হাসিয়া দেবু বলিল—চেতন হয়েছে, অনি-ভাই?
কোনো লজ্জা বোধ না করিয়া অনিরুদ্ধ হাসিয়া বলিল—কাল একটুকু বেশি হয়েছিল বটে।
দেবু বলিল—ছি, অনি-ভাই! ছি!
অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল; তারপর অকস্মাৎ খানিকটা হাসিয়া বলিল–ও তুমি জান না, দেবু-ভাই। রস তুমি পাও নাই-তুমি বুঝবে না।
তিরস্কার করিয়া দেবু বলিল—তোমার জমি নিলামে উঠেছে, কি নিলাম হয়েছে, ঘরে পরিবারের অসুখ, আর তুমি মদ খেয়ে বেড়াও পয়সা নষ্ট কর!
–পয়সা আর বেশি খরচ আমি করি না, এখন পচাই মদ খাই। এখন জমি নিলামের কথাই তোমাকে বলতে এসেছি। আর পরিবারের অসুখ তো, আমি কত ভুগব বল?
—তুমি তো এমন ছিলে না অনি-ভাই!
—কে জানে? মদ তো আমি বরাবরই একটু-আধটু খাই। আমি তো অন্যায় কিছু বুঝতে পারি না।
–বুঝতে পার না! পৈতৃক ব্যবসা তুলে দিলে। ছোটলোকের মত পচাই ধরেছ। যেখানে সেখানে খাও—শো!
–কি করব? আনি কামারের দা, ক্ষুর, গুপ্তি—কিনবে কে? কোদাল-কুড়ুল-ফাল—তাও এখন বাজারে মেলে—সস্তা। গাঁয়ে কাজ করলে শালারা ধান দেয় না। কি করব? আর পচাই! পয়সায় কুলোয় না–কি করব?
—কি করবে! তোমার বোধশক্তিও লোপ পেয়েছে, অনি-ভাই?
–কে জানে?
–দুর্গার ঘরে খাও অনি-ভাই? তার ঘরে তুমি রাত কাটাও?
–দুর্গার নাম কোরো না পণ্ডিত। নেমকহারাম, পাজি, শয়তানের একশেষ, আমাকে আর ঘরে ঢুকতে দেয় না।
অনিরুদ্ধের এই নির্লজ্জ স্বীকারোক্তিতে দেবু চুপ করিয়া রহিল।
অনিরুদ্ধ বলিয়া গেল—জান পণ্ডিত, দুর্গার জন্যে আমি জান দিতে পারতাম; এখনও পারি। দুর্গাই আমাকে নিজে থেকে ডেকেছিল। তখন আমার পরিবার পাগল। মিছে কথা বলব না, সে সময় দুর্গা আমার পরিবারের সেবা পর্যন্ত করেছে, টাকাও দিয়েছে। দারোগা ওর এক কালের আশনাইয়ের লোক—দারোগাকে বলে নজরবন্দির জন্যে আমার ঘরখানি ভাড়া করিয়ে দিয়েছে। মাসে দশ টাকা ভাড়া। কিন্তু ওর সব চোখের নেশা! যাকে যখন ভালবাসে। এখন ওই নজরবন্দির উপর নজর পড়েছে।
—ছি, অনিরুদ্ধ! ছি!
–যতীনবাবুর দোষ আমি দিই না। ভাল লোক, উঁচু ঘরের ছেলে। পদ্মকে মা বলে। আমি পরখ করে দেখেছি। যাক গে ও-কথা। মরুক গে দুর্গা। এখন যা বলতে এসেছি, শোন। বাকি খাজনার ডিক্রি জারি হয়ে গিয়েছে, জমি এইবার নিলামে চড়বে। ও ঝাঁট আমি রাখব না। এখন বিক্রি করে দিয়ে যা পাই! তোমাকে ভাই দেখেশুনে আমার জোতটি বেচে দিতে হবে।
–বেচে দেবে? দেবুর বিস্ময়ের আর অধিক রহিল না।
–হ্যাঁ।
–তারপর?–সে যা হয় করব। ছিরে গোমস্তাকে আমি খাজনা দেব না।
–পাগলামি কোরো না, অনি-ভাই।
–পাগলামি? তবে যাক, এমনি নকড়া-ছকড়ায় নিলেম হয়ে যাক। আমার দ্বারা কিছু হবে না।
–বাকি খাজনার টাকাটা যোগাড় কর হয় খাজনার পরিমাণ দামের মত জমি বেচে দাও, নয় ধার পাও তো দেখ।
অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অনিরুদ্ধ বলিল দেবু-ভাই, বাপুতি সম্পত্তি ছেড়ে দেব। মনে করলে বুক ফেটে যায়। জান পণ্ডিত, ওই চার বিঘে বাকুড়ি, আগে ঠাকুরদাদার আমলে সাতখানা টুকরো টুকরো জমি ছিল। কেটেকুটে সাতখানাকে ঠাকুরদাদা করেছিল তিনখানা। বাবা তিনখানাকে কেটে করেছিল দুখানা। সাড়ে তিন বিঘা বাকুড়ি—আর দশ কাঠা ফালি। দুখানাকে কেটে আমি করেছি একখানা চার বিঘে বাকুড়ি।
টপ টপ করিয়া বড় বড় কয় ফোটা জল তাহার চোখ হইতে ঝরিয়া পড়িল।
দেবু তাহার পিঠে হাত বুলাইয়া বলিল—কেঁদো না, অনি-ভাই। তুমি সক্ষম বেটাছেলে, তুমি মন দিয়ে কাজ করলে তোমার কিছুর অভাব হতে পারে না।
বিচিত্ৰ হাসিয়া অনিরুদ্ধ বলিল-হাজার মন পাতিয়ে কাজ করলেও কামারের কাজ করে আর অভাব ঘুচবে না, পণ্ডিত। উপায় এককলে কাজ। তাই দেখব এবার। দুর্গা আমাকে বলেছিল একবার আমি গা করি নাই। কেশব কামারের ছেলে, হিতু কামারের নাতি আমি কলের কুলি হব? ওইসব কি-না-কি জাতের মিস্ত্রিদের তাঁবেদার হয়ে থাকব? জান দেবু, এমন দা আমি গড়তে পারি যে এক কোপে শেলেদা বাঘের গলা নেমে যাবে!
অনিরুদ্ধকে শান্ত করিবার জন্যই রহস্য করিয়া দেবু বলিল—সেই তো তোমার ভুল, অনিভাই। ও দা নিয়ে লোকে করবে কি বল? বাঘ কাটতে যাবে কে?
অনিরুদ্ধ এবার হাসিয়া ফেলিল।
দেবু বলিল—টাকা যদি ধার পাও তো দেখ, অনি-ভাই। জমি রাখতেই হবে। তারপর মন দিয়ে কাজকর্ম কর। কলে-কলেই কাজ কর আপাতত। ক্ষতি কি?
অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া অনিরুদ্ধ বলিল—তুমি বলছ! আবার একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল–তাই দেখি।
পথে বাহির হইয়া অনিরুদ্ধ বাড়ি গেল না। বাড়ি হার ভাল লাগে না। পদ্ম তাহাকে চায় না, সেও পদ্মকে চায় না। নিক্তির ওজনে চরিত্রবান সে কোনোদিনই নয়; কিন্তু পদ্মের প্রতি ভালবাসার অভাব তাহার কোনোদিন ছিল না। চরিত্রহীনতার ব্যভিচার ছিল তাহার খেয়াল পরিতৃপ্তির গোপন পন্থা; উন্মত্ত দেহলালসার দাহ নিবৃত্তির জন্য পঙ্কস্নান।
অকস্মাৎ কোথা হইতে জীবনে একটা দুর্যোগ আসিয়া সব বিপর্যস্ত করিয়া দিল। সেই দুর্যোগের মধ্যে দুর্গা আসিয়া দাঁড়াইল মোহিনীর বেশে; শুধু মোহিনীর রূপ লইয়াই নয়—অফুরন্ত ভালবাসাও দিয়াছিল দুর্গা। সেবা-যত্ব—এমনকি নিজের পার্থিব সম্পদও সে তখন অনিরুদ্ধের জন্য ঢালিয়া দিতে চাহিয়াছিল, কিছু দিয়াছেও।
তা ছাড়া দুর্গার সঙ্গ তাহাকে যে তৃপ্তি দিয়াছে, পদ্ম তাহার সুস্থ সবল যৌবন-পরিপূর্ণ দেহ লইয়াও সেরূপ তৃপ্তি দিতে পারে নাই। তাহার বুকে আছে এক বোঝ মাদুলি; চিরদিন সে তাহাতে বেদনা অনুভব করিয়াছে। আচার-বিচার-ব্ৰত-বার পালনের আগ্রহে, শুচিতা-বোধের উগ্রতায় পদ্ম তাহাকে অস্পৃশ্যের মত দূরে ঠেলিয়া রাখিয়াছে। তাহার ভালবাসায় যত্নের আধিক্য, মমতার আতিশয্য অনিরুদ্ধকে পীড়া দিয়াছে। সঙ্কোচশূন্য অধীরতায় দুর্গার মত বুকে ঝাঁপ দিয়া পড়িতে সে কোনোদিনই পারে নাই। সমস্ত দিন আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়া তাহারই সম্মুখে বসিয়া সর্বাঙ্গ ঝলসাইয়া, সে বাড়ি ফিরিয়া একটু করিয়া মদ খাইত। কিন্তু ওই দেহ-মন লইয়া পদ্মের সমুখে দাঁড়াইলেই তাহার নেশার আগ্রহ সব যেন হিম হইয়া যাইত।
