বছরে চল্লিশ তো ষাটে গিয়ে দাঁড়াবে। এতে নালিশের খরচা চাপলে মহাজনের থাকবে কি ব? তার ওপর খাতক আবার যদি বাকি খাজনা ফেলে যায়, তবে তো আমাকে রঘু রাজার মত ভাড়ে জল খেতে হবে।
অনিরুদ্ধ তাহার পায়ে ধরিয়া বলিল-আজ্ঞে, আমি আপনার পা ছুঁয়ে বলছি, এক বছরের মধ্যেই সব টাকা শোধ করব আমি।
পা টানিয়া লইয়া চৌধুরী বলিলপায়ে ধরিস না অনিরুদ্ধ, পায়ের ফাটে হাত-মুখ ছিঁড়ে যাবে তোর। ছাড়।
মিথ্যা বলে নাই, চৌধুরীর কালো কর্কশ চামড়ায়, কোনো ব্যাধির জন্যই হউক বা শরীরে কোনো উপাদানের অভাবহেতুই হউক, বার মাস ফাট ধরিয়া থাকে। শীতকালে সাদা ফাটগুলো রক্তাভ হইয়া ওঠে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, চৌধুরীর পায়ের তলাকার ফাট, শুষ্ক কঠিন চামড়া, ছুরির মত ধারালো।
